প্রতিবেদন

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পালিত: ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র এবং মানব সভ্যতার অমূল্য দলিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ মার্চ ১৯৭১। বাংলাদেশ নামের ছোট্ট এক ভুখ-ে একজন জননেতা দিয়েছিলেন ১৯ মিনিটের একটি অভূতপূর্ব ভাষণ। নেতার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ভাষণে উদ্দীপ্ত হয়ে জনতা দেখতে শুরু করেছিলেন স্বাধীন একটি দেশের স্বপ্ন। ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে জাতি সত্যি সত্যি ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। এরপর কেটে গেছে ৪৬ বছর। এলো ২০১৭-এর ৩০ অক্টোবর। নানাবিধ পর্যালোচনা ও বিবেচনার পর ৭ মার্চ ১৯৭১-এর সেই ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিলো ইউনেস্কো। এমওডব্লিউ-তে এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরতি হবে। ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ (এমওডব্লিউ) তালিকাভুক্ত করার পর দ্বিতীয়বারের মতো ৭ মার্চ এসেছে বাঙালি জাতির সামনে।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ উল্লেখ করে বলেছেন, ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র এবং মানব সভ্যতার অমূল্য দলিল। এই ভাষণ শুধু বাংলাদেশি মুক্তিকামী মানুষ না, সারাবিশ্বের মুক্তিকামী জনগণের প্রেরণা হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে। আর যারা ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ করেছিল তারা ধীরে ধীরে আঁস্তাকুড়ের দিকেই চলে যাবে, নিঃশেষ হয়ে যাবে। বেঁচে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের মানুষকে যারা ভালোবাসবে। যুগ যুগ ধরে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু দেশের মানুষকেই নয়, বিশ্বের সকল নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষকে প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে, আগামীতেও দিয়ে যাবে।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা। ৭ মার্চের ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ প্রকৃত অর্থে বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। যুগের পর যুগ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পুরো জাতিকে এখনও নতুন করে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেম, ত্যাগ ও আদর্শের মহিমায় উজ্জীবিত করে যাবে। পৃথিবীর অনেক শ্রেষ্ঠ ভাষণ আছে, কিন্তু ৪৮ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মতো আর কোনো ভাষণ এতোবার বাজেনি। তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ, এটি এখন প্রমাণিত সত্য।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তাঁরই জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ ২১টি বছর এই ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। যেহেতু পাকিস্তানি হানাদারদের এই ভাষণটি পছন্দ নয়, সেজন্য মতা দখল করে এই ভাষণটি বাজানো নিষিদ্ধ করেছিল মতা দখলকারী জিয়াউর রহমানরা। পরবর্তী সামরিক স্বৈরাচাররাও একই পথ অনুসরণ করে, রণাঙ্গনের স্লোগান জয় বাংলাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সত্যকে কখনও অস্বীকার করে মুছে ফেলা যায় না।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ একেকটি কোটেশন হয়। ভাষণের প্রতিটি লাইন, শব্দ বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমগ্র পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণা জোগাতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি আজীবন টিকে থাকবে। ৪৮ বছর হয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের আবেদন এখনও এতটুকুও কমে যায়নি।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং ৪৮ থেকে ৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের পা-ুলিপিগুলো আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে পড়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বইগুলো পড়লেই বুঝতে পারবেন একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য জাতির পিতা কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কত কষ্ট করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর এই একটি মাত্র ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলতে পারছি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই আমরা পেয়েছি একটি ভাষাভিত্তিক স্বাধীন দেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর অনেক বড় বড় নেতা অনেক শ্রেষ্ঠ ভাষণ দিয়েছেন। গত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলো নিয়ে গবেষণা হয়েছে। গবেষণার পর যে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলো স্থান পেয়েছে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি। সে কারণে জাতিসংঘের অন্যতম সংস্থা ইউনেস্কো ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সারাবিশ্বে ৭ মার্চের ভাষণটি এখনও সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে, ভাষণটির আবেদন এখনও এতটুকু কমেনি। বিশ্বের বড় বড় নেতাদের ভাষণগুলো একবার বেজেই থেমে গেছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি যুগ যুগ ধরে বেজেই যাচ্ছে, দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক শ্রেষ্ঠ ভাষণ আছে সেগুলো ছিল লিখিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ছিল