প্রতিবেদন

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল বিজয় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বান : জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্য দিয়ে সুষম উন্নয়নে কাজ করবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। অংশগ্রহণমূলক এ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গত ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল বিজয় সমাবেশের আয়োজন করে।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ছাড়াও দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী ও মোহাম্মদ নাসিম, দলের কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা আজম, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ক ম মোজাম্মেল হক, মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দেিণর সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান ও শাহে আলম মুরাদ বক্তৃতা করেন। দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সমাবেশটি পরিচালনা করেন।
দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে আওয়ামী লীগের পে সমাবেশে অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন।
৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এটাই ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম জনসভা। সমাবেশে জনতার উপচেপড়া ভিড় কাকরাইল মোড় হয়ে মৎস্য ভবন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। পল্টন থেকে হাইকোর্ট-কদম ফোয়ারা-দোয়েল চত্বর হয়ে টিএসসি মোড় ও সমগ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতকর্মীরা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে নেচে-গেয়ে, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে উদ্যানমুখী খ- খ- মিছিল নিয়ে আসতে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জয়বাংলা স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে তোলেন। অনেকে লাল-সবুজের পতাকা মাথায় দিয়েছেন, সবুজ টি-শার্ট, ক্যাপও পরেছেন অনেকে।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিজয় সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হলেও সকাল থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন মমতাজ, ফাহমিদা নবী, সালমা ও জলের গান ব্যান্ড দল। এছাড়া মাইকে দেশাত্মবোধক, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া গান বাজানো হয়। মাঝে মধ্যে কবিতাও আবৃত্তি করা হয়।
মুহুর্মুহু করতালি আর গগনবিদারী স্লোগানের মধ্যদিয়ে বেলা ৩টার কিছু সময় পরে মঞ্চে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় আবারো সংগীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মমতাজ।
ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণের প্রদত্ত আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্য দিয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার দলমত নির্বিশেষে সবার সুষম উন্নয়নেই কাজ করে যাবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ দিয়ে ভাষণ শুরু করে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে জয়-পরাজয় একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। আওয়ামী লীগ নৌকা মার্কায় জনগণের ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয়মতা হাতে এসেছে, যখন দায়িত্ব পেয়েছি, আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি দলমত নির্বিশেষে সকলের জন্যই সরকার কাজ করে যাবে।
সরকার প্রত্যেকের অধিকার নিশ্চিত করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতেক্যের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। প্রত্যেক মানুষের জীবনমান নিশ্চিত করা হবে। সেখানে কোনো দল বা মত দেখা হবে না। প্রতিটি নাগরিক আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সেবা করার দায়িত্ব জনগণ আমাদের দিয়েছে। কাজেই যারা ভোট দিয়েছেন বা ভোট দেননি সকলের প্রতিই ধন্যবাদ জানিয়ে আমি বলবো, আমরা সকলের তরে, সকলের জন্য আমরা কাজ করব।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের পে জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত রায় দিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সেই ভোটের সম্মান যেন থাকে, আমরা সবসময়ই সেই বিষয়টা মাথায় রেখে দেশের জনগণের স্বার্থে সার্বিকভাবে দেশের সুষম উন্নয়ন করে যাব।
প্রধানমন্ত্রী নৌকার বিপুল বিজয়কে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণরায় বলে উল্লেখ করেন এবং এগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, যে রায় জনগণ দিয়েছে, এ রায় হচ্ছে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে।
শেখ হাসিনা জনগনের মানসিকতার প্রতিফলনের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষের যে আকাক্সক্ষা, তা পূরণ করা আমাদের কর্তব্য।
বিজয় অর্জনের চেয়ে বিজয় ধরে রেখে জনসেবা করা আরো কঠিন কাজ Ñ মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, এই কঠিন কাজ আমরা পেয়েছি। সর্বশক্তি দিয়ে সেই কঠিন দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে। সেটাই আমি সকলকে মনে করিয়ে দিতে চাই।
দেশের জনগণ শান্তি ও উন্নয়নের জন্য নৌকাকে ভোট দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ শান্তি ও উন্নয়ন চায়। সেইসাথে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাক সেটাও তারা চায়।
বাংলাদেশকে ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের রায় বাংলাদেশকে ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে গড়ে তোলার পরে রায়। জনগণ অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার রায় দিয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন সমাজ প্রতিষ্ঠাই তাঁর ল্য উল্লেখ করে জনগণের এই রায়কে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার পরে রায় বলেও প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন।
৩০ ডিসেম্বরের রায় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি রায় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের কোনো স্থান হবে না। দুর্নীতিবাজ, জঙ্গিবাদ ও মাদকের কোনো স্থান হবে না। বাংলাদেশ গড়ে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের বিজয় শুধু আওয়ামী লীগের বিজয় নয়, এটা স্বাধীনতার পরে শক্তির বিজয়। এ বিজয় এদেশের জনগণের বিজয়। কারণ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জনগণকে ভোট প্রদানের জন্য এবং ভোটের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা ও নির্বাচন কমিশনের সকল সদস্যের প্রতি ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা এ সময় আওয়ামী লীগের তৃনমূলের নেতাকর্মীদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদপে গ্রহণ করেছে এবং এ কথাটা নিশ্চয়ই তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, ঐক্যবদ্ধ শক্তিই সবসময় বিজয় অর্জন করে। এই নির্বাচনে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে সকল রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সকল রাজনৈতিক দলের সকলকেই আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কারণ তারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচনকে অর্থবহ করেছে।
নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে আওয়ামী লীগ সরকারের অতীতের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যে অঙ্গীকার করেছি তা অরে অরে পালন করবো এবং আজকের সমাবেশে সে কথাই আমি বলে গেলাম।
এ সময় তিনি বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ’৭৫-এর বিয়োগান্তক অধ্যায় বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে স্মরণ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে এই দেশকে গড়ে তুলবো বলে আমি আমার জীবনকে উৎসর্গ করেছি। আমার অঙ্গীকার, দেশে একজন ুধার্ত মানুষও থাকবে না, কেউ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে না, সকলের জীবন-মান উন্নত হবে, সকলের আবাসস্থল নিশ্চিত হবে, তরুণ প্রজন্ম কাজ পাবে, বাংলদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।
চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়াকে গুরুদায়িত্ব আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগকে বারবার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। জাতির পিতা যে স্বল্পোন্নত দেশ রেখে গেছেন, সেখান থেকে আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে, সেখান থেকেই দেশকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে এই সরকার।
শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আগামী দিনে সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলাদেশ। এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা আর এটাই আমাদের ল্য।
এই ল্য বাস্তবায়নে তিনি দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গড়ে তুলে মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এটাই আমি মনে করি যে, মানুষকে কতটুকুু দিতে পারলাম, তাদের জন্য কতটুকু করতে পারলাম Ñ সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। কী পেলাম, কী পেলাম না সেটা কোনো বড় কথা নয়। জাতির পিতার আদর্শ ধারণ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েই সরকার দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলায় সকলের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, আসুন সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে গড়ে তুলি। আমাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করি ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য।
বিশ্ব দরবারে প্রতিটি বাঙালি যেন মাথা উঁচু করে চলতে পারে, এর জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা আওয়ামী লীগ সরকার করবে বলে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়তা দেন। শিার আলো প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে দিয়ে প্রতিটি গ্রামকে শহরের সুবিধা দিয়ে গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের পাশাপাশি ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও ২০৪১ সাল নাগাদ ুধা এবং দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন।