রাজনীতি

কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল, অতঃপর প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া!

নিজস্ব প্রতিবেদক
বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসা নেয়ার ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বরাবরই আপত্তি ছিল। চিকিৎসার জন্য কিছুদিন আগেও তাঁকে কয়েক দফা এই মেডিকেলে আনার চেষ্টা করা হলেও তার আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তার দল বিএনপি বরাবরই বলে আসছিল, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চান। কারণ বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে তার যথাযথ চিকিৎসা হবে না।
সেই খালেদা জিয়া এখন বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন। তাই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বিএনপি চেয়ারপারসন যেদিন বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে প্রবেশ করেন সেদিনই নিশ্চিত হয়ে যায় যে, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশ যেতে সম্মত হয়েছেন খালেদা জিয়া।
বিএনপির একটি বড় অংশই দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করতে চায়। অপর অংশটি চায় আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করতে। এ নিয়ে দলের নেতারা বরাবরই দ্বিধাবিভক্ত। এ পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে খোদ খালেদা জিয়ার নির্দেশনার অপোয় আছে বিএনপি। তাই যত দ্রুত সম্ভব দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার নির্দেশনা চাইবেন। নির্দেশ পেলে দ্রুত তাঁকে প্যারোলে মুক্ত করতে আবেদন করাসহ প্রয়োজনীয় পদপে নেয়া হবে বলে জানা গেছে।
খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করতে হলে বিএনপিকে বেশ ক’টি শর্ত মানতে হবে বলে ক্ষমতাসীন দল থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, দেশের ইমেজ ুণœ হয় দল থেকে এমন কোনো কাজ না করা, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল থেকে নির্বাচিত ৬ জনের শপথ নিয়ে সংসদে যোগদান, রাজপথে কোনো নেতিবাচক আন্দোলন কর্মসূচি পালন না করা, এ সরকারের অধীনে সকল নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো নেতিবাচক প্রচার না করা ইত্যাদি।
দলের উদারপন্থি নেতারা বিশেষ করে যারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের এতে তেমন আপত্তি না থাকলেও যেসব নেতা নির্বাচিত হননি তারা এসব শর্ত মেনে খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করতে নারাজ। আর এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে এতদিন বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি বিএনপি।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও তাঁর আত্মীয়স্বজনরা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছেন যে, আইনি লড়াইয়ে তাকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। আপাতত তার জামিনও হচ্ছে না। এ ছাড়া তার শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। এ পরিস্থিতিতে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করে হয় দেশের ইউনাইটেড হাসপাতাল না হয় লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান। তা করা গেলে চিকিৎসার পাশাপাশি দল পরিচালনার জন্য খালেদা জিয়ার নির্দেশনাও নেয়া যাবে।
জানা যায়, খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করতে বেশ ক’দিন আগে থেকেই বিএনপির ভেতরে আলোচনা চলতে থাকে। তবে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদাকে বঙ্গবন্ধুতে আনার পর এ আলোচনা এখন আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্ত করতে হলে বিএনপিকে সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। আর তা করতে হলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুমতি লাগবে। এ ছাড়া এ অনুমতি পেলেও প্যারোলে মুক্তির পর খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কি দেশে হবে না বিদেশে হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিএনপির যেসব নেতা খালেদা জিয়াকে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করতে চান, তারা এখন হতাশ। কারণ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দুর্নীতি প্রমাণ করে যেভাবে ১০ বছরের সাজার রায় দেয়া হয়েছে তাতে তার মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। আর এক মামলায় জামিন পাওয়া গেলেও তাকে আরেক মামলায় আটকে রাখা যাবে। কারণ, খালেদা জিয়ার নামে বেশ ক’টি মামলা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া আন্দোলন করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার মতো পরিস্থিতিও বিএনপি তৈরি করতে পারছে না। দলের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত কেউ রাজপথে আন্দোলনে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। যদিও মাঝেমধ্যে দলের নেতারা আন্দোলনের হুমকি দেন। অবশ্য খোদ কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেও তার মুক্তির পে জোরালো আন্দোলন চান না। ২০১৫ সালের নেতিবাচক আন্দোলনের পর বিএনপি সম্পর্কে দেশ-বিদেশে যে নেতিবাচক প্রচার হয়েছে সে কারণেই তিনি এ অবস্থান নিয়েছেন।
গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর ১ বছর ২ মাস সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখনও তার মুক্তির জন্য দলের প থেকে কঠোর কোনো কর্মসূচি পালন না করায় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমানও বারবার কঠোর আন্দোলনের পে মতামত দিচ্ছেন। তারপরও দলটি আন্দোলন করতে পারছে না। অবশ্য খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি এ পর্যন্ত কয়েক দফা গতানুগতিক কর্মসূচি পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিােভ সমাবেশ ও মিছিল, মানববন্ধন, গণঅনশন এবং গণঅবস্থান কর্মসূচি।
তবে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা এসবকে দায়সারা কর্মসূচি বলে অভিহিত করেছেন। খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ উল্লেখ করে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীই তার সুচিকিৎসার দাবি জানিয়ে আসছেন। এ পরিস্থিতিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এনে কেবিনে ভর্তি করা হয়। তবে রাজপথে আন্দোলনে ব্যর্থতার পর এবার বিএনপি নেতারা চাচ্ছেন খালেদা জিয়াকে পুনরায় কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরিয়ে নেয়ার আগেই প্যারোলে মুক্ত করার ব্যবস্থা করতে। আর এ জন্যই তারা নতুন উদ্যমে দৌড়ঝাঁপ করছেন।