প্রতিবেদন

২০০ কোটি টাকার রফতানি আদেশ পাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাণিজ্যমেলা

নিজস্ব প্রতিবেদক
শেষ হলো ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। এবারের বাণিজ্যমেলাকে সফল বলছেন সরকার ও ব্যবসায়ীরা। গত এক মাসে দর্শনার্থীর উপস্থিতি অর্ধকোটি পার হয়েছে এবং এ মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রফতানি অর্ডার পেয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার; যা গত বছরের চেয়ে ৩৫ কোটি টাকা বেশি। গত বছর ১৬৫ কোটি টাকার রফতানি আদেশ পাওয়া গিয়েছিল।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এসব তথ্য জানান।
এদিকে সদ্যসমাপ্ত ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা থেকে ৭ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হয়েছে। ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কর্তৃপ জানিয়েছে, স্টল থেকে সংগৃহীত ভ্যাটের চালান যাচাই করে দেখা যায়, মোট ভ্যাট সংগ্রহের পরিমাণ ৭ কোটি ১ লাখ টাকা, যা ল্যমাত্রার চেয়ে ১ কোটি টাকা বেশি।
মেলার শেষ দিন ৯ ফেব্র“য়ারি ভ্যাট আদায় হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা। হাতিল ও ওয়ালটনসহ ১০টি প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ভ্যাট প্রদানকারী কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত মেলার অন্যান্য দিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার ভ্যাট আদায় হয়েছে। মেলায় অংশ নেয়া অধিকাংশ পণ্যে ৫% ব্যবসায়িক ভ্যাট প্রযোজ্য। আইন অনুসারে প্রতিটি পণ্য ও সেবা ক্রয়ের সময় ভ্যাট চালান ইস্যু করা বাধ্যতামূলক।
ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কর্তৃপ জানিয়েছে, বাণিজ্য মেলায় সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদানকারী ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড ৯৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৪২ লাখ ১২ হাজার টাকা, স্কয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ৩৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ২৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা, বাটারফাই মার্কেটিং লিমিটেড ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা, আরএফএল ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ২১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা, ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেড ১৭ লাখ ২১ হাজার টাকা, নাভানা ফার্নিচার লিমিটেড ১৬ লাখ ৫২ হাজার টাকা, রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
বাণিজ্যমেলার সমাপনী দিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, রাষ্ট্রপতি ১ মাস আগে এই মেলার উদ্বোধন করেছিলেন। আজকে (৯ ফেব্রুয়ারি) অত্যন্ত সফলভাবেই বাণিজ্যমেলা শেষ হয়েছে এবং অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বিক্রিও ভালো হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি আরও বলেন, এ মেলায় মানুষের উপস্থিতি প্রায় অর্ধকোটি পার হয়েছে। বেচাকেনাও ভালো হয়েছে। বিদেশে রফতানি অর্ডারও পাওয়া গেছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
গত বছর ২৩তম আসরে ১৬৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকার রফতানি আদেশ পেয়েছিল। তার আগের বছর ২২তম আসরে মেলায় ২৪৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বা ৩০ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলারের স্পট অর্ডার এসেছিল। আর এ বছর বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো প্রায় ২০০ কোটি টাকা রফতানি আদেশ পেয়েছে।
এদিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশের মাঠ থেকে বাণিজ্যমেলা সরিয়ে নেয়ার জন্য ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার কমপ্লেক্স (বিসিএফইসি) নামের চীনের সহায়তায় ৭৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণখালীর বাগরাইয়াটেকে (পূর্বাচল) বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। শত কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে সম্প্রতি দায়িত্ব নেয়া বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলছেন, বাণিজ্যমেলা পূর্বাচলে করা সম্ভব নয়।
সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এ বিষয়ে বলেন, আমাদের মেলার চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, এখানে (শেরেবাংলা নগরের) অপ্রতুল আমাদের জন্য। মেলা করতে হিমশিম খেতে হয়। অনেকের ধারণা, আমরা পূর্বাচলের দিকে যেটা করছি, সেটা এ রকম বাণিজ্যমেলা হবে কি না। সেটা সম্ভবত হবে না। এখানে ৩৬ একরের ওপরে আমাদের জায়গা, তারপরও সংকুলান হয় না। আগামীতে পূর্বাচলে ৩০ একর জায়গায় এ মেলা আয়োজন করা সম্ভব কি না, তা এখন থেকেই ভাবতে হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর পর মেলার চাহিদা আরও বাড়বে। কারণ পূর্বাচলে ৩০ একর জায়গা এ মেলার জন্য অপ্রতুল। তবে সেখানে সারা বছর অন্যান্য মেলা চলবে। সম্ভবত ওখানে (পূর্বাচলে) সারা বছর ধরেই বিভিন্ন এক্সপোর্ট, মেলা বা শো হবে। বিদেশিরাও আসতে পারে। এসে আমাদের এখানে ওই ধরনের এক্সপোর্ট ফেয়ার করতে পারবে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা সেখানে আয়োজন করা যাবে না। তাই এখন থেকে আমাদের পদপে নিতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এবারের মেলায় সবচেয়ে লণীয় হলো, দেশি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বায়াররা আমাদের পণ্যে আকৃষ্ট হচ্ছেন।
সম্প্রতি চামড়া রফতানি কমেছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি আগাতে চাই, তাহলে আমাদের রফতানি বাড়াতেই হবে। এ েেত্র শুধু গার্মেন্টসের ওপর নির্ভর না করে আমাদের অন্যান্য আইটেম প্রোডাকশনেও যেতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব রেজওয়ান হোসেন বলেন, আমাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভিশন ২০২১, ২০৪১ ও ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করা। এজন্য আমাদের ব্যবসা বাড়াতে হবে। আর ব্যবসা বাড়াতে পণ্যের মানের পাশাপাশি সেবার মান বাড়াতে হবে। এখন অনেক কোম্পানিই আসছে যারা সেবাগ্রহণ করতে চাচ্ছে। আশা করি, আমরা সেবা রফতানির েেত্র ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য স্তরে পৌঁছাতে পারব। এেেত্র বাণিজ্যমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য বলেন, মেলায় এবারই প্রথম অনলাইনে টিকিট বিক্রি করা হয়। এতে বেশ ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। মেলায় আসা ক্রেতা-দর্শনার্থীদের জন্য ৫টি বিশ্রামাগার ও প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইল চেয়ার ছিল।
এদিকে এবারের মেলায় অংশ নেয়া ৬০৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরা ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দিয়েছে ইপিবি। অনুষ্ঠানেই বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরাদের গোল্ড কালার্ড ট্রফি এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান অধিকারীদের মাঝে সিলভার ট্রফি ও ব্রাস ট্রফি দেয়া হয়। এছাড়া ভ্যাট প্রদানকে উৎসাহিত করতে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তিন প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ভ্যাট প্রদানকারী হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ও এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড।
মেলায় অনন্য সম্মাননা পুরস্কার পেয়েছে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। সেরা প্রিমিয়ার প্যাভিলিয়ন ও সেরা সাধারণ প্যাভিলিয়নে প্রথম হয়েছে ওয়াল্টন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সেরা সংরতি প্যাভিলিয়নে প্রথম হয়েছে জুট ডাইভার্সিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)।
