রাজনীতি

এবার জামায়াতমুক্ত হচ্ছে বিএনপি!

ইয়াছির আরাফত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অবশেষে জোটের রাজনীতি থেকে জামায়াতকে ছেড়েই একক শক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পথে হাঁটছে বিএনপি। তারা মনে করছেন, এবার জামায়াতমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি।
তবে কিভাবে জামায়াতমুক্ত হওয়া যায় সে বিষয়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের ৮১ সাংগঠনিক জেলার সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছেন। তিনি প্রথম বৈঠকটি করেছেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে।
দলের ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে এ বৈঠক ডাকা হলেও এতে গুরুত্ব পেয়েছে জামায়াত প্রসঙ্গ। জামায়াতকে জোটে রাখা না রাখার বিষয়ে জেলা নেতাদের মতামত জানতে চান তারেক রহমান।
জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি নেতাদের মতামত জামায়াতের পে ছিল না। তারা তারেক রহমানকে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রোপটে জামায়াত থাকলে বিএনপির বিশেষ কোনো সুবিধা নেই। বরং জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের দায় বিএনপির কাঁধে বর্তাচ্ছে। ফলে এতে লাভের চেয়ে বিএনপির ক্ষতিই হচ্ছে বেশি।
গত ২ মার্চ নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। লন্ডন থেকে স্কাইপের মাধ্যমে তারেক রহমান বৈঠকে যোগ দেন। ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক চলে। এ সময় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মো. তৈমুর রহমান বলেন, দলের সাংগঠনিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের মতামত নিয়েছেন। এতে জামায়াত প্রসঙ্গ উঠে আসে। তারেক রহমান জানতে চান, জামায়াতকে জোটে রাখা উচিত কি না। জেলা বিএনপির শীর্ষ ৫ নেতার সবাই মতামত তুলে ধরে বলেন, জামায়াত এখন বিএনপির জন্য বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তারা বলেন, আমরা জামায়াতকে জোটে রাখার সুবিধা ও অসুবিধা Ñ দুটিই বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করে বলেছি। ১৯৯৬ সালে জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগ আন্দোলন করার প্রোপট তুলে ধরে তাদেরকে ভোটের জোটে রাখলে কী হতে পারে তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় উঠে আসে জামায়াতকে ছেড়ে দিলে বিএনপির বর্তমানে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।
সম্প্রতি জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা বিএনপির জোটে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই মধ্যে তাদের শীর্ষ নেতা আবদুর রাজ্জাক জামায়াত নেতৃত্বের সমালোচনা করে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, জামায়াতের মা চাওয়া এবং দল বিলুপ্ত করা উচিত।
আবদুর রাজ্জাক যখন এ বক্তব্য দেন তখন লন্ডনে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। ধারণা করা হচ্ছে, দুই জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে তারেক রহমান এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
ওই সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, জামায়াতের মা চাওয়া উচিত। তার এ বক্তব্যের পর দলের নেতারা ধারণা করেছেন, জামায়াতের ব্যাপারে এটি বিএনপির নতুন মনোভাব।
এরই মধ্যে জামায়াতকে জোটে রাখা না রাখার বিষয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। দলের অনেকেই মনে করেন, এখন আর জামায়াতকে জোটে রাখার দরকার নেই। তাদের ২০ দলের বাইরে থাকতে বলবে বিএনপি।
এদিকে বিএনপির নেতারা জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে তাদের ১৮ বছরের রাজনীতির মূল্যায়ন শুরু করেছেন। বিশেষ করে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠনের পর ২০০১ সালে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় বিএনপি। জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রিসভার সদস্য হন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্যাবিনেটে যুক্ত করেন জামায়াতের এ দুই শীর্ষ নেতাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হলেও এই দুই জামায়াত নেতা জাতীয় দিবসগুলোতে কখনোই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে জাতীয় স্মৃতিসৌধ বা একুশে ফেব্র“য়ারিতে শহীদ মিনারে যাননি। এ নিয়ে তখন বিএনপি ব্যাপকভাবে সমালোচনার মুখেও পড়েছিল।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, বিএনপি এখন জামায়াত বিষয়ে অতীতের চেয়ে আরও উদারপন্থি ও আরও প্রগতিশীল পন্থা অবলম্বন করবে। বিশেষ করে বর্তমান দুনিয়ার বাস্তবতায় জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক দলকে সঙ্গে রাখায় বিএনপির লাভ না হয়ে উল্টো ক্ষতিই হচ্ছে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে গো-হারা হারার পর তারেক রহমান এটা ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছেন।
জানা গেছে, সরাসরি ঘোষণা দিয়ে জামায়াতকে সরাতে চায় না বিএনপি। এমনকি জামায়াতও নিজে থেকে সরতে অনাগ্রহী। জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা চাইছে বিএনপিই তাদের না বলুক। অন্যদিকে বিএনপির প্রত্যাশা ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক উষ্ণতা হারাক। এ কারণে চারপাশে পরিবেশ তৈরি করতে চান বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।
মূলত বলা যায়, জামায়াতের জন্য বিএনপির এখন কোনো উইকনেসই নেই। যতটুকু ছিল তা শেষ হয়ে গেছে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর। বিএনপি এখন চাচ্ছে কোনোরূপ ঘোষণা না দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই জামায়াতের কবলমুক্ত হতে।