অর্থনীতি

বেসরকারি খাতকে প্রণোদনা দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা কমিয়ে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরে গত ৩০ জানুয়ারি আগামী ৬ মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন।
এর আগের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। নতুন ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির এই ল্যমাত্রা দশমিক ৩ শতাংশ কমিয়ে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ ধরা হয়েছে; যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ২ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে অর্থাৎ ব্যাপকহারে প্রণোদনা কমানো হয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে এবং এর বিপরীতে সরকারি খাতে প্রণোদনা কমানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে সামঞ্জস্য আরো নিবিড় করার জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা কমানো হয়েছে এবং সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে।
মুদ্রানীতি ঘোষণা করে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬.৫০ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৬.৮০ শতাংশ।
ফজলে কবির জানান, নতুন মুদ্রানীতিতে বিভিন্ন ল্যমাত্রা প্রাক্কলনের েেত্র খুব একটা পরিবর্তন আসছে না। কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মুদ্রানীতির কৌশল নির্ধারণে বিভিন্ন পরে সঙ্গে মতবিনিময় করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সবার সঙ্গে আলোচনার পরই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
মুদ্রানীতি ঘোষণার সূচনা বক্তব্যে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ২০১৮ সালের জুন শেষে ৫.৭৮ শতাংশ গড় বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বর ২০১৮ শেষে ৫.৫৪ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ২০১৯ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেটে প্রিেপত ৫.৬০ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমার নিচে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে বন্যাজনিত ফসলহানির প্রতিকূলতা অতিক্রম করে খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এই সাফল্য অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৮ সালের জুন মাসের শেষে সার্বিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৭.১৩ শতাংশ থেকে কমে ডিসেম্বর মাসে ৬.২১ শতাংশে নেমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত ভোক্তা মূল্যস্ফীতি জুনের শেষে ৩.৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে কোর মূল্যস্ফীতি ২০১৮ সালের জুন শেষে ৩.৮২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ ডিসেম্বরে ৪.৬৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
ফজলে কবির বলেন, ২০১৮ সালের জুলাই-নভেম্বর মাসে ৪.৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঘাটতি বর্তমানে ২.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ কর্মকা-ের সূত্রে এই ঘাটতি বাড়লেও পূর্ববর্তী অর্থবছরে ৯.৭৮ মার্কিন ডলারের বিপরীতে চলতি অর্থবছর শেষে তা ৬.৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পরিমিত থাকবে বলে প্রিেপত হয়েছে।
মুদ্রানীতির সূচনা বক্তব্যে বলা হয়েছে, করপোরেট খাতের অত্যধিক ব্যাংকনির্ভর মেয়াদি অর্থায়নকে ক্রমশ মূলধন বাজারে বন্ড ইস্যু করে অর্থায়নের দিকে মোড় ঘোরাবার চলমান প্রয়াসের পাশাপাশি ুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের মেয়াদি অর্থায়ন আহরণের সরলতর বিকল্পটির বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রবর্তন এখন সময়োচিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর বলেন, বাংলাদেশের মূলধন বাজারের সূচকের গতিধারা এখন আন্তর্জাতিক বাজারের সূচকের গতিধারার সঙ্গে বহুলাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা মূলধন বাজারে বৈদেশিক পোর্টফলিও বিনিয়োগ আন্তঃপ্রবাহ বৃদ্ধি সুগম করে আমাদের মূলধন বাজারের গতিশীলতা বৃদ্ধি করবে। গণচীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভের সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট হওয়ার সূত্রে প্রত্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আন্তঃপ্রবাহ বেশকিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উদ্যোগটি ছাড়াও নতুন বহুজাতিক অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক, সচ্ছল দেশগুলোর সভরেন ওয়েলথ ফান্ড এবং খ্যাতনামা বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং প্রকৃত খাতের বড় করপোরেটগুলোর যোগাযোগ ও সম্পর্ক সূত্র সৃষ্টি প্রত্য ও পোর্টফলিও বিনিয়োগ আন্তঃপ্রবাহ দ্রুত বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এদিকে মুদ্রানীতির টার্গেট সমর্থনযোগ্য বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতির টার্গেট সমর্থনযোগ্য। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে এর সামঞ্জস্য রয়েছে। তবে ল্যমাত্রা ঠিক থাকলেও বাস্তবায়ন করাটাই সমস্যা। অবশ্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই টার্গেট পূরণ করা অসম্ভব নয়। মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬.৫ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতির চেয়ে ০.৩ শতাংশ কমিয়ে ধরা হয়েছে। বেসরকারি খাতের এই প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা জিডিপির প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহের ল্যমাত্রা কমেছে। অনেকে এটাকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে হয়েছে বলে মনে করেন।
এখন নির্বাচন শেষ হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা কমিয়েছে। এতে আশা করা যাচ্ছে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এখন আগের তুলনায় বাড়বে।