রাজনীতি

নির্বাচনের ফল বিপর্যয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বিএনপি হাই-কমান্ড : তৃণমূল নেতাকর্মীদের সমালোচনার মুখে বেকায়দায় শীর্ষ নেতৃত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়, নির্বাচনের আগে মনোনয়নবাণিজ্য ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কার্যকর আন্দোলন করতে না পারাসহ বেশকিছু ইস্যু নিয়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে আছেন দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়ার বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে গ্রহণ করেনি দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এজন্য তারা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতাদের দায়ী করছেন।
জাতীয় নির্বাচনের ফল বিপর্যয়ে এমনিতেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এর ওপর জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়া নিয়ে তৃণমূলের অভিযোগের আঙুল মির্জা ফখরুলকে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। তিনি কিছুতেই বোঝাতে পারছেন না, তার একক সিদ্ধান্তে জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হয়নি। জেলে থাকা খালেদা জিয়া ও লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের নির্দেশেই জামায়াতকে ২৫টি আসন ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন এটি কেউই মানতে চাইছেন না। দলের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে না পেয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওপর চড়াও হচ্ছেন। যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা শুধু জামায়াতকে ধানের শীষ দেয়াই নয়, নির্বাচন পরিচালনা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, প্রার্থী নির্বাচন, মনোনয়ন প্রদানসহ সব বিষয়েই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া প্রশ্নে বিএনপি শুরু থেকেই ভুলের চোরাবালিতে আটকে ছিল বলে মনে করছেন দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। সেই ভুলের খেসারত হিসেবেই নির্বাচনে দলের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন তারা।
তৃণমূলের কথা হলো, নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া প্রশ্নে মির্জা ফখরুলের এমন লুকোচুরি করা ঠিক হয়নি। তিনি প্রথম থেকেই বলে আসছিলেন খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। আবার এও বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি যুগপৎ আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাবে।
আদতে তার কিছুই করতে পারেননি মির্জা ফখরুল। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তিনি ন্যূনতম আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি। এর বিপরীতে গড়ে তুলেছেন ঐক্যফ্রন্ট। সে ফ্রন্টের আবার নেতা বানিয়েছেন সাবেক আওয়ামী লীগার ড. কামাল হোসেনকে। সেই ডক্টরের প্ররোচনায় শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে এবং কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই নির্বাচনে গিয়েছেন এবং গো-হারা হেরেছেন।
এটা বিএনপির সব পর্যায়ের নেতারাই বলছেন, নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা শুরু থেকেই সেভাবে পরিলতি হয়নি। তারা কী প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করবে, কিভাবে সরকার গঠন করবে, কে তাদের মুখ্য নেতৃত্বে থাকবেনÑ তা মোটেও সুনির্দিষ্ট ছিল না। এ প্রোপটে বিএনপি নেতারা অনেকটা হাত-পা ছেড়ে বসে ছিলেন। বিএনপির হাইকমান্ডসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা কর্মীদের উদ্দেশে ভোটকেন্দ্র পাহারা ও সকালে ভোটের বাক্স পরীা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া কেন্দ্রভিত্তিক ভোট রা কমিটির করারও নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীদের এসব আহ্বানে সাড়া পাওয়া যায়নি। ভোটের কয়েক দিন আগে থেকেই ধানের শীষের প্রার্থীরা মাঠ ছেড়ে দেন।
বিএনপির অনেক প্রার্থী নির্বাচনি প্রচারণায়ই নামেননি। এমনকি পোস্টারও ছাপেননি। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ অনেকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই চলে আসেন মাঠের বাইরে।
এ অবস্থায় মির্জা ফখরুল বারবারই বলছিলেন, যত সমস্যাই দেখা দিক, বিএনপি শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকবে। এর বিপরীতে তিনি নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো প্রতিকারই বের করে আনতে পারেননি।
বিএনপি নেতাদের প্রচারণা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মূলত ফেসবুককেন্দ্রিক ছিল। তারা আশা করছিলেন, ধানের শীষের পে একটি ভোট বিপ্লব হয়ে যাবে। বিএনপির পে নীরব ভোট বিপ্লব ঘটবে। কিন্তু দলের নেতাকর্মীরা মাঠে না থাকায় সমর্থকরাও তেমন সাড়া দেননি।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মতে, নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব ছিল ঐক্যফ্রন্টের হাতে, যার চূড়ান্ত অপব্যবহার হয়েছে। বিএনপি নেতাদের নির্ভরতা ছিল ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের ওপর। শুরুতে নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তা নিয়ে দলে বিভক্তি ছিল স্পষ্ট। এক প প্রকাশ্যেই বলতে থাকেন দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না। কিন্তু শেষপর্যন্ত মির্জা ফখরুল কী পরিকল্পনা নিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন, তা দলের অনেক নেতাকর্মীর নিকটই পরিষ্কার নয়।
ভোটে অংশগ্রহণ ও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়ে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতারাই রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করলেন; যা নিয়ে দলের ভিতরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। রাজনীতির মাঠে শুরুর দিকে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের সরব উপস্থিতি ও গর্জন এবং শেষের দিকের ভোটের মাঠে অনুপস্থিতি ও নীরবতা বেশ ভাবাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের।
বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর প্রতিকূল পরিবেশের অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের পে একটি অংশ শক্তভাবে অবস্থান নেন। তবে যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকার পে ঐক্যফ্রন্টের ড. কামাল হোসেনসহ কয়েকজন নেতার জোরালো অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর উদ্দেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ওদের বেআইনি কোনো আদেশ মানবেন না। মতায় তো সরকার পাঁচ বছর থাকে। সেই পাঁচ বছর শেষ। আর কয়দিন আছে। মাত্র ১০, ২০ বা ১৫ দিন।
অন্যদিকে নির্বাচনের দেড় সপ্তাহ আগে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছিলেন, ৩০ জানুয়ারি নির্বাচন হবে আর আগামী ২ জানুয়ারি বেগম জিয়া মুক্তি পাবেন। তিনি আরো বলেছিলেন, সকাল ৮টা থেকে নয়, ভোর ৫টা থেকে জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাবে, সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। নৌকা ডুবে যাবে ৩০ তারিখ।
মির্জা ফখরুলসহ ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের এসব বক্তব্য শেষ পর্যন্ত বাগাড়ম্বরে পরিণত হয়। এতে ধানের শীষের সমর্থকরা ভরসা পাননি। অন্যদিকে ড. কামাল ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এমন বক্তব্যের পর সরকার তার অবস্থান সুদৃঢ় করে।
বিএনপির সামনে এখন দলে বিভক্তির বিপদ। নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বর্জন নিয়ে নেতাদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে ভোটে যাওয়ায় বিএনপির একাংশ হতাশ ও ুব্ধ। ভরাডুবির পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের প্রথম বৈঠকে দেখা যায়নি নির্বাচনে যাওয়ার বিরোধিতাকারী অনেক নেতাকে।
নির্বাচনে ভরাডুবির পর দল হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বিএনপি কী কৌশল নেবেÑ তা নিয়েই এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে। আগামী ৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারে থাকবে মেনে নিয়েই সামনে এগোতে হচ্ছে বিএনপিকে। এই সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখাই বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, ডিজিটালাইজেশনের এ যুগে মির্জা ফখরুলের মতো জামায়াতপ্রিয় মহাসচিব দিয়ে বিএনপির হবে না। বিএনপির জামায়াতমুক্ত হওয়া এখনই প্রয়োজন। আর সে জন্য প্রয়োজন নতুন মহাসচিব। তারাসহ বিএনপির একটি বড় অংশই এখন মনে করে, ড. কামাল হোসেন এবং ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বিএনপির সাথে একীভূত হয়ে দলের উপকার না করে অপকারই করেছেন বেশি। সরকার তথা সরকারি দলের চাওয়া অনুযায়ী এবার ঐক্যফ্রন্টের পরামর্শ মেনে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত না করে এমনকি তাঁকে নির্বাচন থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে রেখে বিএনপি সরকারের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে।
যদিও সরকার ও সরকারি দল মনেপ্রাণেই চাইছিলো বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক, কিন্তু এর বিনিময়ে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট রহস্যজনক কারণে তাদের কোনো দাবিই আদায় করতে পারেনি। তারা কেবল সরকার তথা ক্ষমতাসীনদের চাওয়াটাকে পূর্ণ করেছে শর্তহীনভাবেই। এতে সরকার প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তথা জনসমর্থন নিয়ে এবার সরকার গঠন করেছে। তাই বিএনপির ওই বিরাট অংশের এখন প্রশ্ন Ñ ড. কামাল হোসেন এবং ঐক্যফ্রন্টের নেতারা কি বিএনপি না সরকারের হয়ে কাজ করেছেন? কাদের বিজয় নিশ্চিত করতে সফল হয়েছেন তারা? Ñ
কিংকর্তব্যবিমূঢ় বিএনপির উপস্থিত নেতা ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই নেতাকর্মীরাও দল ও নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিন্তায় কান্ডারিবিহীন অবস্থায় যে যার মতো করে বিচ্ছিন্নভাবে পথচলা শুরু করেছেন।