রাজনীতি

তারেক রহমানসহ বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফেরাতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ সরকার যুক্তরাজ্যে পলাতক দ-িত আসামি তারেক রহমান এবং বঙ্গবন্ধুর বাকি খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এ বিষয়ে সরকারের পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ শুরু করেছে।
টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের প্রথম বছরেই সরকার তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে চায়। সেই ল্েয দ্রুততম সময়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে জানান, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তিটি স্বারের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত আলোচনা সম্পন্ন হলে আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে কাক্সিক্ষত চুক্তিটি সম্পন্ন হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চুক্তিটি সম্পন্ন হলে চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ও দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামি তারেক রহমানকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করার দরকার, আমরা সবই করছি। এ রকম দ-িত ব্যক্তির বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকার।’
ড. মোমেন বলেন, ‘শুধু তারেক রহমান নয়, ১৫ আগস্টের যারা খুনি, তারা বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে। তাদের নিয়ে আসার জন্য আমরা বিভিন্ন সময়ে তৎপরতা চালিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা সফল হতে পারিনি। এবার নিশ্চয়ই আমরা সফল হব। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসাটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা বড় চ্যালেঞ্জ।’
এর আগে গত বছরের জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী জানিয়েছিলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুনি মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশেই আইনি পদপে গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। খুনি নূর চৌধুরীর বিষয়ে ইতোমধ্যে কানাডার ফেডারেল কোর্টে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ৫ আসামির মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। আসামি আবদুল আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে মৃত্যুবরণ করে। বাকি ৬ দ-প্রাপ্ত আসামি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে পালিয়ে আছে। এদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় ও রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অপর পলাতক আসামিদের মধ্যে খন্দকার আবদুর রশিদ পাকিস্তানে, শরিফুল হক ডালিম লিবিয়া অথবা জিম্বাবুয়ে এবং আবুল মাজেদ সেনেগাল অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হয়। রিসালদার (অব.) মোসলেহ উদ্দিন জার্মানিতে অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হলেও এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। পলাতক এ সকল খুনির অবস্থান নিশ্চিতকরণের ল্েয সকল কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
অপরদিকে একটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদ- এবং একটি মামলায় ৭ বছরের কারাদ-ে দ-িত হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত বছরের জুন মাসে বাংলাদেশ সরকারের প আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে তারেক রহমানকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করা হয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান। এই আবেদনের পরিপ্রেেিত তারেক রহমান বলেছিলেন, তাকে দেশে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হবে। এ জন্য তিনি দেশে যেতে আগ্রহী নন। তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার কার্যক্রম ও সে কার্যক্রমের তথ্যাদি ব্রিটিশ হোম ডিপার্টমেন্টের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। ওই মামলায় তারেক রহমানের মৃত্যুদ- হয়নি, যাবজ্জীবন হয়েছে।
মামলার রায়ের পর সরকার আবার যুক্তরাজ্যের কাছে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আবেদন জানায়। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর এ ব্যাপারে একটি শুনানি শুরু হয়েছে। যে শুনানিতে আত্মপ সমর্থন করে তারেক রহমানের আইনজীবী একটি লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা এবং এর পে তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং তথ্যাদি এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে সরকার মনে করে তারেক রহমান দুর্নীতির মামলায় দ-িত এবং তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের অর্থপাচার আইন অনুযায়ী আর্থিকভাবে অস্বচ্ছ এবং আর্থিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রাখেন না। তারেক রহমানের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের যোগাযোগ রয়েছে। যারা জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদে জড়িত, যুক্তরাজ্যে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে লন্ডন থেকে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, নাশকতার পরিকল্পনা এবং নানা রকম সহিংসতা ঘটানোর জন্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে এবং তার প্রমাণ যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে তুলে ধরেছে সরকার। এসব প্রমাণের পরিপ্রেেিত যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী সে দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে কেউ যদি দেশে সহিংসতা বা নাশকতা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে তার রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের অধিকার খর্ব হয়ে যায়। তারেক রহমান যেহেতু দুটি মামলায় দ-িত হয়েছেন এবং দুটি মামলার একটাতেও তার মৃত্যুদ- হয়নি; সেহেতু তার এই দ-টা কার্যকরের জন্য সর্বোচ্চ আদালতের বিচার এখনো বাকি আছে। কাজেই ন্যায়বিচারের স্বার্থেই রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল করে তারেক রহমানকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত দেয়া উচিত বলে মনে করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে তারেক রহমান কারাগার থেকে জামিন পেয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। ওই সময়ে তার সঙ্গে তার স্ত্রী ও দুই মেয়েও লন্ডনে যান।