সম্পূর্ণ অলিখিত, কোনো নোট পর্যন্ত ছিল না। বঙ্গবন্ধু যা বিশ্বাস করতেন, সেই মনের কথাটিই বলে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ ও ’৭৫-এর খুনি ও স্বাধীনতাবিরোধীরা দীর্ঘ ২১টি বছর এই ভাষণটি বাজানো নিষিদ্ধ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর ছবি নিষিদ্ধ করেছিল। যে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য হানাদার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অকাতরে জীবন দিয়ে গেছে, সেই স্লোগানটিও নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ভাষণটি বাজাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রদানের আগ মুহূর্তে পিতার পাশে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভাষণটি দেয়ার আগে অনেক বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, রাজনৈতিক নেতা এমনকি ছাত্রলীগের নেতারাও বঙ্গবন্ধুর কাছে অনেক নোট দিয়ে বলেছিলেন, এসব বলতে হবে। কাগজের যেন বস্তা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে যাবেন, ঠিক তখন আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাবাকে দোতলায় ডেকে নিয়ে পাশে বসেন। তখন আমিও বাবার মাথার কাছে বসে মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। তখন মা বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলবে। ময়দানে লাল লাখ মানুষ তোমার মুখের দিকে চেয়ে বসে আছে। তুমি দেশের মানুষের জন্য আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছ। তাই তাদের জন্য কী করতে হবে তা তোমার চেয়ে কেউ বেশি বুঝবে না। তাই তোমার মনে যা আসবে সেটিই বলবে।’ বঙ্গবন্ধু তা-ই করেছিলেন। কোনো নোট বা লিখিত কাগজ ছাড়াই বঙ্গবন্ধুর মনে যা ছিল সেটিই ভাষণে বলেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু কী করেছেন, তা ওই সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীর রিপোর্টেই স্পষ্ট উল্লেখ আছে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার ওই রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করে আমরা বই আকারে বের করছি। ইতোমধ্যে বইয়ের দুই খ- বেরিয়েছে, তৃতীয় খ-ের কাজ চলছে। সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে ১৪ খ-ের বই বের করা হবে। এই রিপোর্টগুলো পড়লেই সবাই জানতে পারবেন একটি স্বাধীন জাতি ও স্বাধীন দেশের জন্মের ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনও বিশ্বের ইতিহাসে বিরল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছে, পরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলন থেকেই একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর মতো অসহযোগ আন্দোলন বিশ্বের আর কোনো নেতাই করতে পারেননি। অসহযোগ আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আলোচনার জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলন থাকায় গণভবনের বাঙালি বাবুর্চিরা রান্না করতে পর্যন্ত অস্বীকার করে। ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে তখন বলা হয়েছিল, ‘একটু অনুমতি দেন, নইলে রাষ্ট্রপতি একটু গরম ভাতও খেতে পারবেন না।’ এমন অসহযোগের ঘটনা বিশ্বে শুধু বিরলই নয়, একটি অনন্য ইতিহাসও।
আজ থেকে ৪৮ বছর আগের কথা। পরাধীনতার দীর্ঘ প্রহর শেষে জাতি তখন স্বাধীনতার জন্য অধীর অপোয়। শুধু প্রয়োজন একটি ঘোষণার, একটি আহ্বানের। অবশেষে ৭ মার্চে এলো সেই ঘোষণা। অগ্নিঝরা একাত্তরের এইদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নামক মহতী কাব্যের স্রষ্টা কবি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার চূড়ান্ত আহ্বানটি দিয়েই ান্ত হননি, স্বাধীনতা অর্জনের ল্েয মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাও দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের কাছে লাল-সবুজ পতাকাকে মূর্তিমান করে তোলে। আর এই মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। শুধু স্বাধীনতাযুদ্ধে নয়, বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রনির্ঘোষ ভাষণ আজও বাঙালি জাতিকে উদ্দীপ্ত করে, অনুপ্রাণিত করে। মূলত রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণই ছিল ৯ মাসব্যাপী বাংলার মুক্তি সংগ্রাম তথা স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মুক্তিপাগল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এই ভাষণ থেকেই মূলত স্বাধীনতার অঙ্কুরোদগম ঘটতে থাকে এ বাংলায়। বাঙালির নিজের দেশের হাজার বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে এগোতে থাকে। তাই বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণারে লেখা একটি অনন্য সাধারণ দিন ৭ মার্চ।
সারাদেশ থেকে ছুটে আসা স্বাধীনতার জন্য পিপাসার্ত মানুষের ঢলে একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের চতুর্দিকে রীতিমতো জনবিস্ফোরণ ঘটে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে নারী পুরুষের স্রোতে সয়লাব হয়ে যায় তখনকার ঘোড়দৌড়ের বিশাল ময়দান। বিকেল ৩টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই মানুষের ভিড়ে তিল ধারণের মতা হারায় সেদিনের রেসকোর্স। রাজধানী ঢাকার চতুর্দিকে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনারা রক্তচু নিয়ে প্রহরায়। আকাশে উড়ছে হানাদারদের যুদ্ধবিমান। মুক্তিপাগল বাঙালির সেদিকে ন্যূনতম ভ্রƒপে নেই। সবার শুধু অপো তাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু কখন আসবেন।
