প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

বাংলা একাডেমিতে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : নতুন প্রজন্মের কাছে বই হোক দেশের সঠিক ইতিহাস জানার মাধ্যম

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে। বাংলা একাডেমি আয়োজিত এ মেলা চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এবারের মেলার মূল থিম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বিজয়: ১৯৫২ থেকে ১৯৭১, নবপর্যায়’। বরাবরের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন।
এবার নিয়ে রেকর্ডসংখ্যক ১৬ বার বইমেলা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবি শঙ্খ ঘোষ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা ‘শেখ হাসিনা: যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়’ শীর্ষক গ্রন্থের মিসরীয় লেখক-সাংবাদিক মোহসেন আল-আরিশি। বইটির অনুবাদ প্রকাশ করছে বাংলা একাডেমি। লেখকের উপস্থিতিতে বইটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়া হয়। সেইসঙ্গে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া চার গুণীজনের হাতেও একই মঞ্চে পুরস্কার প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে নতুন প্রজন্মকে দেশের সঠিক ইতিহাস জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বই-ই হতে পারে দেশের সঠিক ইতিহাস জানার সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। কতটা ত্যাগ ও সংগ্রামের পথ পাড়ি দিলে একটি জাতি তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে পারে তা নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে।
তিনি বলেন, চলতি বছরের ১৭ই নভেম্বর একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের বিশ বছর পূর্তি হবে। ঊনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থান এবং বাংলার সংগ্রামী জনতার দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে অভিষিক্ত করারও ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে এসব ঘটনার ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ Ñ এসবের মাধ্যমেই বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
জাতির পিতার হাতে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রমতায় থাকায় জাতি সাড়ম্বরে আগামী ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসকে আমরা আরো স্বচ্ছভাবে মানুষের কাছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারবো বলে আমি বিশ্বাস করি।
শুধু মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নয়, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়েও অনেকে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং সম্প্রতি প্রকাশিত সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বই দুটিতে এসব বিভ্রান্তির অবসান হয়েছে বলে আমি মনে করি।
শেখ হাসিনা বলেন, মোট ১৪টি খ-ে প্রকাশিত হচ্ছে সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এসব দলিলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বইটির দ্বিতীয় খ- প্রকাশ করেন। যেখানে ১৯৫১ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকালীন বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের ওপর পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন েেত্র বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৪ গুণীজনকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১৮ তে ভূষিত করেন। পুরস্কার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বিজয়ীদের হাতে ২ লাখ টাকার চেক, ট্রফি ও সনদপত্র তুলে দেন।
বিজয়ীরা হচ্ছেন কাজী রোজী (কবিতা), মোহিত কামাল (কথাসাহিত্য), সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ (প্রবন্ধ ও গবেষণা) এবং আফসান চৌধুরী (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা)।
বইমেলাকে বাঙালির প্রাণের মেলা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইমেলা কেবল বই কেনা-বেচার জন্য নয়। যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলাম না, তখন নিয়মিত বইমেলায় এসেছি। এখন মেলায় এলে দর্শনার্থীদের সমস্যা হয়। নিরাপত্তার কারণে চলাচল বিঘœ হয়। এ কারণে আসতে পারি না। তবে মনটা বইমেলাতেই পড়ে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৮ সালে ভাষাআন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের পথ ধরে আমাদের স্বাধিকার আদায়। আর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা করার উদ্যোগ ’৯৬-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নেয়া হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, কানাডাপ্রবাসী প্রয়াত রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালামের মতো প্রবাসী বাঙালিদের আন্তরিক উদ্যোগ এবং তৎকালীন আমাদের সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে পৃথিবীর সকল ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরণ, বিকাশ ও চর্চার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা ভাষার প্রতি মর্যাদা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রতি বছর তিনি নিজেও জাতিসংঘে বাংলাতেই ভাষণ দেন।
বছরের প্রথম দিন শিার্থীদের হাতে বিনামূল্যে বই তুলে দেয়া, বৃত্তি দেয়া, উপবৃত্তি প্রদানসহ শিা সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, শিা অর্জনের মাধ্যমে মানুষ যাতে দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে তার জন্য আমরা কাজ করছি।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী গ্রন্থমেলায় পৌঁছলে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। সূচনা সঙ্গীত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি পরিবেশন করা হয়। পরে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
পরে বইমেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এবারের মেলায় ৫২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। এছাড়া ১৮০টি লিটলম্যাগাজিনকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৪টি প্রতিষ্ঠানের ১৫০টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের ৬২০টি ইউনিটসহ মোট ৪৯৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৭৭০টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া বাংলা একাডেমিসহ ২৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ১৮০টি লিটল ম্যাগকে ১৫৫টি স্টল দেয়া হয়েছে। ২৫টি স্টলে দুটি করে লিটল ম্যাগাজিনকে স্থান দেয়া হয়েছে। স্টল পেয়েছে অন্য ১৩০টি লিটল ম্যাগ।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গ্রন্থমেলা সবার জন্য উন্মুক্ত। ছুটির দিনে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলছে মেলা। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
বইমেলায় সকল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ ছাড়ে বই বিক্রি করছে। এবারের মেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৩ লাখ বর্গফুট এলাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিশুদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে শিশু চত্বর। প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার থাকছে শিশুপ্রহর। এতে শিশুরা অভিভাবকদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে মেলা উপভোগ করতে পারছে।
র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাকর্মীরা গ্রন্থমেলায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। তিন শতাধিক সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে মেলা। পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে মেলা প্রাঙ্গণকে।
লেখকের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ বাড়াতে প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের মেলায় চালু হয়েছে ‘লেখক বলছি’ নামের মঞ্চ। মঞ্চে প্রতিদিন পাঁচজন করে লেখক পাঠকের সামনে আসছেন নিজের নতুন বই নিয়ে। এছাড়া প্রতিদিন মূল মঞ্চে সেমিনার, বিশিষ্ট বাঙালি মনীষীর জন্মশতবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি ও তাদের কর্মজীবন নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে থাকছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা।
মেলার বই নিয়ে এবং স্টল সাজ-সজ্জার ওপর কয়েকটি পুরস্কার প্রদানের আয়োজনও করা হয়েছে।
মেলায় টিএসসি ও দোয়েল চত্বর দিয়ে দুটি মূল প্রবেশ পথ, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিনটি পথ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বাহির নিয়ে মোট ৬টি পথ রাখা হয়েছে।