প্রতিবেদন

খেলনা পিস্তল দিয়ে বিমান ছিনতাই নাটক ও খলনায়কের অজানা কাহিনি

নিজস্ব প্রতিবেদক
পলাশ আহমেদ নামের এক যুবক ছিনতাইয়ের অপচেষ্টা চালালে ১৩৪ জন যাত্রী নিয়ে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি (ময়ূরপঙ্খি) ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা ৪১ মিনিটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়। পরে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ইউনিটের ৮ মিনিটের অভিযানে ঘটনার খলনায়ক পলাশ আহমেদ নিহত হয়।
এদিকে বাংলাদেশ বিমানের ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় মামলা দায়েরের একদিন পর ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি খেলনা পিস্তলসহ বেশকিছু আলামত পুলিশের কাছে দেয়া হয়েছে। এর আগের দিন আলামত জব্দ তালিকা ছাড়াই পতেঙ্গা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী ও বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত অপরাধ দমন আইনে মামলাটি করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, আসামি পলাশ আহমেদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত আলামতগুলো র‌্যাব-৭ এবং প্যারা কমান্ডো টিমের হেফাজতে আছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, হস্তান্তর করা আলামতগুলোর মধ্যে কোনো বিস্ফোরক নেই। এতে এখন পর্যন্ত খেলনা পিস্তল নিয়ে পলাশ বিস্ফোরণ ঘটানোর মিথ্যে ভয় দেখিয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে মামলায় আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ বিস্ফোরণের ভয় দেখিয়ে যাত্রী, কেবিন ক্রু ও পাইলটকে জিম্মি করে আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি করে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা ও প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটির তদন্তভার চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক রাজেশ বড়–য়া বলেন, সেনাবাহিনীর প থেকে একটি খেলনা পিস্তল, নিহত ব্যক্তির পোশাক, বিয়ের কাবিননামা, পাসপোর্টসহ কিছু আলামত দেয়া হয়েছে। এখনও তালিকা করা হয়নি। তবে জব্দসামগ্রীর মধ্যে কোনো বিস্ফোরক ছিল না।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে জানান, আইন অনুযায়ী মামলার এজাহারের সঙ্গে জব্দ তালিকার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু বিমান ছিনতাইচেষ্টা মামলার এজাহারে জব্দ তালিকার কোনো তথ্য নেই। যদি কোনো কারণে জব্দকৃত আলামত মামলা রেকর্ড হওয়া থানায় সঙ্গে সঙ্গে জমা দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে আলাদা একটি সাধারণ ডায়েরি করে জমা না দেয়ার কারণ লিপিবদ্ধ করে রাখতে হয়। ওই সাধারণ ডায়েরিতে জব্দকৃত আলামত কার কাছে কেন আছে সেটাও উল্লেখ করতে হবে।
মামলাটির বাদী, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রযুক্তিসহকারী দেবব্রত সরকার অবশ্য এজাহারের একাংশে লিখেছেন, আসামি পলাশ আহমেদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত আলামতসমূহ র‌্যাব-৭ এবং প্যারাকমান্ডো টিমের হেফাজতে আছে।
বাদি এজাহারে উল্লেখ করেন, ২৪ ফেব্র“য়ারি তিনি বিমানবন্দরে দায়িত্বরত ছিলেন। বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে কন্ট্রোলার মনছুর উদ্দিন ও এরোড্রাম সহকারী শংকর দাশ ওয়াকিটকির মাধ্যমে তাকে জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৫টা ১৩ মিনিটে ছেড়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিমান বিজি-১৪৭ উড্ডয়নের আনুমানিক ১৫ মিনিট পর অজ্ঞাতপরিচয় এক দুষ্কৃতকারী বোমাসদৃশ বস্তু ও অস্ত্র দেখিয়ে বিমানটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় বিমানের পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের কথোপকথন ইসিআরে স্থাপিত রিসিভারে মনিটর করেন বাদি। পরণে বাদি ওয়াকিটকির মাধ্যমে ঘটনাটি সবাইকে অবহিত করেন।
