প্রতিবেদন

অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করলেন শেখ হাসিনা

সাবিনা ইয়াসমীন
স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমির খোলা প্রান্তরে পাকুড় গাছের নিচে (বর্তমান নজরুল মঞ্চ) স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদের ব্যানারে মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা চট বিছিয়ে সেই যে একুশে ফেব্রুয়ারি বই বিপণন শুরু করেছিলেন, তা আজ বিশাল মহীরুহ। গত ১০ বছরের মতো এবারও পহেলা ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমির মাসব্যাপী গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সম্মানিত বিদেশি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা ভাষার প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ এবং মিসরের প্রখ্যাত লেখক-সাংবাদিক ও গবেষক মোহসেন আল-আরিশি। প্রকাশক প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, এ মেলা, প্রাণের মেলা। এটি শুধু বই কেনা-বেচার জন্য নয়, আমাদের বাঙালির প্রাণের মেলা। আমার তো মনটা পড়ে থাকে এই গ্রন্থমেলায়।
তিনি বলেন, আগে যখন মতায় ছিলাম না তখন গ্রন্থমেলায় আসতাম, ঘুরে বেড়াতাম। এখন বলতে গেলে এক ধরনের বন্দিজীবন যাপনই করতে হয়। ইচ্ছে থাকলেও যখন-তখন আসার আর সুযোগ হয় না। আসতে গেলে সরকারি বিধিবদ্ধ প্রটোকলের কারণে সাধারণ মানুষের অসুবিধা হয়। নিরাপত্তার কারণে মানুষের যে অসুবিধা হবে তা বিবেচনা করে আর আসার ইচ্ছাটা হয় না। তবে সত্যি বলতে কী, মনটা পড়ে থাকে এখানে।
তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির এই যুগে মুদ্রিত বই কি হারিয়ে যাবে? এমন প্রশ্ন পুরনো। এদিন নতুন করে প্রসঙ্গটি সামনে আনেন অনুষ্ঠানের সভাপতি আনিসুজ্জামান।
একই প্রসঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, যতই আমরা যান্ত্রিক হই না কেন, বইয়ের চাহিদা কখনও শেষ হবে না। নতুন বইয়ের মলাট, বই শেলফে সাজিয়ে রাখা, বইয়ের পাতা উল্টে পড়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, আমরা সবসময় তা পেতে চাই।
সামনে বসে থাকা বইপ্রেমীরা করতালির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সব বই অনলাইনে দেয়া এবং ডিজিটাল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
বহু কষ্ট করে মাসব্যাপী মেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এজন্য একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গ্রন্থমেলা আয়োজন করে বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী এ দিন গুরুত্বপূর্ণ দলিলের ভিত্তিতে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। জাতির পিতা যখন আইন বিভাগের ছাত্র সেসময় এই আন্দোলন শুরু করেন। সদ্যপ্রকাশিত বইতে তথ্য পাওয়া যায় যে, জাতির পিতা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তুলেন। তমদ্দুন মজলিস, ছাত্রলীগ ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনকে নিয়ে একটি ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলন শুরু করেন। ১১ মার্চ থেকে সে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয়। বই থেকে একটি প্রতিবেদন পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী, যেখানে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ গোপালগঞ্জে হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এসএম একাডেমি এবং এমএন ইনস্টিটিউটে ৪০০ ছাত্র শহরে বিােভ মিছিল বের করে। স্লোগান ছিল: রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। নাজিম উদ্দীন নিপাত যাক। মুজিবকে মুক্তি দাও।
শেখ হাসিনা বলেন, অর্থাৎ আন্দোলনের শুরুতেই ১১ মার্চ শেখ মুজিবসহ অনেক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকায় জুলুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। এ উপলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে ছাত্রছাত্রীদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় শেখ মুজিব, দবিরুল ইসলাম ও নাদিরা বেগম বক্তৃতা করেন। সভায় শেখ মুজিব বলেন, এক মাসের মধ্যে ছাত্রদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণ করা না হলে ছাত্ররা প্রত্য সংগ্রামে নামবে।
শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের ১৯৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী। এই পাঠ থেকেও ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সম্পর্কে জানা যায় বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।