প্রতিবেদন

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর আশ্বাস ইইউর

নিজস্ব প্রতিবেদক
রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ। যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে ইইউ মনে করে। এছাড়া সব ধরনের পণ্য রফতানিতে জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রাখবে বলেও আশ্বস্ত করেছে ইইউ।
গত ১৫ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইইউ প্রতিনিধিদল বাণিজ্যসচিব মফিজুল ইসলামের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হয়। তিন সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনজি তিরিঙ্ক। এ সময় ইইউ অ্যাম্বেসির ইকোনমিক মিনিস্টার উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকশেষে বাণিজ্যসচিব জানান, বাংলাদেশের রফতানির একটি বড় অংশ যায় ইউরোপের ২৮টি দেশে। ইইউতে রয়েছে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা। এ অবস্থায় ইইউর সঙ্গে দ্বিপীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা জরুরি। তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। দেশে কমপ্লায়েন্স কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের জন্য। ইইউ এসব েেত্র বাংলাদেশকে সহযোগিতা বাড়াতে চায়। তৈরি পোশাকের ন্যায্য দামের বিষয়ে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে ইইউ কাজ করছে।
বাণিজ্যসচিব বলেন, তৈরি পোশাকের উপযুক্ত মূল্য পেতে পণ্যের মান আরও বাড়াতে হবে বলে যে তাগিদ দিয়েছে ইইউ সে প্রসঙ্গে আমরা বলেছি, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাম বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন। এজন্য আমরা আমাদের ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বাড়ানোসহ উচ্চ মানসম্পন্ন পণ্যের দিকে মনোযোগ দিয়েছি। নিম্নমানের পণ্য দিয়ে দাম বাড়ানো বা বাজার বাড়ানো যাবে না বলে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই পণ্যের মান বৃদ্ধির কাজ করছে। এতে আমরা এখন অনেক ভালো করছি।
মফিজুল ইসলাম আরও বলেন, ইইউ এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের উন্নতি হচ্ছে এবং বাংলাদেশের শ্রমিকরা উপকৃত হচ্ছেন। আশা করা হচ্ছে আগামীতে এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি তৈরি পোশাক আমদানি করবে। এলডিসি দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আগামী ২০২৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রদান করা হবে। এজন্য বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে।
বাণিজ্যসচিব তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কারণে সরকার ও শিল্প মালিকদের গৃহীত পদেেপর প্রশংসা করেন। এছাড়া শ্রমিক ইস্যু, আইএলও কনভেনশন, মজুরি বোর্ড, পোশাক খাতের কমপ্লায়েন্সসহ অন্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প থেকে জানানো হয়, তৈরি পোশাক কারখানাগুলো উন্নত করে গড়ে তোলা হয়েছে। বিল্ডিং ও ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করা হয়েছে। উন্নত ও কর্মবান্ধব পরিবেশও নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন অনেক গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়ে উঠছে। বিশ্বের ১০টি বড় গ্রিন কারখানার মধ্যে বাংলাদেশে রয়েছে ৭টি। কাজের পরিবেশ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ভালো।
এছাড়া সরকার বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধন করেছে। শ্রমিকরা এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শ্রম অধিকার ভোগ করছেন। রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশে আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। শ্রমিক ও মালিকরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎপাদন বৃদ্ধির ল্েয কাজ করছেন।
এজন্য ইইউর প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, বিল্ডিং ও ফায়ার সেফটি নিশ্চিতকরণ এবং কর্মবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। রেনজি তিরিঙ্ক এদেশের তৈরি পোশাকের মূল্য বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি পোশাকের দাম বাড়াতে সংশ্লিষ্ট ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনাসহ এ খাতের সহযোগিতায় ইইউ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে রেনজি তিরিঙ্ক আশা প্রকাশ করেন।
গত এক দশকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমানের ব্যাপক উন্নয়নে ইইউ বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায় ৭৪ শতাংশ গত ৩০ বছরে নগরবাসী হয়েছেন। একসময় যে শ্রমিক শহরে একা এসেছিল, এখন সে আর একা নয়; পরিবারসহ শহরে বাস করেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী। তবে প্রায় ৩ শতাংশ নারী শ্রমিকের পরিবারে কোনো কর্মম পুরুষ নেই। তারা একাই কাজ করে সংসার চালান। একইভাবে প্রায় ২ শতাংশ পুরুষ শ্রমিকও পরিবারে এককভাবে কাজ করে সংসার চালান। তবে দুই দলের কেউই একা থাকেন না। তাদের সঙ্গে আছে তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরা। প্রায় ১৩ শতাংশ নারী শ্রমিক মনে করেন, সংসার তিনিই চালান। বাংলাদেশি নারীরা তাদের এ সমতার কথা গর্বের সঙ্গে বলছেন Ñ গার্মেন্টস শিল্পের ব্যাপক বিস্তার ও প্রসারের কারণেই।
উল্লেখ্য, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতির পাশাপাশি তাদের পরিবারে এখন শিার আলো পৌঁছাচ্ছে। এমনকি শ্রমিকদের কন্যা সন্তানের ১২ শতাংশ আর ছেলে সন্তানের প্রায় ৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করছে।
৯৩ শতাংশ নারী শ্রমিক মনে করেন, গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করার কারণে পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার বেড়েছে। আর ৯৮ শতাংশ নারী মনে করেন, এ শিল্প তাদের স্বাবলম্বী করেছে।
এ খাতের অন্যতম ক্রেতা হওয়ায় ইইউ বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ও এর শ্রমিকদের অগ্রগতি খুব কাছে থেকেই লক্ষ্য করেছে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনজি তিরিঙ্ক এদেশের তৈরি পোশাকের মূল্য বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।