এবার বিদেশি প্যাভিলিয়ন ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে প্রথম হয়েছে জাপানের হালাল কোম্পানি লিমিটেড এবং তুরস্কের হাডেক্স হালি ডেরি টেক্সটাইল ডাইস টিআইসি এ এস। সেরা প্রিমিয়ার মিনি প্যাভিলিয়নে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সেরা সাধারণ মিনি প্যাভিলিয়নে বঙ্গ মিলার্স লিমিটেড, সেরা সংরতি মিনি প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশ পোস্ট অফিস, সেরা প্রিমিয়ার স্টলে এম/এস হেলাল অ্যান্ড ব্রাদ্রার্স এবং সেরা সাধারণ স্টলে প্রথম হয়েছে ফরচুন টেক লিমিটেড।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা ইউনেস্কো অটিজম কমিটির বিশেষ দূত সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের অনুপ্রেরণায় মেলার অভ্যন্তরে বিনোদনকেন্দ্র শারিকা ফ্যান্টাসি এমাজিং ওয়ার্ল্ডের কর্ণধার ঢাকা মহানগর দণি যুবলীগের সহ-সভাপতি মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান পলাশের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়। অটিস্টিক শিশুদের বিনামূল্যে বিনোদন দেয়ার জন্য চতুর্থবার এই সম্মাননা ক্রেস্ট পেলেন পলাশ।
৮ ফেব্রুয়ারি ছুটির দিন থাকাতে মেলা দারুণভাবে জমে ওঠে। এদিন মেলা সমাপ্তির কথা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেেিত তা একদিন বাড়ানো হয়।
৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই শুরু হয় মেলায় দর্শনার্থীদের চাপ। ভিড় এড়াতে অনেকেই সকালেই মেলামুখী হন। তবুও ভিড় এড়ানো যায়নি। দুপুরেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় মেলা প্রাঙ্গণ। এদিন শিশুদের তুলনায় বড়দেরই বেশি দেখা যায় মেলায়।
আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সারি বেঁধে মেলায় দর্শনার্থীরা আসছেন। দর্শনার্থীরা বলছেন, নানা ব্যস্ততার কারণে যারা এতদিন মেলায় আসতে পারেননি, তারা কষ্ট করে হলেও শেষ শুক্রবার মেলায় আসছেন। সন্ধ্যার দিকে মেলা প্রাঙ্গণে ছিল মানুষ আর মানুষ। প্রচ- ভিড়ে বিভিন্ন স্টল ও প্যাভিলিয়নে প্রবেশ করারও সুযোগ পায়নি অনেকে। ভিড় নেই এমন একটি স্টলও খুঁজে পাওয়া যায়নি। খাবার, কাপড়, আসবাবপত্র, কসমেটিকস, জুয়েলারি, প্লাস্টিক, তাঁত, জুতা কিংবা ঘর সাজানো নানা ফার্নিচার সব স্টল প্যাভিলিয়নে মানুষ। কোনো দর কষাকষি নয়, হরদম কেনাকাটা সবখানেই। ক্রেতাদের পছন্দ হলে নিচ্ছেন আর বিক্রেতারাও ক্রেতাদের হাতছাড়া করতে নারাজ। বিভিন্ন ছাড় ও অফার দিয়ে পণ্য ছেড়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা।
এদিকে ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের বেচাকেনাও জমজমাট ছিল শেষ সময়ে। বিশেষ করে ওয়ালটন, মিনিস্টার, শার্প, স্যামসাং, সনির বিভিন্ন পণ্য দেখার পাশাপাশি কিনেছেন দর্শনার্থীরা। মেলার একটি স্টলে যেকোনো ফ্রিজ কিনলেই নগদ টাকাসহ ওভেন ফ্রি। মেলায় শার্প সবচেয়ে বড় ফ্রিজে ২৫ হাজার টাকা ছাড় সঙ্গে ওভেন ফ্রি দিয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো পণ্যে ৩ থেকে ১০ হাজার টাকার ছাড় দিয়েছে শার্প। আবার সনি প্যাভিলিয়নে দেখা গেছে পণ্যের সঙ্গে হীরের গয়না উপহার দেয়া হচ্ছে।
থ্রি-পিসের স্টলে দেখা গেছে, তিনটি থ্রি-পিস বিক্রি হয়েছে ৫৯৯ টাকায়। ছেলেদের ব্লেজারেও চলেছে ধামাকা অফার। ১ হাজার টাকায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ডিজাইনের ব্লেজার, যা মেলার শুরুতে আঠরোশ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। মেলার শুরুতে ইতালিয়ানো তাদের নির্দিষ্ট কিছু ক্রোকারিজ পণ্য ২০ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি করেছে। শেষ দিনে সেগুলো ৪০ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি হয়। ইতালিয়ানোর সেলস এক্সিকিউটিভ বলেন, আমরা অল্প লাভ রেখে পণ্য ছেড়ে দেয়ায় বেচাকেনাও বেশ ভালো হচ্ছে। মেলায় ৫০ শতাংশ ছাড়ে জুতা বিক্রি করছে র‌্যাভেঞ্জ প্যাভিলিয়ন।
এবারের মেলায় প্যাভিলিয়ন ছিল ১১০টি, মিনি-প্যাভিলিয়ন ছিল ৮৩টি ও রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য স্টল ছিল ৪১২টি। বাংলাদেশ ছাড়াও ২২টি দেশের ৫২টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেয়।