কলাম

ক্রাইস্টচার্চের হামলা: ধর্মীয় উগ্রবাদিতার শেষ কোথায়?

ড. মিল্টন বিশ্বাস
১৫ মার্চ (২০১৯) নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে ৫ জন বাংলাদেশিসহ ৪৯ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। নির্মম এ হত্যাকা-ের শিকার মানুষগুলোর কোনো অপরাধ ছিল না। যেমন ২০১৬ সালে বাংলাদেশের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হত্যাকা-ের শিকার বিদেশিরা নিরপরাধ ছিলেন।
সারা পৃথিবীতে এই একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নতির যুগে এসেও ধর্মের নামে অধর্ম মানুষকে উৎকট ও বীভৎস পশুতে পরিণত করেছে। আমাদের দেশে গত ১০ বছরে ধর্মীয় উগ্রবাদিতা নির্মূলে শেখ হাসিনা সরকারের প্রাণান্ত চেষ্টা থাকায় জঙ্গিবাদী তৎপরতা অনেকটা কমে এসেছে। পক্ষান্তরে পশ্চিমা দুনিয়াজুড়ে উগ্র ডানপন্থি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শের বিস্তার ঘটেছে বলেই বেড়েছে মুুসলিম বিদ্বেষ। এজন্য হত্যাকারী ব্রেন্টন টারান্ট চিহ্নিত হয়েছে ‘উগ্র শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে। এই ব্যক্তি ১৯৯২-৯৫ সালে বসনিয়ায় গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত সার্ব নেতা রাদোভান কারাদযিচের সমর্থক। অন্যদিকে মুসলিমদের এবং অভিবাসীদের হত্যার কারণে যেসব ব্যক্তির সাজা হয়েছে, তাদের অনেকের নাম লেখা ছিল টারান্টের আগ্নেয়াস্ত্রগুলোতে। তার লেখনি থেকে জানা যাচ্ছে ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল সুইডেনের স্টকহোম শহরে মুসলিম জঙ্গিদের ট্রাকচাপায় হতাহতের ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই নাকি এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে। সেসময় এবা আকারলাউন্ড নামের ১২ বছরের সুইডিশ প্রতিবন্ধী মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে ট্রাকচাপায় প্রাণ হারায়। এবা-র মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই নাকি হামলা চালানো হয় মসজিদ দুটিতে।

২.
পৃথিবীব্যাপী ধর্মগৃহে হামলার ইতিহাস অনেক পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব হাজার অব্দের দিকে বাবিলরাজের জেরুজালেম দখল ও মন্দিরসমূহের ধ্বংসস্তূপের ঘটনা সকলেরই জানা। ভারতবর্ষে বহিঃশত্রুদের বারংবার হামলার ঘটনায় হিন্দুদের মন্দিরসমূহের স্থাপনা কিংবা বৌদ্ধ বিহারের অবলুপ্তি আজ প্রতœতত্ত্বের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে কোটি মানুষের প্রাণের সঙ্গে ধ্বংস হয় উপাসনালয়সমূহ। এই বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে বৈশি^ক জঙ্গিবাদ ইস্যুতে কয়েকটি মুসলিম দেশে পশ্চিমা দুনিয়ার হামলায় ভগ্নস্তূপে পরিণত হয় পুরো বসতি ও স্থাপনা।
অন্যদিকে ধর্মীয় উগ্রবাদিতা প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায় শান্তিতে জীবন নির্বাহ করা মানুষদেরকে। এজন্য দেশে দেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জায় হামলা চলতে থাকে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের রাজশাহীর বাগমারা এলাকায় আহমদিয়া মুসলিম জামাতের একটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় বোমা বিস্ফোরণে ১ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন। এটি ছিল আত্মঘাতী হামলা। ওই সালে ১ মাসে অন্ততপে ৪টি মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিএনএস ঈশা খাঁ ঘাঁটিসংলগ্ন মসজিদ ও নেভি হাসপাতালসংলগ্ন মসজিদে বোমা হামলা চালানো হয়। তাতে ৬ জন আহত হন। তারও আগে ২৬ নভেম্বর মাগরিবের নামাজের সময় বগুড়ার শিয়া মসজিদে ঢুকে মোয়াজ্জিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালে মসজিদ ছাড়াও মন্দির, মন্দিরের পুরোহিত ও খ্রিস্টান যাজকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। এসব হামলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহেদিন (জেএমবি) জড়িত বলে দাবি করেছিল পুলিশ প্রশাসন। জেএমবি তখন হোসেনি দালান এলাকায় আশুরার মিছিলেও হামলা চালিয়েছিল। গত বছর (২০১৮) জানুয়ারিতে নাইজেরিয়ার এক মসজিদে ফজরের নামাযের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১১ জনের মৃত্যু হয়। হামলায় মসজিদটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী জঙ্গিরা মিসরের সিনাই প্রদেশে জুমার নামাজের সময় মসজিদে হামলা চালিয়ে কমপে ৩০৫ জনকে হত্যা করেছে। বর্বর ওই হামলায় আহত হন অন্তত ১৬০ মুসল্লি। সুফি সমর্থকরা নিয়মিত ওই মসজিদে প্রার্থনা করতে আসেন।
জিহাদের নামে জঙ্গিবাদ দেশে দেশে সাধারণ মুসলমানদের হত্যা করাকে কর্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। ইসলামের নামে জঙ্গিবাদের বিকাশ ঘটিয়ে শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি করেছে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের পেশোয়ারে শিয়া মসজিদে তালেবান জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন ১৯ জন। একই বছর দুই সপ্তাহ আগে সেই দেশের সিন্ধু প্রদেশের শিকারপুর জেলার একটি শিয়া মসজিদে হামলায় ৬১ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ২০১৬ সালের ৪ জুলাই জেদ্দায় আত্মঘাতী হামলা চালানোর পর সন্ধ্যায় মদিনায় পবিত্র মসজিদে নববীতে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে মসজিদে নববীর ৪ জন নিরাপত্তারী ও হামলাকারী নিহত হয়। একই সময়ে পূর্বাঞ্চলীয় কাতিফ শহরের একটি শিয়া মসজিদেও আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে হামলাকারী মারা যায়। আফগানিস্তানের একাধিক মসজিদে গত এক দশকে শতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে ১৫ ব্যক্তি থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের নভেম্বরে ২৩ জনের খুন ছাড়াও অসংখ্য মৃত্যুর ঘটনা আছে সেখানকার মসজিদকেন্দ্রিক হামলা ও বিস্ফোরণে।

