খেলা

আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে স্থান পেলেন কাটার মাস্টার মুস্তাফিজ

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ওয়ানডে দলে জায়গা করে নিয়েছেন কাটার মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমান।
গত ২২ জানুয়ারি আইসিসি ২০১৮ সালের ওয়ানডে একাদশ ঘোষণা করেছে। ওয়ানডে দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ভারতের বিরাট কোহলি। এই দলে বাংলাদেশের একমাত্র মুস্তাফিজই স্থান পেয়েছেন। গেল বছর দুর্দান্ত পারফরমেন্সের কারণেই এই বাঁ-হাতি পেসার ওয়ানডে বিশ্ব একাদশে স্থান পেয়েছেন বলে ক্রিকেটবোদ্ধাদের ধারণা।
২০১৮ সালে ১৮টি ওয়ানডে খেলে ২৯ উইকেট শিকার করেন মুস্তাফিজ। ১৪৯ দশমিক ৫ ওভার বল করে ৬৩০ রান খরচ করেন দ্য ফিজ। তার বোলিং গড় ২১ দশমিক ৭২।
বর্ষসেরা এই দলে ভারত-ইংল্যান্ড থেকে সর্বোচ্চ ও সমান ৪ জন করে খেলোয়াড় সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে একজন করে খেলোয়াড় আছেন। তবে পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দণি আফ্রিকার কোনো খেলোয়াড়ের জায়গা হয়নি।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিস্ময় বালক মুস্তাফিজুর রহমান অভিষেকেই ভারতের বিপে ৫ উইকেট নিয়ে সেই যে আলো ছড়িয়েছেন, সেই জয়যাত্রা অব্যাহত আছে এখনও। নিজের আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ভারতের বিপক্ষে তিনি নেন ৬ উইকেট। ওই দুই ম্যাচের পারফরম্যান্স দেখে ভারতীয় ক্রিকেটাররাই প্রথমবারের মতো মুস্তাফিজকে কাটার মাস্টার বলে অভিহিত করেন। আর প্রথমবার আইপিএলে খেলতে গেলে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা তাকে সম্বোধন করতে থাকেন মি. ফিজ বলে। সেই থেকে মুস্তাফিজ হয়ে যান কাটার মাস্টার মি. ফিজ।
মুস্তাফিজের লেখাপড়ার ব্যাপারে বেশ সাবধান ছিলেন বাবা ব্যবসায়ী আবুল কাশেম। তিনি চাইতেন ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু সেই বাবাই পরে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে এখন আর আমার নাই, ও এখন ১৬ কোটি মানুষের। ওর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া লাগবে না, ও ক্রিকেটই খেলুক।
সাতীরা থেকে ৪৫ কিলোমিটার দেিণ কালীগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে মুস্তাফিজের বাড়ি। তার জন্ম ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বরে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি।
পরিবারের সব প্রতিকূলতার মধ্যে মুস্তাফিজের পাশে এসে দাঁড়ান তার সেজো ভাই মোখলেছুর রহমান। তিনিই নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন আজকের মুস্তাফিজকে।
জানা যায়, মুস্তাফিজের ভাই মোখলেছুর রহমান ও তার মেজো ভাই জাকির হোসেন গ্রামে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতেন। ১০-১২ বছর বয়স থেকে মুস্তাফিজও তাদের সঙ্গী হন। গ্রামের তেঁতুলিয়া মাঠের এক খেলায় তারা তিন ভাই-ই খেলছিলেন। তখন মুস্তাফিজ ব্যাটিং করতে ভালোবাসতেন। প্রতিপরে একজন ব্যাটসম্যানকে কিছুতেই আউট করা যাচ্ছে না। মুস্তাফিজের হাতে তিনি তুলে দিলেন বল। প্রথম বলেই মুস্তাফিজ প্রতিপরে সেই অপ্রতিরোধ্য ব্যাটসম্যানকে আউট করেন। তারপর থেকেই বোলার হওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন মুস্তাফিজ।
মোখলেছুর রহমান প্রতিদিন ভোর রাতে মোটরসাইকেলে করে তার ছোট ভাইকে তেঁতুলিয়া থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে সাতীরা নিয়ে যেতেন প্রশিণের জন্য। অনূর্ধ্ব-১৪ হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলে ধারাবাহিকভাবে সফল হয়েছেন মুস্তাফিজ। এরপর আসেন ঢাকার শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে। সেখানে এসে কোচদের নজর কাড়েন। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ খেলে জাতীয় দলে নাম লেখান ক্রিকেটার হিসেবে।
এর আগে মুস্তাফিজ সাতীরা স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব-১৪ প্রাথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হন। তারপর সাতীরায় ক্রিকেট একাডেমির মুফাসিনুল ইসলামের কাছে প্রশিণ নেয়া শুরু হয় তার।
মুস্তাফিজের ক্রিকেট কোচ আলতাফ হোসেন জানান, সৌম্য ও মুস্তাফিজ দুজনই তার শিষ্য। দুজনই যে একসঙ্গে জাতীয় দলে খেলছে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছুই নেই।
মুস্তাফিজের আরেক কোচ মুফাসিনুল ইসলাম তপু বলেন, মুস্তাফিজ প্রথমে ব্যাটসম্যান হতে চেয়েছিল। কিন্তু তার বোলিং স্টাইল দেখে আমি তাকে বোলার হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। সে আজ জাতীয় দলের আলোচিত বোলার, এটি আমার জন্য গর্বের।
বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে সবাই চেনে নড়াইল এক্সপ্রেস নামে। মুস্তাফিজকে কিন্তু কেউ সাতীরা এক্সপ্রেস নামে ডাকে না। আদর করে পুরো বিশ্বের ক্রিকেটানুরাগীরাই তাকে মি. ফিজ বলে ডাকে।
সাতক্ষীরার সেই ছোট্ট ছেলেটি ক্রিকেট খেলতে এসে সারা দুনিয়ার বাঘা বাঘা ক্রিকেটারের সমীহ আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে স্থান দিয়ে মুস্তাফিজ যে এক ব্যতিক্রমী ক্রিকেটার তার মূল্যায়ন এবার করল আইসিসি।
এবার আইসিসি বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশ রয়েছেন: বিরাট কোহলি (ভারত) (অধিনায়ক), রোহিত শর্মা (ভারত), জনি বেয়ারস্টো (ইংল্যান্ড), জো রুট (ইংল্যান্ড), রস টেইলর (নিউজিল্যান্ড), জস বাটলার (ইংল্যান্ড-উইকেটরক), বেন স্টোকস (ইংল্যান্ড), মুস্তাফিজুর রহমান (বাংলাদেশ), রশিদ খান (আফগানিস্তান), কুলদীপ যাদব (ভারত) ও জসপ্রিত বুমরাহ (ভারত)।