প্রতিবেদন

৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করতে হাইস্পিড ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিল সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সাথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থার ওপর দেশের অর্থনীতির গতিশীলতার অনেকখানিই নির্ভর করে। এই দুই শহরের মধ্যে দ্রুততম যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টরা নানাভাবে চেষ্টা চালালেও অবস্থার খুব যে উন্নতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। রেলযোগে বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা, সড়কপথে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ও বিমানে লাগে ৪০ মিনিট।
ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে এখনো পুরোপুরি ডাবল রেল লাইন চালু না হওয়ায় দুই-একটি বিলাসবহুল ট্রেন বাদে অন্য ট্রেনগুলোর ৯-১০ ঘণ্টাও লেগে যায়। অপরদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৪ লেনের হলেও পণ্যবাহী যানবাহনের অত্যধিক চাপ থাকায় যাত্রীবাহী বাসের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে অনেক সময় ১২ ঘণ্টাও লেগে যায়। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়নে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া-আসার সময় ১ ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে সরকার।
এ জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১১০ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়নের জন্য চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন ও বাংলাদেশের মজুমদার এন্টারপ্রাইজের সাথে চুক্তি করেছে সরকার।
ইতোমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালানোর ব্যাপারে সমীা পরিচালিত হয়েছে। সমীায় বলা হয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে ট্রেনে ৩২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালুর জন্য প্রস্তাবিত রেলপথের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ২৩৩ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা যাবে। এতে কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন ঢাকা যাবে এবং একইপথে ফিরে আসবে। হাইস্পিড ট্রেনের গতি হবে সর্বোচ্চ ৩০০ কিলোমিটার। এই ট্রেনে মাত্র ৫৫ মিনিটেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসা-যাওয়া করা যাবে। বর্তমানে এই পথ পাড়ি দিতে কমপে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে।
আগামী বছর এই হাইস্পিড ট্রেনের চালুর কাজ শুরু হলে ২০২৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে এ ট্রেন চালানো যাবে। সমীায় বলা হয়েছে, ওই বছরই ৪৫ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করতে হবে। চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালে ৫০ জোড়া, ২০৩৫ সালে ৬০ জোড়া, ২০৪০ সালে ৯৮ জোড়া ও ২০৪৫ সালে ১৪৪ জোড়া হাইস্পিড ট্রেন চালাতে হবে ঢাকা চট্টগ্রাম রুটের যাত্রী পরিবহনে।
চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন ও মজুমদার এন্টারপ্রাইজের প থেকে সমীা রিপোর্ট উপস্থাপনের পর নতুন চিন্তা মাথায় আসে যে, ঢাকা থেকে মাত্র ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামে পৌঁছার পর স্টেশন থেকে ইপিজেড যেতে যদি ৩ ঘণ্টা লাগে তাহলে হাইস্পিড ট্রেন চালুর উদ্দেশ্যই মাঠে মারা যাবে। ঢাকা থেকে বিমানে মাত্র ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামে আসার পর বিমানবন্দর থেকে শহরে আসতে যেমন ৩ ঘণ্টা লাগছে তখন ট্রেন থেকে নেমে কর্মস্থলে যেতে যদি ৩ ঘণ্টা লাগে তাহলে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। এ অবস্থায় ঢাকায় যেমন ৪০ মিনিটে ৪ ঘণ্টার পথ পাড়ি দেয়ার জন্য মেট্রোরেল চালু করা হচ্ছে তেমনি চট্টগ্রামেও ৫-১০ মিনিটের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য হাইস্পিড ট্রেন চালুর পরামর্শ দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপরে চেয়ারম্যান বরাবরে পাঠানো এক পত্রে নিজেদের আগ্রহের কথা জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে ট্রেনসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে প্রতিদিন ৬৯ হাজার ৭০০ যাত্রী ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে যাতায়াত করে। ২০৩০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১ লাখ ২১ হাজার, ২০৫০ সালে ৩ লাখ ১৪ হাজার, যা যথাক্রমে বর্তমানের ১.৭ ও ৪.৫ গুণ বেশি। এই বিপুলসংখ্যক যাত্রীর নিরাপদ যাতায়াতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন পরিচালনার বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশনের কান্ট্রি হেড জেং ইয়াং স্বারিত পত্রে মাত্র ৫৫ মিনিটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গত ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে তারা সমীা চালিয়ে উক্ত রুটে ৩০০ কিলোমিটার স্পিডে ট্রেন চালানো সম্ভব বলে নিশ্চিত হয়েছে। এতে ২৩৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ৫৫ মিনিট সময় লাগবে। ইউরোপের কথা বাদ দিলেও এশিয়ার চীন ও জাপানে আরো দ্রুত গতিতে ট্রেন চলে। তাই বাংলাদেশে ৩০০ কিলোমিটার স্পিডে ট্রেন চালানো কোনো অলীক কল্পনা নয় বলেও বিশেষজ্ঞদের প থেকে মন্তব্য করা হয়েছে।
চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন ও মজুমদার এন্টারপ্রাইজের প্রস্তাবের পরিপ্রেেিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপরে চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা প্রস্তাব পেয়েছি। আগামী মাসেই (ফেব্র“য়ারি) তাদের সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বার করবো। এরপরই মাঠ পর্যায়ের সমীা পরিচালিত হবে।
দেশি-বিদেশি যৌথ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের কোন কোন এলাকাকে ট্রেন নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে হবে, ট্রেন লাইনের নকশা কি হবে, কত জোড়া ট্রেন চলাচল করবে বা পুরো প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হবে তা বিস্তারিত উল্লেখ করে সমীা রিপোর্ট প্রদান করবে।