অর্থনীতি

অর্থপাচার রোধে একযোগে কাজ করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর

স্বদেশ খবর ডেস্ক
দেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয় তা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। এই প্রক্রিয়া শুরু হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে। সে সময়ে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বানানোর জন্য দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়। এই প্রক্রিয়ায় তখন বড় অংকের টাকা পাচার হতো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বড় অংকের অর্থ পাচার রোধে কার্যকর কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে পাচার হওয়া কিছু অর্থ ফেরতও আসে। কিন্তু বর্তমানে ছোট অংকের অর্থ পাচার বেড়ে গেছে। ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে বিদেশে এবং বিদেশ থেকে দেশে অবৈধ আর্থিক লেনদেন বেড়ে গেছে। প্রবাসীদের অর্জিত রেমিট্যান্স যেমন হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসছে, তেমনি দেশ থেকে কেউ কেউ তাদের সন্তানের শিক্ষা ও অন্যান্য খরচ ব্যাংকিং চ্যানেলকে এড়িয়ে বিদেশে পাঠাচ্ছে।
আশার কথা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবিরের নেতৃত্বে অর্থপাচার রোধে সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করায় সাম্প্রতিক সময়ে পাচারপ্রবণতা কিছুটা কমেছে। আরও কমাতে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। অর্থপাচার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি, এনবিআর ও দুদক সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করেছে। অধিকাংশ অর্থ পাচারের ঘটনা ব্যাংকের মাধ্যমে ঘটায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে সকল ব্যাংকের এলসির ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। পাশাপাশি প্রত্যেকটি ব্যাংকে অভ্যন্তরীণ মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে। সেইসঙ্গে নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে লেনদেন সংক্রান্ত রিপোর্ট দাখিল করতে আদেশ জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, অর্থ পাচার প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। এতে তথ্য আদান-প্রদান যেমন সহজ হয়েছে, পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনাও সহজ হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, অর্থ পাচার ঠেকাতে ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বারিত হয়েছে। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর যৌথভাবে কাজ করবে। তাছাড়া অর্থ পাচারে জড়িতদের গ্রেফতার করতে র‌্যাব ও দুদক সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারকারী হিসেবে ৬৫০ জনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ হুন্ডি গডফাদারসহ অর্থ পাচারে জড়িত ৫০ জন ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে।
তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানাভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশে ফেসবুক ও ইউটিউবের উপার্জিত অর্থ কিভাবে বিদেশ যাচ্ছে সে বিষয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ফেসবুক ও ইউটিউবসহ ১২টি প্রযুক্তিনির্ভর এবং ১২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে র‌্যাব ও সিআইডি। এছাড়া বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে র‌্যাব ও সিআইডি ১৪২টি মানি লন্ডারিং মামলা তদন্ত করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকের এলসির মাধ্যমে পাচার হয়ে থাকে। এছাড়া আমদানি-রফতানিতে পণ্য ও সেবায় ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিং, আমদানি-রফতানিতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং, পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা দিয়ে অর্থ পাচার হয়। একইভাবে শিপমেন্টের েেত্রও ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচারের ঘটনাগুলো ঘটে।
এমতাবস্থায়, অর্থ পাচার ঠেকাতে সরকারের তরফ থেকে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ জারি হয়। নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, দুদক ও সিআইডি অর্থ পাচার ঠেকাতে যার যার অবস্থানে থেকে যার যার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের এলসির ওপর বিশেষ নজরদারি ও মনিটরিং শুরু করে। এছাড়া প্রতিটি ব্যাংককে নিজস্ব মনিটরিং সেল গঠন করে দেয়া হয়। মনিটরিং সেলগুলোকে নিয়মিত রিপোর্ট দিতে এবং ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত রিপোর্ট দাখিল করতে নির্দেশনা দেয়া হয়।
অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলোর সার্বিক বণ্টনের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব অর্থ পাচারের ঘটনার সঙ্গে রাজস্ব বা কর সংক্রান্ত বিষয়াদি আছে, সেগুলো এনবিআরের কাস্টমস ও শুল্ককর গোয়েন্দা বিভাগ দেখভাল করছে। আবার মামলার মেরিট অনুযায়ী কিছু মামলা দুদকে পাঠাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় জড়িত ১০টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পাচারকারী হিসেবে শনাক্ত করেছে র‌্যাব। ইতোমধ্যে ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের ডেকে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়সহ নানা বিষয়ের সুনির্দিষ্ট দালিলিক তথ্য-প্রমাণ দাখিল করতে বলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে চাল ডাল ডট কম, বিক্রয় ডট কম, রকমারি ডট কম, আজকের ডিল, ফুড পান্ডা, দারাজ, খাজ ফুড অথবা ডট কম, পিকাবো ও সেবা এক্সওয়াইজেড। এসব প্রতিষ্ঠানকে তাদের অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণাদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাখিল করতে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।
এছাড়া আরও ১২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির স্বদেশ খবরকে বলেন, অর্থ পাচার রোধকেই বর্তমানে ফার্স্ট প্রায়োরিটি দিয়েছে তাঁর দফতর। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এবং মানি লন্ডারিং রোধ করতে সরকারের অন্যন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে অর্থ পাচার দ্রুতই কমে আসবে বলে মনে করেন গভর্নর ফজলে কবির।