প্রতিবেদন

সরকারের সফল উদ্যোগে এক হলো তবলীগ জামাতের দুই গ্রুপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের সফল উদ্যোগে গত দুই বছর ধরে চলা তবলীগ জামাতের দু’পরে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেছে। উভয়প এক সঙ্গে আগামী ১৫-১৭ ফেব্র“য়ারি বিশ্ব এজতেমা করবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গত ২৩ জানুয়ারি সচিবালয়ে তবলীগ জামাতের দু’পরে সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বৈঠকে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় এজতেমার দুই পরে মুরব্বিদের কোলাকুলি ও কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে।
বৈঠকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, ভারতের দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে তাবলীগের শুরা সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ওয়াসেকুল ইসলাম, দেওবন্দপন্থিদের মধ্যে শুরা সদস্য মাওলানা জুবায়ের আহমেদ, শোলাকিয়া ঈদগাহর ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশের মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তবলীগ জামাত দুটি প হয়ে গেছে। মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি, আরেকটি মাওলানা জুবায়েরের নেতৃত্বে। দু’পরে সবাই এসেছিলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন থেকে একসাথে টঙ্গীতে বিশ্ব এজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। দু’পই শান্তিপূর্ণভাবে সেই এজতেমাতে অংশগ্রহণ করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে, সবসময় উভয়পরে দু’জন বসে সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা যৌথভাবে বিশ্ব এজতেমার নেতৃত্ব দেবেন এবং এর ভাবমূর্তি যাতে আর ক্ষুণœ না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।
এদিকে জানা যায়, যাকে নিয়ে বিরোধ সেই দিল্লী মারকাজের প্রধান মাওলানা সাদ কান্ধলভী পরবর্তী বিশ্ব এজতেমায় আসবেন না।
বিশ্ব এজতেমায় নিরাপত্তার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খান বলেন, প্রতি বছর আমরা কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। সম্পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী করে থাকে, প্রয়োজনে সেনাবাহিনীও সহযোগিতা করে থাকে, সে ব্যবস্থা এখনও থাকবে। বিশ্ব এজতেমা যাতে সুন্দরভাবে হয় প্রতিবারের মতো সে জন্য নিরাপত্তা বাহিনী দায়িত্ব নেবে। নিরাপত্তাজনিত কোনো ঘাটতি থাকবে না।
বিরোধ মীমাংসায় সমন্বয়কারীর ভূমিকায় থাকা কাকরাইল মসজিদের ইমাম মাওলানা মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘যে ভুল-বোঝাবুঝি ছিল তা মিটমাট হয়ে গেছে। উভয়প সম্মত হয়েছে যে বিশ্ব ইজতেমা একবারেই হবে। এখন আর বিরোধ নেই।’
তবলীগ জামাতের দুই পরে দ্বন্দ্বের বিষয়ে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি এতটাই বিতর্কিত হয়ে গেছে যে, আমরা এখন কিছু না বললে এটা পরিষ্কার হচ্ছে না। আপনারা জানেন, ইতোমধ্যে বিষয়টি হাইকোর্টে রিট পিটিশন পর্যন্ত গেছে। সেখানে কথাবার্তা ভালো আসেনি। যেটার জন্য আমাদের দেশ, আমাদের ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও টঙ্গীর বিশ্ববিখ্যাত ইজতেমার গায়ে একটু কলঙ্ক লাগছে। এটা নিরসনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নেতৃত্বে আমরা বসেছি। তবে এতদিন দু’প কিন্তু একসঙ্গে বসেনি। এখন এসেছে, আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে আলাদা আলাদাভাবে। আমরা চিন্তা করছিলাম দু’পকেই এক জায়গায় বসাতে হবে। আজ দু’পরে সবাই একত্রিত হয়ে সুন্দরভাবে বসেছেন।
সর্বশেষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, ঐক্যবদ্ধভাবে একটাই এজতেমা হবে, দুটি হবে না। সারাদেশে গোলমাল যা হচ্ছে, এটা কাম্য নয়। এটা মেটানোর ফয়সালা হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে একটা জামাত করব। সিদ্ধান্ত ফাইনাল হয়ে গেছে Ñ এজতেমা দুই গ্র“পে হবে না। সবাই মিলে এক সঙ্গে হবে। এক গ্র“পের মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলাম ও আরেক গ্র“পের মাওলানা জুবায়েরকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, তবলীগ জামাতের দিল্লীর আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্য নিয়ে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে বাংলাদেশের তবলীগ জামাত। আলেমরা সাদবিরোধী ও সাদপন্থি দুই গ্র“পে বিভক্ত হয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। এক গ্র“পে রয়েছেন সাদ কান্ধলভিপন্থি বাংলাদেশে তবলীগের শূরা সদস্য সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম। অপর গ্র“পে রয়েছেন মাওলানা সাদবিরোধী কওমিপন্থি শূরা সদস্য মাওলানা জুবায়ের আহমেদ। এ বিভক্তি চরম রূপ ধারণ করে গত বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ব এজতেমার সময় মাওলানা সাদের বাংলাদেশে আসার পর। বিরোধীদের বাধার মুখে এজতেমায় অংশ না নিয়েই মাওলানা সাদকে ওই সময় বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল।
গত ১ ডিসেম্বর এজতেমা মাঠে দুই পরে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
টঙ্গীতে তুরাগ নদীর তীরে বিশ্বের মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্মেলন বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করে আসছিল তবলীগ জামাত। ইতঃপূর্বে একসঙ্গে হলেও গত কয়েক বছর যাবৎ ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে অঞ্চলভেদে দুই পর্বে এটি হয়। এবারও দু’প নির্বাচনের আগে আলাদাভাবে এজতেমার তারিখ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সরকার দুই পরে সঙ্গে আলোচনা করে এজতেমা স্থগিত করে। সরকারের প থেকে তখন জানানো হয়েছিল, নির্বাচন শেষে দু’পরে সঙ্গে বসে অভিন্ন এজতেমার তারিখ নির্ধারণ করা হবে। সেই মোতাবেক এখন সরকারের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ আলোচনায় বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জমায়েত তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা একই দিন একই স্থানে যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে, এতে অনাকাক্সিক্ষত কোনো বিভক্তি থাকবে না।