প্রতিবেদন

অবৈধদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে সৌদি আরব বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় খুশি প্রবাসী বাংলাদেশিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
অবৈধভাবে বসবাসকারীদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে অথবা সেদেশে বৈধ হওয়ার জন্য ৯০ দিনের সুযোগ দিয়েছে সৌদি আরব।
সৌদি প্রেস এজেন্সি ৩ মার্চ এক খবরে জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নাইফ সৌদি আরবকে অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকমুক্ত করতে ন্যাশন ফ্রি অব ভায়োলেটরস শীর্ষক এক প্রচারাভিযান শুরু করেছেন।
রিয়াদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠানে সৌদি আরবে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের ৯০ দিনের জন্য সাধারণ মা ঘোষণা করেন মোহাম্মাদ বিন নাইফ। ২৯ মার্চ থেকে এ ঘোষণা কার্যকর হবে।
সাধারণ মার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসী ও শ্রমিক এবং সীমান্ত আইন লঙ্ঘনকারীরা এই সুযোগ গ্রহণ করে বৈধ হওয়ার সুযোগ পাবে। কেউ চাইলে নিজ দেশে ফিরেও যেতে পারে। অবৈধরা দেশে ফিরে গেলে তাদের জরিমানা ও দ- মওকুফ করা হবে। তাছাড়া দেশে ফিরতে সৌদি সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে। অবৈধ শ্রমিকরা চাইলে দেশে ফিরে আবার বৈধভাবে সৌদি আরবে আসতে পারবে।
মোহাম্মাদ বিন নাইফ জানিয়েছেন, বাদশাহ সালমান এই প্রচারাভিযান অনুমোদন করেছেন। অবৈধ অভিবাসী ও শ্রমিক সংকট মীমাংসা করতে চান বাদশাহ। অবৈধ হয়ে পড়া লোকজন সাধারণ মা পাবে এবং দ-িতরা দ- মওকুফের সুযোগ গ্রহণ করতে পারবে। এই সুযোগ গ্রহণ করতে অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ক্রাউন প্রিন্স।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী কাজ করেন সৌদি আরবে। সরকারি হিসাবমতে, সৌদিতে প্রায় ২৬ লাখ কর্মী কর্মরত রয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক কর্মীর মধ্যে অবৈধ কর্মীর সংখ্যাও কম নয়। প্রতিনিয়তই সৌদিতে নতুন কর্মী নিয়োগ হচ্ছে। আবার চাকরির মেয়াদ শেষ করে অনেকে দেশেও ফিরে আসছেন।
এর আগেও সৌদি কর্তৃপ সোর্স কান্ট্রিগুলোর অবৈধ কর্মীদের সাধারণ মা ঘোষণা করেছিল। তখনও অনেক দেশের অবৈধ কর্মীদের দেশে ফিরতে হয়েছে। এবারও একইভাবে দেশটির কর্তৃপ সাধারণ মা ঘোষণা করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী, ২৯ মার্চ থেকে বিভিন্ন দেশের অবৈধ কর্মীদের দেশে ফিরতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশেও ৩ লাখের বেশি কর্মীকে দেশে ফিরতে হতে পারে। তবে অনেকে আকামা বা চাকরির সময় বাড়ানোর আবেদন করে রেখেছেন। তাদের হয়ত শেষ পর্যন্ত বৈধ করে নেয়া হবে।
মূলত সৌদি আরবে ৩ ধরনের অবৈধ অভিবাসী রয়েছে। তাদের আলাদা ধাপ অনুসরণ করে দেশে ফিরতে কোনো ধরনের জেল-জরিমানায় পড়তে হবে না। শুধু সৌদি আরব ত্যাগের জন্য কয়েকটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। যারা কাজের ভিসা নিয়ে সৌদি আরব এসে আকামার (রেসিডেন্ট পারমিট) মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নবায়ন করেননি, নিয়োগকর্তা পলাতক দেখিয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন, কাজের ভিসায় এসে কোনো কারণে সব কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছেন, ইমিগ্রেশনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই, অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সৌদি আরব প্রবেশ করেছেন, তাছরিহা (অনুমতিপত্র) ছাড়া হজ করতে গিয়ে মামলা হওয়ায় আকামা নবায়ন হচ্ছে না, কারও ডিপেনডেন্ট হিসেবে থাকার পর এখন অবৈধ অথবা সৌদি শ্রমআইন লঙ্ঘনের দায়ে মামলা হয়েছে, যেসব অভিবাসীর মেয়াদ আছে এমন পাসপোর্ট, পাসপোর্ট না থাকলে দূতাবাস থেকে আউটপাস (বিশেষ ট্রাভেল পাস) সংগ্রহ করে সেটা নিয়ে নিকটস্থ ইমিগ্রেশন অফিস, সফরজেল অথবা ডিপোর্টেশন সেন্টারে গিয়ে এক্সিট ভিসা সংগ্রহ করার পর বিমান টিকিট কিনে দেশে ফিরতে হবে।
সৌদি আরবে যে বাংলাদেশের প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক অবৈধ হয়ে আছে, এটা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অবগত আছে। এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিকদের কোন পন্থায় সৌদি আরবে বৈধ করা যায়, সে ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর সৌদি আরব সফরে গিয়ে সৌদি বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিদ আল সৌদের সঙ্গে বৈঠকে সেদেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে কথা বলেন। সে সময় সৌদি বাদশাহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানান, বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে তার দেশ সবসময়ই আন্তরিক। কারণ বাংলাদেশের শ্রমিকরা সৌদি আরবের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে।
অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সৌদি আরবের ৩ মাসের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা বাংলাদেশসহ সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। তবে মূল বিষয় হলো সেদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। সেজন্য বাংলাদেশের বিষয়ে সবসময়ই সৌদি আরবের একটা আলাদা নজর থাকে। দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত সেদেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ শ্রমিক বৈধ হয়েছেন বাংলাদেশেরই। এটা হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের চমৎকার কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণেই।
এই একই সম্পর্কের কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সৌদি বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিদ আল সৌদ। সৌদি বাদশা ও ক্রাউন প্রিন্সের বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টে দেশটির প্রভাবশালী দুই মন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের ৩৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছেন। ২টি চুক্তি ও ৪টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। বাংলাদেশে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছে সৌদি আরব।
বাংলাদেশ আশা করছে, বাংলাদেশে সৌদি আরবের বিনিয়োগ আগ্রহের মতোই সেদেশে অবৈধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে সৌদি বাদশাহ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।