রাজনীতি

যে কারণে বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে ঐক্যফ্রন্ট শরিকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব থেকে ড. কামাল হোসেনকে সরিয়ে দেয়া প্রশ্নে বিএনপির মধ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই চাচ্ছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্বে আসুক বিএনপির কোনো নেতা। কেউ কেউ চাচ্ছেন ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দিতে। আবার অনেকের দাবি, ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্বে ড. কামাল হোসেনই থাকুক, তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতকে বের করে দেয়া হোক।
বিএনপির কয়েকটি পক্ষ যার যার মতো অবস্থান ঘোষণা করায় এখন স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনে ভরাডুবির কারণে ঐক্যফ্রন্ট শরিকদের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দিন যত যাচ্ছে, এই দূরত্ব ততই স্পষ্ট হচ্ছে।
ড. কামাল হোসেনকে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া উচিত Ñ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদের এমন মন্তব্যের পর বিএনপির সঙ্গে গণফোরামের দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে। এমনিতেই গণফোরামের নির্বাচিত দুই সাংসদের শপথের সিদ্ধান্ত নিয়ে উভয় দলের মধ্যে টানাপড়েন যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন সংকট হয়ে সামনে এসেছে হাফিজের মন্তব্য।
কামাল হোসেনকে নিয়ে বিএনপির অন্যতম এই শীর্ষ নেতার এই মন্তব্যের পর উভয় দলে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিএনপি ও গণফোরামের একাংশ মনে করে পরিকল্পিতভাবেই এই মন্তব্য করা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পরামর্শ অনেকের। আবার একটি প হাফিজ উদ্দিনের মন্তব্যকে পাত্তা না দিয়ে বিষয়টিকে একেবারেই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কারও কারও মতে, হাফিজ উদ্দিনের মন্তব্যের কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ভাঙন দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে দূরত্ব বেড়েছে উভয় জোটের মধ্যে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব থেকে ড. কামাল হোসেনকে সরিয়ে বিএনপির কাউকে দায়িত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি এ মন্তব্য করার পর রাজনীতির মাঠে এখন নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তিনি বলেন, বিএনপির উচিত পরীতি বন্ধুদের জোট বিশ দলকে আরও গুরুত্ব দেয়া এবং ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে ড. কামালকে সরিয়ে দেয়া।
তবে ঐক্যফ্রন্ট তথা গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, কারও ব্যক্তিগত মন্তব্যে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। তাছাড়া এ বিষয়টিকে তিনি খুব একটা আমলে নিতে চান না বলেও জানান।
এদিকে ৩০ জানুয়ারি গণফোরামের ৫ম কাউন্সিলের প্রস্তুতি সভায় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে হাফিজ উদ্দিনের বক্তব্যের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। গণফোরামের তৃণমূলের নেতারা এই মন্তব্য প্রত্যাহার করার, অন্যথায় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিএনপিকে বাদ দেয়ার দাবি জানান তারা।
কামাল হোসেন প্রশ্নে হাফিজ বলেন, উনার বয়স হয়েছে। ফিটনেস নেই। তাই নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে হবে। তাছাড়া গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুই সাংসদের শপথ নেয়ার বিষয়ে তিনি শুরু থেকেই ইতিবাচক ছিলেন। এটি দল ও জোটগত সংহতির বিরুদ্ধ আচরণ বলেও মনে করেন বিএনপি নেতা মেজর হাফিজ (অব.)।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে বিএনপির কাউকে রাখার প্রস্তাব জানিয়ে হাফিজ বলেন, ঐক্যফ্রন্টে নেতৃত্বে বিএনপির নেতা হতে হবে অথবা এই জোটের কোনো প্রয়োজন নেই।
জবাবে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ঐক্যফ্রন্ট গঠন সঠিক হয়েছে কি হয়নি এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হতে পারে। তবে সামগ্রিক বাস্তবতা হলো, এই জোট রাখতে হবে। মানুষের কাছে এই জোটের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সবাই মিলে জোটের পরিধি বাড়াতে হবে। এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এই জোটকে।
চলার পথে নানা ধরনের সমালোচনা জোটকে আরও এগিয়ে নেবে বলেও মনে করেন তিনি।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর বিএনপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেন ড. কামাল হোসেন। নানা নাটকীয়তার পর নির্বাচনে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এই জোট। এর বড় কারণ হলো ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দল পরপর দু’বার নির্বাচনে অংশ না নিলে আইন অনুযায়ী নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। তাই নানা কৌশল অবলম্বন করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা আসে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের প থেকে।
জোট গঠনের আগে ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকায় বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করবেন না এমন কথা বহুবার বলেছেন, বঙ্গবন্ধু সরকারের সাবেক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপির এক সময়ের সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক মিত্র বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বাদ দিয়ে তিনি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে বসে যান। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় ড. কামাল হোসেনকে। সর্বশেষ বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয় ফ্রন্টের প থেকে। একই প্রতীকে জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের শরিক ও গণফোরাম তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নির্বাচনে অংশ নেন। ২৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচন করেন। এ নিয়েও সারাদেশে তুমুল বিতর্কের ঝড় ওঠে। কিন্তু নির্বাচনে মাত্র ৮ আসন পায় ঐক্যফ্রন্ট। এর মধ্যে ৬টি বিএনপির, বাকি ২টি গণফোরামের।
জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের ইস্যুতে কামাল হোসেন যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন এ নিয়ে নতুন ভাবনা তৈরি হয় গণফোরামে। দলের প থেকে একাধিক সংবাদ সম্মেলন করে কামাল হোসেন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কোনো ঐক্য নেই। জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনও বিশ্বাস করে না গণফোরাম।
বিএনপির সঙ্গে তাদের ঐক্য আছে, থাকবে বলেও জানান তিনি। সব মিলিয়ে জামায়াত নিয়ে বিএনপির সঙ্গে গণফোরামের ঠা-া লড়াই নির্বাচনের আগে থেকেই আঁচ করা যাচ্ছিল। নির্বাচনের পরে এসে এ ঠা-া লড়াই অনেকটা গরম হয়ে উঠেছে।
গণফোরামের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে ঐক্যের প্রশ্নে জামায়াত ইস্যুতে দলটির তৃণমূল নেতাদের আপত্তি রয়েছে শুরু থেকেই। তারা বলছেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দল জামায়াতের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তির কোনো আপস হতে পারে না। যদি বিএনপি জামায়াতকে ছেড়ে আসে তাহলেই একসঙ্গে পথচলা হতে পারে।
গণফোরামের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরুর সময় কামাল হোসেনকে বিএনপির প থেকে বলা হয়েছিল জামায়াতকে সবকিছু থেকে আলাদা রাখা হবে। এছাড়া জোটের শরিক দলগুলো নিজেদের প্রতীকে নির্বাচন করতে পারবে। তারপর গণফোরামের অনেকটা অগোচরেই ধানের শীষ প্রতীকে সবাইকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি, যার মধ্যে জামায়াতও ছিল। এ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন ড. কামাল হোসেন।
জানা গেছে, বিএনপির তীব্র আপত্তির মুখেও গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুই সাংসদ এখনও শপথ নেয়ার প।ে ইতোমধ্যে তারা গণমাধ্যমকে সে কথা জানিয়েছেনও। যেকোনো সময় তারা শপথ নিতে পারেন। ৩০ জানুয়ারি গণফোরামের সম্মেলন প্রস্তুতি সভায় মোকাব্বির হোসেন এলেও যোগ দেননি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। আলোচনা আছে আওয়ামী লীগের সাবেক এই নেতা ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাাৎ করেছেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা সুলতান মনসুর গণফোরামের প্রার্থী হলেও নির্বাচিত হয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকে। অপরদিকে সিলেট-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদীর লুনার প্রার্থিতা হাইকোর্ট বাতিল করলে গণফোরামের প্রার্থী মোকাব্বির খানকে উদীয়মান সূর্য প্রতীকে সমর্থন দেয় বিএনপি। নির্বাচনের পর থেকেই তাদের শপথ নিয়ে রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়। শুরুতেই নির্বাচিত দুজনই শপথ নেয়ার পে ছিলেন। কিন্তু দল ও জোটগত বিরোধিতার কারণে একপর্যায়ে তারা পিছু হটেন, তবে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর বলছেন, তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন।
এদিকে সংসদ শুরুর পরের ৯০ দিনের মধ্যে কেউ শপথ নিয়ে অঙ্গীকারনামায় স্বার না করলে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে সেখানে উপ-নির্বাচন দেয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সেক্ষেত্রে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খানকে ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
ফলে এখন বলা যায়, বিএনপি, গণফোরাম ও জামায়াত মুখোমুখি অবস্থানে আছে। এই অবস্থানে বিএনপির একাংশ চাচ্ছে জামায়াত তাদের সঙ্গেই থাক। জামায়াতকে পছন্দ না হলে গণফোরাম বরং ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাক।
বিএনপির জামায়াতপন্থি নেতারা বলছেন, বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ানো ছিল ড. কামালের অন্যতম এজেন্ডা। সরকারের সাথে পর্দার অন্তরালে নানা আলোচনার পর এই এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমে তিনি সফলও হয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দেশে বিদ্যমান সব দল অংশ নেয়। এমনকি জামায়াতের নেতারাও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়।
এখন অনেকেই বলছেন, ড. কামাল এবার তার দ্বিতীয় এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এজেন্ডাটি হলো জামায়াতকে বিএনপি থেকে বের করে দেয়ার এজেন্ডা।
এখন দেখার বিষয় হলো বিএনপি ড. কামাল হোসেনকে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব থেকে বের করে দেয়, না ড. কামাল হোসেন জামায়াতকে বিএনপি থেকে বের করে দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে জয় হবে ড. কামাল হোসেনেরই। তিনি যে চাল দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন, এখন একই কৌশল প্রয়োগ করে তিনি বিএনপি থেকে জামায়াতকে বের করে দেয়ার কাজটিও করবেন।
আবার অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, ড. কামাল হোসেন যত সহজে বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তত সহজে বিএনপি থেকে জামায়াতকে বের করে দেয়া সম্ভব নয়। বিএনপি প্রয়োজনবোধে ড. কামালকে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতার পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারে; কিন্তু জামায়াতকে ছাড়বে না। তবে অনেক রাজনৈতিক সমালোচক অবশ্য বলছেন, এর শেষ দেখার জন্য কি জাতিকে আগামী ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে?