ফিচার

বিলুপ্তির পথে রয়েল বেঙ্গল টাইগার!

স্বদেশ খবর ডেস্ক
সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের জাতীয় পশু। এর মতো সুন্দর ও প্রি গতির বাঘ পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। হলদে ডোরাকাটা রঙ এই বাঘকে অন্যসব প্রজাতির বাঘ থেকে করেছে আলাদা ও অনন্য।
বাংলাদেশে বাঘের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবন। বাংলাদেশ ছাড়াও এদের বিচরণ রয়েছে ভারতের সুন্দরবন অংশে, নেপাল ও ভুটানে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গায়ের রঙ হলুদ থেকে হালকা কমলা রঙের হয় এবং ডোরার রঙ হয় গাঢ় খয়েরি থেকে কালো। পেটটি হচ্ছে সাদা এবং লেজ কালো ছোপযুক্ত সাদা। লেজসহ একটি পুরুষ বাঘের দৈর্ঘ্য ২১০-৩১০ সেমি যেখানে মাদি বাঘের দৈর্ঘ্য ২৪০-২৬৫ সেমি। পুরুষ বাঘের গড় ওজন ২২১.২ কেজি এবং মাদি বাঘের ১৩৯.৭ কেজি। গড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা সাইবেরিয়ান বাঘের চেয়ে বড়।
একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দূর থেকে শোনা যায়।
বাংলাদেশে সুন্দরবনই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ আশ্রয়স্থল। মানুষের অগ্রাসনে গোলপাতার ঝোপ আর গাছ যেভাবে কমে যাচ্ছে, তাতে বাঘের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জঙ্গলে খাদ্যঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এভাবে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্তির হুমকিতে অবস্থান করছে।
বাঘ নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে ‘সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’ সাময়িকীতে। গবেষকদলের সদস্য অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিল লরেন্স বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে ১০৬টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। বিশ্বের বিড়াল প্রজাতির সবচেয়ে বড় এ প্রাণীর এই সংখ্যা একেবারেই অল্প। একসময় সুন্দরবনের বিশাল এলাকাজুড়ে এদের বিচরণ ছিল। আর এখন ছোট ছোট এলাকায় একরকম অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রাণীগুলো।
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বাঘের বাসস্থান সুন্দরবনের বড় অংশ ডুবে যেতে পারে। এতে বিশেষত বাংলাদেশ অংশে বাঘ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ওই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক শরীফ মুকুল। গবেষকেরা জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাসকে আমলে নিয়ে এই গবেষণা করেছেন। একই সঙ্গে এই পূর্বাভাসের প্রভাব বাঘের বসতি এলাকা সুন্দরবনে কতটুকু পড়বে, সেই হিসাবও করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের বাঘ-বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুন্দরবনের বাঘের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া বড় হুমকি। একই সঙ্গে চোরা শিকারিদের হাতে বাঘ শিকার ও সুন্দরবনের পাশের শিল্পায়নকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেছেন তারা।
ঐতিহাসিকভাবে সুন্দরবন একটি সক্রিয় ব-দ্বীপ এলাকা। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে এর সঙ্গে আসা পলির কারণে এই বন আরও উঁচু হতে পারে। তাই সাধারণ একটি ভূখ- যেভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ডুবে যাওয়ার হুমকিতে থাকে, সুন্দরবনের জন্য সেই হুমকি ততটা নেই। তবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াকে তাঁরা হুমকি হিসেবেই মনে করেন।
গবেষণাটি সম্পর্কে শরীফ মুকুল বলেন, সুন্দরবনের চারপাশে শিল্পকারখানার চাপ বাড়ছে। সেখানে সড়ক নির্মাণ হচ্ছে এবং চোরা শিকারিদের দাপট বাড়ছে। এতে বাঘের বসতি এলাকার বিপদও বাড়ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ যোগ হয়ে তা বাঘকে আরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে বাঘ রায় সরকারের উদ্যোগ বাড়ালে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে বাঘকে টিকে থাকতে সহায়তা করলে তা বিলুপ্ত হওয়া থেকে রা পেতে পারে।
কম্বাইন্ড ইফেক্টস অব কাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সি-লেভেল রাইজ প্রজেক্ট ড্রামাটিক হেবিটেট লস অব দ্য গ্লোবালি এনডেঞ্জার্ড বেঙ্গল টাইগার ইন দ্য বাংলাদেশ সুন্দরবনস শীর্ষক ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে বর্তমানে মাত্র ৪ হাজার বেঙ্গল টাইগার টিকে আছে, যার মধ্যে বাংলাদেশে মাত্র ১০৬টি (২০১৫ সালের হিসাব) বাঘ আছে, যা ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। যে কয়টি বাঘ এখনো টিকে আছে, তাকে রা করতে হলে এর সংরণের ব্যবস্থাপনা বদলাতে হবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০। ২০১০ সালে রাশিয়ায় বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হবে। এই ল্েয গঠিত হয় গ্লোবাল টাইগার ইনিশিয়েটিভ (জিটিআই)। সম্মেলনে বাংলাদেশের প থেকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশও বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করবে।
এ ব্যাপারে বাঘ-বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান স্বদেশ খবরকে বলেন, বাঘের জন্য সুন্দরবন এমনিতেই প্রতিকূল পরিবেশ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। তবে সুন্দরবনের চারপাশে যেভাবে শিল্পকারখানা হচ্ছে ও দূষণ বাড়ছে, তাতে বাঘের জন্য বিপদ তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া খাদ্যসংকটের কারণে বাঘ জনবসতিতে চলে আসছে এবং মানুষের হাতে মারা পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে বন থেকে বাঘের লোকালয়ে আসা বেড়ে যেতে পারে। তবে বাঘের আশু বিপদ হিসেবে অবশ্যই চোরা শিকার ও শিল্পদূষণ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। বাঘ রা করতে হলে সরকারকে এসব বিপদকে আমলে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।