৩.
স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ধর্মে ধর্মে কিংবা একই ধর্মের ভেতর মতাদর্শগত বিতর্কের কারণে মানবসমাজে সম্প্রীতি ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র কাঠোমো ভেঙে পড়ছে, অসত্য অমঙ্গল অকল্যাণের রাহুগ্রাস ছেয়ে ফেলছে জীবনকে। ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সর্বধর্ম সম্প্রদায়ের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে জাগ্রত করতে হলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সৃষ্টির বিকল্প নেই। এশিয়ার মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার দুই বৃহৎ ধর্ম-সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমান পরস্পর বিভেদে জড়িয়ে পড়েছে বারংবার। এর পশ্চাতে আছে কতিপয় রাজনৈতিক দলের ইন্ধন। এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ সচেতন মানুষকে ব্যথিত করে। প্রত্যেক ধর্মের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন মানুষ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়-নিরপে সম্প্রীতি প্রত্যাশা করেন।
একইভাবে ইউরোপ-আমেরিকায় যে মানবতাবাদের জয় ঘোষিত হয়েছিল তা কতিপয় জঙ্গিবাদী সংগঠনের তৎপরতায় বিনষ্ট হতে চলেছে। এজন্য মানবধর্মের চর্চা আরো বেগবান করার সময় এসেছে। পবিত্র বাইবেলে রয়েছে, ‘মন্দের পরিশোধে কারও মন্দ কর না; সকল মানুষের দৃষ্টিতে যা উত্তম, ভেবেচিন্তে তাই কর। যদি সাধ্য হয়, তোমাদের যত দূর হাত থাকে, মানুষ মাত্রের সাথে শান্তিতে থাক। হে প্রিয়েরা, তোমরা নিজেরা প্রতিশোধ নিও না, বরং ক্রোধের জন্য স্থান ছেড়ে দাও। কারণ লেখা আছে, ‘প্রতিশোধ নেওয়া আমারই কাজ, আমিই প্রতিফল দেব, এ প্রভু বলেন।’ তুমি মন্দের দ্বারা পরাজিত হবে না, কিন্তু উত্তমের দ্বারা মন্দকে পরাজয় কর। অর্থাৎ পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করতে হবে। মন্দকে উত্তমতা দেখানো, প্রতিশোধ না নেওয়ার মতো শিাগুলোকে একসাথে গ্রহণ করা দরকার। আসলে একবিংশ শতাব্দীতে মানবতা, বহুমাত্রিক ঐতিহ্য-পরম্পরা, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সাম্যচিন্তা আমাদের সমাজব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার জন্য দরকার সামাজিক স্থিতিশীলতা। অসহিষ্ণু পৃথিবীর ধর্মীয় মৌলবাদিতা দূর করার জন্য মানুষে মানুষে মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করা জরুরি। আর এর জন্যই দরকার বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ। যদিও বর্তমান বিশ্বে ধর্মের উদার বাণীসমূহ পৃথিবীর সর্বত্রই বারংবার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে অসংখ্য নিরীহ ব্যক্তিকে।

৪.
মনে রাখতে হবে, একের ধর্মবিশ্বাস অন্যের বিশ্বাসের সঙ্গে বিভেদ সৃষ্টি না করে পরস্পরে প্রীতি সঞ্চার করতে পারে। নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদনে ব্যস্ত পৃথিবীর মানুষ অন্য ধর্মবিশ্বাসীর ধর্মীয় আচার-আচরণকে সম্মান করে নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্কের বিকাশ ত্বরান্বিত করবে এটাই তো কাম্য। অনগ্রসর কিংবা নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকা এবং মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা মানবধর্মের অন্যতম কাজ। দায়বদ্ধতা, সাহস ও উদারতা দিয়ে আমাদের নতুন প্রান্তর গড়ে তুলতে হবে। বিশ^সমাজ পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করেছে ক্রাইস্টচার্চে হামলার পর। অর্থাৎ এখানে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ বহুত্ববাদে বিশ্বাসী; একত্রে থাকতে আগ্রহী। প্রকৃতপক্ষে অমানবিক সমাজ ও রাষ্ট্রে মানবতা দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আজ বিশ্বজাগতিক ভ্রাতৃত্ব আমাদের ঐক্যসূত্রে বেঁধেছে। এজন্য সামাজিক জীবনে একে অপরের প্রতি প্রীতি-মমতা প্রদর্শন করতে হবে। ধর্মের ভিন্নতা ঈশ্বরেরই দান এবং সেই পরিচয় সকলে মেনে নিয়েই বেঁচে থাকি। ভিন্নতার মাঝে ঐক্যের সুর বাজে প্রাণে Ñ এজন্য ধর্মীয় উগ্রবাদিতার পরিসমাপ্তি দেখতে চাই আমরা।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক
জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়