প্রতিবেদন

কিডনি প্রতিস্থাপন আইন সংশোধন ও সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ

স্বদেশ খবর ডেস্ক
কিডনি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়মিত পরীা করানো দরকারÑ এমন আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে ১৪ মার্চ পালিত হয়েছে বিশ্ব কিডনি দিবস। অনুষ্ঠিত হয়েছে র‌্যালি, আলোচনা, লিফলেট বিতরণ ও বিনা খরচে কিডনি সমস্যা পরীা। আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক বেশি মানুষের কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হবে। তাই সময় থাকতেই কিডনি সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কিডনি চিকিৎসা সহজলভ্য করার পাশাপাশি কিডনি প্রতিস্থাপন আইন সহজ করতে হবে।
বিশ্ব কিডনি দিবস উপলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়া, বিএমএ মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান প্রমুখ।
ডা. কনক কান্তি বড়–য়া বলেন, দেশে প্রায় দু’কোটি লোক কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে। আক্রান্তের শতকরা ৭৫ ভাগ রোগী কিডনি নষ্ট হওয়ার আগে বিষয়টি ধরতে পারেন না। কিডনি বিকল রোগীর চিকিৎসা এত ব্যয়বহুল যে, মাত্র শতকরা ৭ থেকে ১০ ভাগ লোকের চিকিৎসা চালিয়ে যাবার সামর্থ্য আছে। দেশে প্রতি বছর ২৫ হাজার লোকের কিডনি বিভিন্ন কারণে হঠাৎ করে অকেজো হয়ে যায়। প্রতি বছর কিডনিজনিত রোগে প্রায় ৪০ হাজার লোক মারা যায়। দেশে কিডনিদাতার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অপেমান মোট রোগীর মাত্র শতকরা ২ ভাগ রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়। অন্যরা নিজেদের মতো চেষ্টা করে রোগী নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন। বাকিরা ডায়ালাইসিস দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে থাকেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে কিডনি রোগীকে পূর্ণাঙ্গ আরোগ্য লাভ করানো সম্ভব। সঠিক চিকিৎসা করলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ রোগীর কিডনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশে প্রতি বছর কিডনি রোগে মারা যাওয়া রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই যথোপযুক্ত চিকিৎসা পায় না। প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়, যার উল্লেখযোগ্য অংশই হলো শিশু ও নবজাতক।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্বদ্যিালয়ের শিশু নেফ্রোলজি (শিশু কিডনি) বিভাগটি ২৪ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ বিভাগ। শিশু কিডনি বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন। এখানে দ ও প্রশিতি অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের তত্ত্বাবধানে শিশু রোগীদের নিবিড় ও যথোপযুক্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হয়। বিভাগে বর্তমানে ৪টি হেমোডায়ালাইসিস মেশিন আছে, যা প্রশিতি সেবিকাদের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এ বিভাগে হঠাৎ বিকল কিডনি রোগীদের পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২টি স্নাতোকোত্তর কোর্স যথা এমডি (রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম) ও এফসিপিএস (শিশু নেফ্রোলজি) চালু আছে। এখান থেকে এ পর্যন্ত ৭ জন চিকিৎসক এমডি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত আছেন।
দেশে শিশু কিডনি প্রতিস্থাপন তেমন জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হয়ে উঠেনি। এর প্রধান কারণগুলো হচ্ছে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও সঠিক ধারণার অভাব। তাছাড়া যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাদের জন্য আবার দেশে বিদ্যমান অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনটির প্রয়োগ নিশ্চিত করে প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার কার্যক্রম অনেকের কাছেই কষ্টসাধ্য বলে মনে হয়। সেজন্য আইনটিকে কিছুটা শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে কিডনি রোগের চিকিৎসায় হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। সে অনুযায়ী দেশের জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে সরকার কিডনি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছে। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন অনুযায়ী বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, চাচা-মামা, খালা-ফুপু ও স্ত্রী বা স্বামী রোগীকে কিডনি দিতে পারবেন। এই ১২টি সম্পর্কের বাইরে কারও কাছ থেকে কিডনি নিতে পারবেন না অসুস্থ ব্যক্তি।
কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সোসাইটি অব অরগ্যান ট্রান্সপ্লানটেশন বাংলাদেশের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ বলেন, উন্নত বিশ্বে প্রতিস্থাপন করা কিডনির ২০ থেকে ২৫ ভাগ নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে নেয়া হয়। অথচ বাংলাদেশে আইনে শতভাগ শুধু নিকট আত্মীয়দের মধ্য থেকে কিডনি ডোনার হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা পরিবর্তন করা দরকার।
ডায়ালাইসিসের চেয়ে কিডনি সংযোজনের ব্যয় অনেকটাই কম। একজন রোগীর ৬ মাসের ডায়ালাইসিসের জন্য যে খরচ, তা দিয়ে একটি কিডনি সংযোজন করা সম্ভব। কিডনি সংযোজন করে রোগী শারীরিকভাবেও অনেক বেশি সুস্থ থাকে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, কিডনির ৭০ থেকে ৮০ ভাগ অকেজো হওয়ার পর অধিকাংশ রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। কারণ কিডনির কমপে ৮০ ভাগ অকেজো হওয়ার পর আলামতগুলো ভেসে ওঠে। ৪০ বছর বয়সের পর বছরে কমপে একবার হলেও কিডনি পরীা করা দরকার। এছাড়া সচেতনতা এবং সুস্থ জীবনযাপনের চর্চার মাধ্যমে এ রোগের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।