গণমানুষের স্লোগানের মধ্য দিয়ে বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে জনসমুদ্রের মঞ্চে আসেন স্বাধীনতার মহানায়ক। আকাশ কাঁপিয়ে স্লোগান ওঠে Ñ বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ। মঞ্চে দাঁড়িয়েই বিশাল জনসমুদ্রে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতিকে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাত্ত আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার তিনি সাফ জানিয়ে দেন, স্বাধীনতাকামী জনতাকে আর বুলেট-বেয়নেটে দাবিয়ে রাখা যাবে না। তাই বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে রেসকোর্সের মাঠে তিনি আবৃত্তি করেন বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা Ñ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
মুজিবের স্বাধীনতার ডাকে রক্ত টগবগিয়ে ওঠে মুক্তিপাগল বাঙালির। মুহূর্তেই উদ্বেল হয়ে ওঠে জনতার সমুদ্র। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে বাংলার আকাশ। নড়ে ওঠে হাতের গর্বিত লাল-সবুজ পতাকা, পতাকার ভেতরে সোনালি রঙে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র। সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্র“র মোকাবিলা করতে হবে…’।
স্বাধীনতার জন্য সারাদেশ থেকে ছুটে আসা পিপাসার্ত মানুষের তৃষ্ণা মিটল বঙ্গবন্ধুর মাত্র ১৯ মিনিটের অমর কবিতায়, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণে। এই একটি ভাষণেই নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেন বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রনায়ক বা নেতা স্বাধীনতার ঘোষণাপূর্ব এ ধরনের ভাষণ দেয়ার নজির নেই। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণার দিন থেকেই মূলত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার অঙ্কুরোদগম ঘটতে থাকে এই বাংলায়। এ কারণেই ৭ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় গৌরবের দিন। গৌরবোদ্দীপ্ত হয়ে দিনটিকে বাঙালি জাতি গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কৃতজ্ঞ বাঙালি স্মরণ করে স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শুধু বাংলাদেশের সম্পত্তি নয়, সারাবিশ্বের মূল্যবান সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এই একটিমাত্র ভাষণে বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার ঘোষণাই নয়, যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। ভাষণটি আজ বিশ্বের প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে, গোটা বিশ্বের মানবসভ্যতার অমূল্য দলিল হিসেবে স্থান পেয়েছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ৭ মার্চ সংসদ অধিবেশনে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলে এক অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা ৭ মার্চ ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ করেছিল তারা কত অন্ধকার যুগে বাস করত তা আজ প্রমাণ হয়েছে। তারা এ ভাষণের মূল্য বুঝতে পারেনি, এটা যে দেশের জন্য কত মূল্যবান সম্পদ তা বুঝতে পারেনি। কিন্তু ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারে না। সত্যকে বেশি দিন ঢেকে রাখা যায় না, সেটিও আজ প্রমাণিত হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, জাতির পিতা আজ আমাদের মাঝে নেই। তাঁর আজীবনের স্বপ্ন ছিল দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা, ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা। আমি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, তারা টানা তৃতীয়বারের মতো আমাদের দেশসেবার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ আর পিছিয়ে পড়া জাতি নেই, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোলমডেল। আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে, তাঁর স্বপ্নের ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা। এ ধরনের বিরল ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু জানতেন নির্বাচনে জিতলেও পাকিস্তানিরা বাঙালিদের হাতে মতা দেবে না। সেজন্য সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করার প্রস্তুতি তাঁর দীর্ঘদিন থেকেই ছিল। যুদ্ধ বাঁধলে কোথায় ট্রেনিং হবে, অস্ত্র কোথা থেকে আসবে, অর্থ কোথা থেকে আসবে Ñ সবকিছুর প্রস্তুতি তিনি আগে থেকেই রেখে গিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু গেরিলা যুদ্ধসহ সবকিছুই বলে গিয়েছিলেন, যা বাঙালি জাতির বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি। পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার সংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসেবে দেখাতে অনেক কিছুই করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা হতে দেননি। ২৫ মার্চ গণহত্যার পরই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার পর আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন ও স্বীকৃতি আমরা পেয়েছি। আর বঙ্গবন্ধু জানতেন, ভাষণের পর তাঁকে হয়ত বাঁচিয়ে না-ও রাখা হতে পারে। সেজন্য ভাষণে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।’
মূলত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই বিভিন্ন জায়গায় সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। আর এর ফলশ্রুতিতেই অর্জিত হয়েছে এদেশের স্বাধীনতা।