আন্তর্জাতিক

নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কায় বিশ্ব

স্বদেশ খবর ডেস্ক
ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউকিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) বা মাধ্যমিক পর্যায়ের পারমাণবিক অস্ত্রচুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহার করে নেয়ার পরদিন ২ ফেব্রুয়ারি রাশিয়াও এ চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু চুক্তিটির প্রতি দায়বদ্ধ না থাকা এবং ৬ মাসের মধ্যে এ চুক্তি থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয়ার পরপরই রাশিয়া এখনই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন নতুন ধরনের অস্ত্র বানাতে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন করার জন্য পাল্টা এই চুক্তি থেকে রাশিয়াকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ওয়াশিংটন একতরফাভাবে এবং সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে এই সিদ্ধান্ত নেয়ায় রাশিয়াও চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিল।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরমাণু চুক্তি থেকে দুই পক্ষই বেরিয়ে যাওয়ায় ঐতিহাসিক এই চুক্তিটির আসলে মৃত্যু ঘটেছে। বলা যায়, বিশ্বে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূত্রপাত ঘটল।
এদিকে ন্যাটো জানিয়েছে, এই চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার মিত্রদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ন্যাটো এও জানিয়েছে, রাশিয়ার ৯এম৭২৯ স্থল থেকে উৎপেণযোগ্য ক্রুজ পেণাস্ত্র পদ্ধতি এই চুক্তির লঙ্ঘন বলে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ করেছে তার সঙ্গেও তারা একমত।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে চুক্তিটির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। আবার প্রকাশ্যেই দেশটি তার অস্ত্র ভা-ার আধুনিকায়নের ঘোষণা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার নতুন পরমাণু নীতি ঘোষণা করে বলেছিল, তারা দুটি নতুন অস্ত্র ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে। একটি নতুন ধরনের কম মতাসম্পন্ন পরমাণু পেণাস্ত্র এবং অপরটি নতুন ধরনের ক্রুজ মিসাইল।
এ ধরনের অস্ত্র ক্রয় আইএনএফ চুক্তির লঙ্ঘন হলেও যুক্তরাষ্ট্র তখনই চুক্তিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা শুরু করে, যার বাস্তবায়ন ঘটায় ১ বছর পরের আরেক ফেব্রুয়ারিতে।
সে সময় পেন্টাগন বলেছিল, এই ধরনের অস্ত্র ক্রয়ের পরিকল্পনা করে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির লঙ্ঘন করেনি। অস্ত্রগুলো মোতায়েন হলেই চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আসবে।
যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই জোর দিয়ে বলে আসছে যে, ১৯৮৭ সালে মস্কোর সাথে করা চুক্তিতে অস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়নের েেত্র কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দফতরে মাইক পম্পেও বলেন, রাশিয়া অনেক বছর ধরে ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউকিয়ার ফোর্সেস নামে পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত এই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে আসছে। গত বছরের অক্টোবরে রাশিয়া চুক্তিটির শর্ত লঙ্ঘন করছে দাবি করে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউকিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) নামের দ্বিপাকি এ ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বার করেছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান।
২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট থাকার সময় বারাক ওবামা আইএনএফ লঙ্ঘন করে ক্রুজ পেণাস্ত্র পরীার অভিযোগ এনেছিলেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে। তবে ইউরোপীয় নেতাদের চাপের কারণে তিনি ওই চুক্তি প্রত্যাহার করা থেকে সরে যান। এর ৫ বছর পর তার উত্তরসূরী ডোনাল্ড ট্রাম্প এ চুক্তি থেকে সরে গেলেন।
পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিরা জোট ন্যাটোর মহাসচিব জেনারেল ইয়েন্স স্টল্টেনবার্গ জানান, ইউরোপের সবগুলো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে সম্মতি প্রকাশ করছে। কারণ রাশিয়া গত কয়েক বছর ধরেই এ চুক্তি ভঙ্গ করে আসছে। ইউরোপে তারা নতুন নতুন পরমাণু শক্তিধর পেণাস্ত্র মোতায়েন করছে।
গত ডিসেম্বর মাসে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তির শর্ত মেনে চলার জন্য রাশিয়াকে ৬০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিল। ট্রাম্প হুঁশিয়ার করে জানিয়েছিলেন, অন্যথায় ওয়াশিংটনও এ চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য থাকবে না।
এদিকে প্রেসিডেন্ট পুতিন তার পররাষ্ট্র ও প্রতিরা মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করে বলেছেন, তারা এখন নতুন অস্ত্র তৈরির কাজ শুরু করবেন। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে সমুদ্র থেকে উৎপেণ করা যায় এরকম ক্যালিবার ক্রুজ পেণাস্ত্র, নতুন হাইপারসনিক অস্ত্র ইত্যাদি। এসব হাইপারসনিক অস্ত্র শব্দের চেয়েও ৫ গুণ বেশি গতিতে ছুটে গিয়ে ল্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
তবে পুতিন বলেছেন, রাশিয়া ব্যয়বহুল অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র মোতায়েন করার আগে তারা কোথাও স্বল্প ও মধ্য-পাল্লার পেণাস্ত্র মোতায়েন করবে না।
১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বারিত পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের এই চুক্তিতে সব ধরনের পরমাণু অস্ত্র এবং স্বল্প ও মধ্য-পাল্লার পেণাস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর ফলে ১৯৯১ সালের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭০০ পেণাস্ত্র ধ্বংস করা হয় এবং দুটো দেশকেই একে অপরের স্থাপনা পরীা করে দেখার সুযোগ দেয়া হয়। তবে ২০১৭ সালে মস্কো এক ঘোষণায় দাবি করে, এ চুক্তি রাশিয়ার স্বার্থ রা করছে না।
স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপের শান্তি প্রক্রিয়ায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ওই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু দ্বিপাকি এই চুক্তি থেকে হঠাৎ করে দুদেশেরই বেরিয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বে নিরাপত্তা নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকে মন্তব্য করছেন, এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ট্রাম্প ও পুতিন উভয়েই অস্ত্রবাজের খাতায় নাম লেখালেন। নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতায় তারা সঙ্গে নেবেন কিমকে। তারপর অস্ত্র বাণিজ্যকে বেগবান করার জন্য দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে লাগিয়ে দেবেন যুদ্ধ।