কলাম

কৃষিবিদ দিবস ২০১৯: বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই কৃষির গৌরবোজ্জ্বল অগ্রগতি

ড. মো. আলী আকবর
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের মতো কৃষিবিদদের চাকরি প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদাসম্পন্ন বলে ঘোষণা দেন। তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণার পথ ধরেই আজ কৃষিবিদগণ সরকারি চাকরির েেত্র প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কৃষিশিা ও কৃষিবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদানের ঐতিহাসিক ঘোষণা আজও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে স্লোগান হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধুর অবদান-কৃষিবিদ কাস ওয়ান’ সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জাতির পিতার স্মৃতি জাগানিয়া ঐতিহাসিক স্থানটি চিহ্নিত করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি চত্বর।’ জাতির জনকের দেয়া কৃষিবিদদের ঐতিহাসিক এ সম্মানকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৩ ফেব্র“য়ারি জাঁকজমকপূর্ণভাবে কৃষিবিদগণ দিবসটিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন। এ বছরও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দিবসটি পালনে ক্যাম্পাসে নানা কর্মসূচি পালন করেছে।
বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি উন্নয়ন মূলত জাতীয় উন্নয়নেরই সমার্থক। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনজীবিকা প্রত্য বা পরোভাবে কৃষির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কৃষিতে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন করায় বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দণি এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। সেই সঙ্গে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ফল ও শাকসবজির উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত গতিতে। দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের প্রচেষ্টায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বহুলাংশে এ সফলতার গর্বিত অংশীদার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এখন প্রয়োজন খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন তথা গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশকে অবারিত করার মাঝেই নিহিত। এজন্য প্রয়োজন দ জনবল, প্রয়োজন উচ্চ প্রশিতি কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী পৃথিবীতে বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তাছাড়া সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে চতুর্থ, পাট রফতানিতে প্রথম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থান অর্জন করেছে এবং শাকসবজি ফল উৎপাদনে বিস্ময়কর সফলতা কৃষিউন্নয়ন অগ্রযাত্রার অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত।
দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৬ শতাংশ। স্বাধীনতার পর হতে গত প্রায় পাঁচ দশকে কৃষি জমি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেলেও শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চার গুণ।
বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের প্রায় সবাই ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম উচ্চতর কৃষিশিা ও গবেষণার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এ যাবৎ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪৭ হাজার ২৬৮ জন গ্র্যাজুয়েট, যার মধ্যে ২৮ হাজার ১২৯ জন স্নাতক, ১৮ হাজার ৪১৬ জন এমএসসি/এমএস এবং ৭২৩ জন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনসহ কৃষির এ বিরল সাফল্য অর্জনে দেশের লাখো কোটি কৃষকের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে উত্তীর্ণ কৃষিবিদদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। ক্রমবর্ধমান বিপুল জনসংখ্যার বাংলাদেশে মানসম্মত উচ্চতর কৃষি শিাদান এবং কৃষি উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব বহনে সমর্থ দ কৃষিবিদ, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করাই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। জাতিসংঘ ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ল্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণ করেছে। সে অনুযায়ী ুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদিত শক্তি ও উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ভিশন ২০২১ ও ২০৪১-এর মাধ্যমে উন্নয়নের রূপকল্প ঘোষণা করেছেন। সেই সাথে আগামী ২১০০ সাল পর্যন্ত ডেল্টা প্ল্যান তৈরিও সম্পন্ন করেছেন। তার এ ঘোষণা বাস্তবে রূপ দিতে শোষিত-বঞ্চিত জাতিকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্যঘাটতি পূরণ, পুষ্টি সরবরাহ, আত্ম-কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে এসডিজির এ ল্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের ফসল খাতের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদের গুরুত্ব অপরিহার্য।
আগামী দিনগুলোতে কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো পরিবেশ রা, জমির একক প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও ঝুঁকি মোকাবিলা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষিতে আইসিটির ব্যবহার এবং সকলের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধান করা। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিজ কৃষির বিকাশের মাধ্যমে এ ল্য পূরণ করতে হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের ধারাবাহিকতায় আগামী দিনের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টি এবং কৃষি শিা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টারের মাধ্যমে কৃষি গবেষণায় ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪১৯’ স্বর্ণপদক লাভ আমাদের অন্যতম অর্জন। এ ছাড়া ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ওয়েবমেট্রিক্স র‌্যাঙ্কিং অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিসে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
কৃষির এ অর্জনের মাধ্যমেই জাতির এ মহানায়কের সম্মান রা করেছে কৃষিবিদ সমাজ। জাতির পিতা কর্তৃক কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রাপ্তির দিনটিকে কৃষিবিদ দিবস হিসেবে পালনের তাৎপর্য এখানেই।
লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়