প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ২৬ মার্চের আগেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, দেশে এখন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৩৮, আর সারাদেশে ১ লাখ ৮২ হাজার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। বিভিন্ন অনিয়ম ও অসঙ্গতির কারণে ২০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তবে যাদের নামে কোনো আপত্তি নেই, এমন মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আগেই প্রকাশের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে গত ৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মজিবুল হক চুন্নুর সম্পূরক প্রশ্নের
জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী একথা জানান। তিনি বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেেিত যে সমস্ত তালিকার বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি নেই, যেমন ভারতীয় তালিকা, লাল মুক্তিবার্তা, মুজিবনগর সরকারের যারা কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন, যারা সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, এছাড়াও নার্স, শিল্পী-কলাকুশলী যাদের বিষয়ে কোনো আপত্তি নেই তাদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিক্রমে মার্চ মাসের মধ্যেই তালিকা প্রকাশ করার চেষ্টা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, যাদের নামে আপত্তি এসেছে, তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। কিছুসংখ্যক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কারণে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানজনক আইডি কার্ড এখনও পাননি। তবে আগামী ২৬ মার্চের আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য আনোয়ার আবেদীন খানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মোজাম্মেল হক জানান, প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি জাতীয় পতাকার মতো রঙ দিয়ে সাজানোর প্রস্তাব সত্যিই খুব প্রশংসনীয়। বিষয়টি আমরা অবশ্যই বিবেচনা করব। যাতে দূর থেকে দেখেই মানুষ বুঝতে পারে এটি মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি।
আগামীতে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা আরও বাড়ানোর চিন্তাভাবনা সরকারের রয়েছে উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জানান, সারাদেশের স্থানীয় সরকার প্রশাসন বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডের দৃশ্যমান স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা বড় ফলকে লিখে তা টানানোর নির্দেশ দেয়া আছে।
সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খানের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, শহীদ ও অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরণের জন্য একটি প্রকল্প একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে প্রথম পর্যায়ে ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার কবর সংরণ করা হবে। পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের আওতায় দেশের সকল মুক্তিযোদ্ধার কবর সংরণ করা হবে।
এ কথা সত্য যে, ৪৭ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়নি। এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যতবারই পরিবর্তন করা হয়েছে, সংযোজন-বিয়োজন শেষে দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে গেছে। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে ৬ বার। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা, স্বীকৃত বয়স ও মানদ- পরিবর্তন করা হয়েছে ১১ বার। তারপরও একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।
বিগত বিএনপি সরকারের আমলে প্রায় ২২ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা গেজেটভুক্ত হয়েছে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৮ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিলের কথা বলা হলেও আইনি জটিলতা যেমন অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা গেজেট বাতিল হওয়ার পর আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন, ফলে বিষয়টি অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি নিয়ে অব্যবস্থাপনা ও জটিলতার অবসান ঘটাতে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি আন্তরিক দায়বদ্ধতা থেকে পরিপূর্ণ সততার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে একটা সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি ও প্রকাশের চেষ্টা তিনি করছেন, যে তালিকা হবে চূড়ান্ত, যাতে আর কোনো সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন থাকবে না।
জানা যায়, দেশে এখন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৩৮।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাদত হুসাইনের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গেজেটভুক্ত করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ মতায় এসে অভিযোগ করে, বিএনপি সরকারে থাকার সময় ৭০ হাজারের বেশি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করেছে। এর পর সরকার নতুন করে আরও সাড়ে ১১ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে গেজেটভুক্ত করে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে আরও ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম গেজেটভুক্ত করে।
দেখা যাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের নাম গেজেটভুক্ত করার ক্ষেত্রে এক আমলে যিনি মুক্তিযোদ্ধা অন্য আমলে তিনি অমুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছেন। একজনের মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাওয়ার বিষয়টির নিষ্পত্তি করা নিয়েই দীর্ঘদিন কাজ করছেন আ ক ম মোজাম্মেল হক। আওয়ামী লীগ সরকারের গত দুই টার্মের পুরোটা সময়ই তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তাই সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, তার দ্বারাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ সম্ভব হবে।