প্রতিবেদন

আমানত ফেরত দিচ্ছে না অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স এন্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক: প্রশাসক নিয়োগের দাবি ভুক্তভোগী মহলের

হাফিজ আহমেদ
আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স এন্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেড। নামে ব্যাংক মনে হলেও কার্যত এটি কোনো তফসিলি ব্যাংক নয়। দেশে যে ৬২টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে, সে তালিকায় এ ব্যাংকটির নাম না থাকলেও সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করার সুবিধার্থে সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আজিজ কো-অপারেটিভ ফাইন্যান্স এন্ড কমার্স ক্রেডিট সোসাইটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে ব্যাংক শব্দটি ব্যবহার করে আসছে। তারা সরকারের প্রচলিত নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে দেশব্যাপী অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে মানুষকে প্রতারিত করছে।
জানা যায়, গ্রাহকদের বিভিন্ন মেয়াদি আমানত ম্যাচিউরড হওয়ার পরও টাকা ফেরত দিচ্ছে না আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স এন্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেড। ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের ভাটারা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, গেন্ডারিয়াসহ অনেক শাখা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শাখা যেমন রাজধানী ঢাকার দিলকুশা শাখা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারার পাশাপাশি অফিস ভাড়া পরিশোধ না করায় বাড়িওয়ালা উক্ত শাখায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। অন্যান্য অনেক গ্রাহক আমানতের টাকার জন্য প্রতিষ্ঠানের ৪৫ বিজয় নগরস্থ প্রধান কার্যালয়ে এসে ধর্ণা দিচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকায় অনেক শাখা বন্ধ হলেও গ্রাম এলাকায় শাখা খোলার উদ্যোগ নিয়েছে আজিজ কো-অপারেটিভ ফাইন্যান্স এন্ড কমার্স ক্রেডিট সোসাইটি কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে রংপুরে বেআইনিভাবে ৫৩টি শাখা খুলে আমানত সংগ্রহ করছে। অথচ এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় সমবায় কর্মকর্তা কিছুই জানেন না বলে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স এন্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের যাত্রাবাড়ী ও গেন্ডারিয়াসহ সকল শাখায় বিভিন্ন মেয়াদে জমা রাখা আমানত গ্রাহকরা ফেরত নিতে চাইলে শাখা ম্যানেজারগণ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান তহবিল সংকটের কথা বলেন। তারা বলেন, শাখায় কোনো টাকা নেই। গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহকৃত টাকা আমরা হেড অফিসে জমা দিয়ে দিয়েছি। আমাদের বললে কোনো লাভ হবে না। আপনারা হেড অফিসে যোগাযোগ করুন।
যাত্রাবাড়ী শাখায় একজন আমানতকারীর একটি সেভিংস একাউন্ট ম্যাচিউরড হয়েছে। তার ২১ হাজার টাকা ফেরত দিচ্ছে না শাখা ম্যানেজার। জরুরি প্রয়োজনে আরো অনেকে জমা রাখা প্রায় ১৫ লাখ টাকা ফেরৎ চেয়ে আবেদন জমা দিয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। এমন অনেক আমানতকারী পথে বসেছে।
আমানতকারীগণ সমবায় অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ নিয়ে ধর্ণা দিচ্ছেন। পাশাপাশি সমিতিতে প্রশাসক নিয়োগের জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
বিপদে আছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীগণও। চাকরির শর্ত পূরণের জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করা আমানত ফেরত দিতে না পেরে নানাভাবে নাজেহাল হচ্ছেন। বাড্ডা শাখার এক মহিলা কর্মকর্তা আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে সংগ্রহকৃত আমানত ফেরত দিতে না পারায় সংসার ভাঙার উপক্রম হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স এন্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডর চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম ও অন্যান্য উদ্যোক্তা কর্তৃক অর্থ আত্মসাৎ এবং বিধিবহির্ভূতভাবে অন্যত্র ফান্ড ট্রান্সফারের কারণেই মূলত প্রতিষ্ঠানটিতে তহবিলসংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমানতকারীদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় গ্রাহকদের টাকা নিয়ে আইডিয়াল, ম্যাক্সিম, ডেসটিনি কো-অপারেটিভের মতো আজিজ কো-অপারেটিভ ফাইন্যান্স এন্ড কমার্স ক্রেডিট সোসাইটি কর্তৃপক্ষও লাপাত্তা হয়ে যেতে পারে।
তাছাড়া আজিজ কো-অপারেটিভের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম, আইন ভঙ্গ করে শাখা পরিচালনা, কালো টাকা আমানত গ্রহণসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন-২০১৩ এর ৯ (৩) ধারায় কোনো সমবায় সমিতির নামের সাথে ‘ব্যাংক’ শব্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ তারা সরকারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সমিতির নামের সাথে বেআইনিভাবে ব্যাংক শব্দটি ব্যবহার করছে। সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন ২০১৩-এর ১৮ (১) ধারায় কোনো শাখা পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ এই সমবায় সমিতি শাখার কার্যক্রম কেবল অব্যাহতই রাখেনি, আইন পাসের পরও আরো নতুন শাখা খুলেছে এবং ১৩৭টি শাখার মাধ্যমে সারাদেশে তাদের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ অনেক তফসিলি ব্যাংকেরও এত শাখা নেই।
ব্যাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পত্রিকায় নোটিশ দিয়ে সতর্ক করেছে, যাতে ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে জনসাধারণ লেনদেন না করে। আর সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সমবায় অধিদপ্তর এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। তবে আজিজ কো-অপারেটিভ ফাইন্যান্স এন্ড কমার্স ক্রেডিট সোসাইটি কর্তৃপক্ষের অর্থ লোপাটকারী উদ্যেক্তাগণ যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সমবায় অধিদপ্তর সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনুরোধপত্র পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
সমবায় বিশ্লেষকদের মতে, এখানে ব্যাংকের চেয়ে সুদের হার বেশি। তাই লোভে পড়ে অনেকে আমানত রাখে। পরে সর্বস্ব খোয়া যায়। মূলত এটা সমবায়ের ছদ্মাবরণে মহাজনী ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই না। গুটিকয়েক ব্যক্তি, মানুষ এর সুবিধাভোগী, বিশেষ করে একটি পরিবার। যেমন তাজুল ইসলাম ও তার পরিবার এই সমবায়ের প্রধান সুবিধাভোগী ও নিয়ন্ত্রক। অন্য কথায় আজিজ কো-অপারেটিভ ফাইন্যান্স এন্ড কমার্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমেটেডের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামই মালিক। কথিত এই সমবায় সমিতি ব্যবসার স্বার্থে ধর্মীয় অনুভূতির ব্যবহার করছে। সমিতির নামের সাথে লেখা রয়েছে ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক। এমনকি সমিতির মনোগ্রাম পবিত্র কাবা ঘরের আদলে ডিজাইন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান লাকি খাতুনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।