অর্থনীতি

ঋণখেলাপিদের তালিকা চেয়ে হাইকোর্টের রুল

আদালত প্রতিবেদক
গত ২০ বছরে কে কে ১ কোটি টাকার ওপরের ঋণখেলাপি ছিল তাদের তালিকা ও নাম-ঠিকানা চেয়েছে হাইকোর্ট। কী পরিমাণ ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে, ঋণের সুদ মওকুফের েেত্র যে অনিয়ম চলছে তা বন্ধে কী কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার তথ্যও জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া অর্থপাচারকারীদের তালিকা এবং কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, অর্থ পাচার বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্য প্রতিবেদন আকারে হাইকোর্টে দাখিল করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০ ফেব্রুয়ারি এই আদেশ দেন। আত্মসাৎ করা টাকা দেশ কিংবা বিদেশের যেখানেই থাকুক না কেন, তা ফিরিয়ে আনতে কী কী পদপে নেয়া হয়েছে তাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
আদালত অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার পাশাপাশি রুলও জারি করেছে। রুলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য সব ব্যাংকে আর্থিক দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং বিভিন্ন েেত্র অর্থপাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। রুলে আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, সিটি ব্যাংকের সাবেক সিইও মামুন রশিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে কমিশন গঠনের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না এবং এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দুই সচিব, আইন সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক রিট আবেদনে এ আদেশ প্রদান করে আদালত। রিট আবেদনকারীর পে আইনজীবী ছিলেন মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।
ব্যাংকিং খাতে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, সুদ মওকুফসংক্রান্ত বিষয় তদন্ত ও সুপারিশ প্রণয়নে ৭ দিনের মধ্যে কমিশন গঠন চেয়ে গত ২৩ জানুয়ারি আইনি নোটিশ দেয়া হয়। নোটিশে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। নোটিশের জবাব না পেয়ে রিট আবেদন করা হয়।
আদালত আদেশে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা উধাও হয়ে গেছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু কোনো সিকিউরিটি মানি নেই। যারা ঋণ নিচ্ছে তাদের ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে অর্থনীতিকে দ্রুত একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে নিয়মনীতি মেনে ঋণ দেয়ার কথা। যদি তা না মানা হয়, যারা ঋণ নিয়েছেন এবং অর্থ পাচার করেছেন তাদের তালিকা করে আদালতে দাখিল করতে হবে।
আদেশের পর অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, পত্রপত্রিকায় যা দেখেছি, তাতে ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে অর্থ পাচার হয়েছে বলে আমরা জানি। এই মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে কিছুদিন আগে একটা রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে আমেরিকা থেকে। কত হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে তা সেখানে বলা হয়েছে। কোন কোন দেশে এই টাকা গেছে তাও ওই রিপোর্টে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে এই রিপোর্ট সংগ্রহ করে আদালতকে জানাতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ঋণ নেয়ার েেত্র ১-২ লাখ কোটি টাকা ঋণ বিভিন্ন লোক পরিশোধ করছে না। ব্যাংক খাতের এই অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে না পারলে জনগণের রতি টাকার কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। এ জন্যই আদালতে রিট আবেদন করা হয়েছে।
এদিকে যেকোনো মূল্যে খেলাপিঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই ঋণ আদায় এবং খেলাপিঋণ আরো বেড়ে যাওয়া বন্ধ করতে ব্যাংকগুলোকে এরই মধ্যে কঠোর বার্তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যবসা সম্প্রসারণ বা চালানোর নাম করে ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়া অনেকের জন্য ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বড় অংশই ঋণ ফেরত দিলেও একটি অংশ নানা অজুহাতে এড়িয়ে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ বিতরণ করা ঋণের ১১ শতাংশের বেশি। বছরের পর বছর পড়ে থাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নিয়ে কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে যাচ্ছে তারা। খেলাপি ঋণ অবলোপনের চেয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ঋণ আদায়কেই গুরুত্ব দেবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
জানা যায়, গত ৬ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আইন কমিশন, আদালতের বাইরে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তিকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক) ও তফসিলি ব্যাংকের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে চতুর্পীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যাংকাররা উদ্বেগ ব্যক্ত করে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করা হলেও উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে অনেক ঋণগ্রহীতা। ফলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতার দিকে গড়ায়। ব্যাংক কর্মকর্তারা মামলা কার্যক্রমে গতি আনা এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইনের কিছু ধারা সংস্কারের প্রস্তাব করেন।