কলাম

পর্যটন আকর্ষণে বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশ

মো. সাইফুল্লাহ রাব্বী
লাখো শহীদের বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গড়া চির সবুজের এই বেষ্টনী আমাদের বাংলাদেশ। অনেক বিখ্যাত পরিব্রাজকদের মধ্যে কেউ বলেছেন, সম্পদে পরিপূর্ণ দ্বীপ, আবার কেউ বলেছেন নিয়ামতপূর্ণ দ্বীপ। সবকিছুকে ছাপিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণকারীদের কাছে হয়ে উঠেছে পৃথিবীতে এক বৈচিত্র্যময় দেশ।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি বৈচিত্র্যময় হওয়ার পেছনে বড় অবদান ভারতীয় পাহাড়গুলোর। ভারতীয় পাহাড়গুলো থেকে পতিত পানি প্রবাহে সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ, যেটিকে মনে হবে পৃথিবীর মাঝে এক অন্য পৃথিবী। কবি যথার্থই বলেছেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি খুঁজিতে যাই না পৃথিবীর রূপ’।
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে ছয়-ঋতু মিলিয়ে বারো মাসে তেরো পার্বণ। নতুন ঋতুতে নতুন প্রকৃতির আগমনী বার্তার সাথে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা আর সেই সাথে ঋতুতে ঋতুতে যেন ঋতুবৈচিত্র্য।
বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন কোনো এক শিল্পী, যার সৃষ্টিতে কোনো কমতি নেই। যেটি পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর, সাগর, চর, দ্বীপের সংমিশ্রণে গঠিত।
একটি দেশ ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীসহ ৭৩০টি নদ-নদী, ভারত-মিয়ানমারের সাথে ৩২টি সীমান্ত জলসংযোগ, বঙ্গোপসাগরের সাথে ভারত মহাসাগরের মিতালী, ৩টি বিশ্ব ঐতিহ্য; বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন-সুন্দরবন, বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার (১২০ কিমি), ষাটগম্বুজ মসজিদ, বৌদ্ধ সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর বিহার, কুমিল্লার ময়নামতি ও শালবন বিহার, পৃথিবীর প্রাচীনতম বৌদ্ধ-বিদ্যাপীঠ ভাসু বিহার, মৌর্য সাম্রাজ্য ও রাজা পশুরামের মহাস্থানগড়, বেহুলা-লখিন্দরের স্মৃতি বিজড়িত গোকুল মেধ, বিশ্বের একক বৃহত্তম পাহাড়ি দ্বীপ-মহেশখালী, জীবন্ত প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনস, সাগরকন্যা-পটুয়াখালি যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়, পাহাড়ি কন্যা বান্দরবান, পৃথিবীর স্বর্গ সিলেট, সাজেক-স্বপ্নের ভ্যালি, কান্তজির মন্দির, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সাথে ৪৭টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস এই কল্পনার নগরীতে।
কৃষ্টির দিক থেকেও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। মহোৎসব ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেয় বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখকে। রমনার বটমূলের পাদদেশে শিল্পীদের কণ্ঠে, ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গানটির মাধ্যমে বাংলা নতুন বছরের প্রথমদিনকে স্বাগত জানানো হয়। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করা হয়।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এক মহোৎসবের মাত্রা যোগ হয়। বৈসবি, বিজ, সাংগ্রাই উৎসবে মেতে ওঠে বিভিন্ন উপজাতির মানুষেরা। বাংলার প্রত্যেকটি গ্রামে বসে বৈশাখী মেলা, নৌকাবাইচ খেলা, মিষ্টি ও জিলাপি নিয়ে আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়ার ধুম।
বাঙালির আতিথেয়তার ছাপ পাওয়া যায় বাংলার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে, একটি বাড়িও পাবেন না যেখান থেকে এক গ্লাস পানি না খেয়ে আপনাকে আসতে দেবে। আতিথেয়তার দিক থেকে শুধু এশিয়া নয় সারাবিশ্বের কাছে আমরা বাঙালিরা পরিচিত। তাই বললে ভুল হবে না ‘বাংলাদেশ গোটা পৃথিবীর আতিথেয়তার রাজধানী’।
আমরা উদযাপন করি পহেলা ফাল্গুন, চৈত্রসংক্রান্তি, পিঠা উৎসব, ফল উৎসব, লালন মেলা, পান্তা উৎসব। আর এসবের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ টিকিয়ে রেখেছে আপন সত্তাকে, বিলীন হতে দেয়নি তাদের ঐতিহ্যকে ও অতিথিপরায়ণতাকে।
বাংলাদেশের প্রত্যেকটি স্থান এক একটি পর্যটন কেন্দ্র। প্রত্যেকটি স্থানের আছে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও আলাদা আলাদা আবেদন। এ জন্যই বাংলাদেশ এতো বৈচিত্র্যময়।
লেখক: গেস্ট লেকচারার, বিবিএ ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট
ডেফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি