প্রতিবেদন

ডাকসু নিয়ে মুখরিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

মো. ইয়াছির আরাফত
আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে ঢাবি ক্যাম্পাস। এই নির্বাচনকে ঘিরে মধুর ক্যান্টিনসহ ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এদিকে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও টিএসসিভিত্তিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে প্যানেল গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে ছাত্রলীগ।
অন্যদিকে ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে করার দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে টিএসসিভিত্তিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জোট ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মিলিত শিার্থী সংসদ’ ও ছাত্রলীগের যৌথ সংবাদ সম্মেলন হয়। এতে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও টিএসসিভিত্তিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে ছাত্রলীগের প্যানেল গঠনের ইঙ্গিত দেয়া হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী ও ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন।
রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ডাকসুর কাজ হলো বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শিার্থীদের মেধার বিকাশে কাজ করা। টিএসসিভিত্তিক সংগঠনগুলো মূলত এই কাজই করছে। তাই আমরা মনে করি, ডাকসু নির্বাচনে তাদেরও অংশগ্রহণ থাকা উচিত। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, ক্রিয়াশীল, সৃষ্টিশীল ও দেশের কল্যাণে কাজ করতে ইচ্ছুক, তাদের একটি প্যানেল দিয়ে কাজ করতে চাই।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ডিবেটিং কাবের সভাপতি এস এম রাকিব সিরাজী। তিনি বলেন, আমরা (ছাত্রলীগের সঙ্গে) একটা জায়গায় একমত। সেটা হলো মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তর এবং বাংলাদেশ প্রশ্নে। সে জায়গা থেকেই আমরা কাজ করতে চাই। এ সময় তিনি ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে-ভিতরে এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে যেন ডাকসু নির্বাচন ভেস্তে না যায়, এ বিষয়ে সচেতন থাকতে ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ঢাবি সায়েন্স সোসাইটির সভাপতি প্রত্যাশা সাহা, চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি কাইয়ুম জয়, গবেষণা সংসদের সভাপতি সাইফুল্লাহ সাদেক প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলেও ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৬ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দিনের মতো মধুর ক্যান্টিনে আসেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৯ বছর পর সেখানে এসেছিলেন তারা। ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জন নেতাকর্মী মধুর ক্যান্টিনে আসেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান। দুপুরে মধুর ক্যান্টিন ত্যাগ করেন তারা।
এদিনও মধুর ক্যান্টিনে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। তবে কাউকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি। পরে সেখানে একটি সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদল। এতে শুধু ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়, বরং ক্যাম্পাসে ‘স্থায়ী সহাবস্থান’ নিশ্চিতের দাবি জানায় সংগঠনটি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান বলেন, আমরা সবসময় ক্যাম্পাসে আসতে চাই। আমাদের কর্মীরা যেন বিনা বাধায় হলে অবস্থান করতে পারে সেটির নিশ্চয়তা চাই। আমরা সবসময় ক্যাম্পাসে আমাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের আগেই নয়, ক্যাম্পাসে সবসময়ের জন্য সহাবস্থান চায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এসে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
রাজীব আহসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় সহাবস্থান নেই। আমাদের নেতাকর্মীরা হলে থাকতে পারে না। সহাবস্থানের স্থায়ী সমাধান হোক এটাই আমাদের চাওয়া।
তিনি আরো বলেন, আমরা শুধু ডাকসু নির্বাচনকেন্দ্রিক সহাবস্থান চাই না, আমরা চাই সবসময় ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকুক।
দেশের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন দাবি করে রাজীব আহসান বলেন, ছাত্রদল চায় ছাত্ররা তাদের অধিকার ফিরে পাক। এ সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ডাকসু নির্বাচনের পুনঃতফসিল ঘোষণার দাবি করেন।
ছাত্রদলের আরেক নেতা আকরামুল হাসান বলেন, আমাদের দাবির পরিপ্রেেিত ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা এ যাত্রা অব্যাহত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। আমরা ডাকসু নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত থাকতে চাই।
এদিকে আগামী ১১ মার্চ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলেই রাখার বিষয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে টিএসসিভিত্তিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর প্ল্যাটফর্ম সম্মিলিত শিার্থী সংসদ।
অপরদিকে হলের বাইরে একাডেমিক ভবনগুলোয় ভোটকেন্দ্র করার দাবি জানিয়ে আসছে ছাত্রদল ও বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর প্ল্যাটফর্ম প্রগতিশীল ছাত্রজোট। তবে মধুর ক্যান্টিনে ডাকসু নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলেনে ছাত্রলীগ ও টিএসসিভিত্তিক ২২টি সংগঠনের সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম ‘সম্মিলিত শিার্থী সংসদ’ হলেই ভোটকেন্দ্র রাখার দাবি জানিয়েছে।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বক্তব্য দেন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক সংসদের সভাপতি এস এম রাকিব সিরাজী।
এখন পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রসংগঠন হিসেবে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কিন্তু কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় ১৮টি হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী বাছাইয়ে সমস্যায় রয়েছে ছাত্রলীগ। কারণ কেন্দ্রীয় সম্মেলনের ৯ মাস পরও দফায় দফায় ঘোষণা দিয়েও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি ছাত্রলীগ। এতে অনেক ত্যাগী কর্মীর মূল্যায়ন হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ ছাড়া সব পদই এখনও খালি পড়ে আছে।
এ কারণে কে কোন পদে নির্বাচন করবেন তা নিয়ে তৈরি হয়েছে দ্বিধা। কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পদ শূন্য থাকায় বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজেও ধীর গতি রয়েছে।
গত কমিটির এক সদস্য এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে লোক না থাকায় সংগঠনের গতি মন্থর হয়ে আছে। কারা ছাত্রলীগে থাকবেন, ডাকসু নির্বাচনে কারা থাকবেন তা নিয়েও ধোঁয়াশায় রয়েছেন অনেক নেতা।
প্রতিটি হলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের আলাদা অনুসারী গোষ্ঠী আছে। প্রতিটি গ্র“প থেকে একাধিক ছাত্রলীগ নেতা হল সংসদের ভিপি-জিএস প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। হল কমিটির ছাত্রলীগের সদ্যসাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের কোনো পদ না থাকায় তারাও হলে প্রার্থী হতে পারেন। এর বাইরেও অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ইচ্ছা দেখিয়েছেন।
১৫ ফেব্র“য়ারি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডাকসু নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের এক মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে ছাত্রলীগের সাবেক ৫ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বর্তমান কমিটির ৪ জন উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বদেশ খবরকে বলেন, এই বৈঠকটি বর্তমান এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মতবিনিময় সভা ছিল। সবাই মিলে কিভাবে ডাকসু নির্বাচনে কাজ করা যায়, সেই বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে বিভিন্নভাবে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল স্বদেশ খবরকে বলেন, আমি এখনো নিয়মিত শিার্থী। হল সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে শিার্থীদের জন্য কাজ করেছি। হল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংগঠন থেকে যেখানে প্যানেল দেয়া হবে, সেখানে নির্বাচন করতে প্রস্তুত।
হল সংসদে কাদের প্রার্থী করা হবে সে বিষয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, হল সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকে যাদের ছাত্রত্ব আছে, জনপ্রিয় তারা মনোনয়ন পেতে পারেন। যারা বিতর্কিত কাজ করেছে, তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। হল সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের বাইরেও কেউ যদি জনপ্রিয় থাকে, তবে তাদের ডাকসু নির্বাচনে নমিনেশন দেয়া হবে।