৫টা ৪১ মিনিটে আক্রান্ত বিমানটি অবতরণের পরপরই বিমানের ইমারজেন্সি ডোর দিয়ে যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা বিমান থেকে বের হয়ে বিমানের পাখার ওপর অবস্থান করেন। তখন বাংলাদেশ বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সদস্যরা দ্রুত বিমানে সিঁড়ি লাগিয়ে যাত্রী ও কেবিন ক্রুদের নামিয়ে আনেন। পরণে বিমানের পাইলটও নেমে আসেন।
ইতিমধ্যে বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল মফিজুর রহমানের নেতৃত্বে বিমান বাহিনীর সদস্য, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো টিম, র‌্যাব-৭, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
বাদি এজাহারে ঘটনার বিষয়ে লেখেন, কেবিন ক্রু সাগর ও যাত্রীদের কাছ থেকে জানা যায়, বিমানটি উড্ডয়নের আনুমানিক ১৫ মিনিট পর একজন অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারী বিমানের মাঝখান দিয়ে দৌড়ে বিমানের ককপিটে ঢুকতে চেষ্টা করে। তার কাছে বোমা ও অস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখা যায়। দুষ্কৃতকারী তার কিছু দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে শুনতে হবে বলে চিৎকার করতে থাকে। এ সময় দুষ্কৃতকারী দুটি পটকাজাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটায়। এমন পরিস্থিতিতে বিমানটি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এর পর অভিযান শেষে একজনের মৃতদেহ পুলিশের কাছে সোপর্দ করে সেনাবাহিনী প্যারাকমান্ডো।
মামলার এজাহারে জব্দ তালিকার তথ্য না থাকার বিষয়ে পতেঙ্গ থানার ওসি উৎপল বড়–য়া বলেন, বাদির অভিযোগ এজাহার হিসেবে গণ্য করে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। বাদি জানিয়েছেন, জব্দকৃত আলামত পরে জমা দেবেন।
প্রসঙ্গত, ২৪ ফেব্রুয়ারি অভিযানের পর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান জানিয়েছিলেন, ওই যুবকের কাছে পিস্তল ছিল। প্যারো কমান্ডোরা তাকে প্রথমে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। তখন ওই যুবক আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠায় স্বাভাবিক অভিযান চলে।
এরপর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছিলেন, ওই যুবকের কাছে খেলনা পিস্তল ছিল।
এদিকে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ ছিনতাই চেষ্টাকারীর পরিচয় জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানা পুলিশ। তার প্রকৃত নাম মাহমুদ পলাশ। উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা গ্রামের পিয়ার জাহান সরকারের একমাত্র ছেলে সে।
পিয়ার জাহানের ভাষ্য, তার ছেলে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতো। ছেলের বেপরোয়া জীবনযাপনের কারণে নিঃস্ব হয়েছে তার পরিবার।
এদিকে বিমান ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় নিহত পলাশ আহমেদের বিষয়ে মুখ খুলছেন চিত্রনায়িকা সিমলা। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে সিমলা জানান, এক পরিচালকের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পলাশের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়। এরপর গত বছরের ৩ মার্চ তারা বিয়ে করেন। ৪ মাস আগে তিনি পলাশকে ডিভোর্স দিয়েছেন।
বিচ্ছেদের কারণ সম্পর্কে নায়িকা সিমলা বলেন, সমস্যা ছিল বলেই ডিভোর্স করেছি। এর মধ্যে মানসিক সমস্যাটা একটা মূল কারণ।
পলাশকে তিনি কী হিসেবে চেনেন এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে সিমলা বলেন, আমি তাকে একজন প্রোডিউসার হিসেবে চিনি।
দুধঘাটা গ্রামে পলাশের বাড়িতে দেখা যায় উৎসুক লোকজনের ভিড়। একপাশে তার মা বাকরুদ্ধ অবস্থায় বসে আছেন, অন্য পাশে তার বাবা পিয়ার জাহান। পিয়ার জানান, থানা থেকে পুলিশ এসে তাকে একটি ছবি দেখিয়ে লোকটিকে চিনি কি না জিজ্ঞাসা করে। ছবি দেখে নিশ্চিত হন, এটি তার ছেলে পলাশ। তখন পুলিশ তাকে জানায়, বিমান ছিনতাই করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হয়েছেন ওই ব্যক্তি।
পিয়ার বলেন, পলাশ আমাদের অবাধ্য সন্তান ছিল। আমার আয়-উপার্জন সব নষ্ট করেছে সে। আজ আমি নিঃস্ব। তিনি জানান, ১৯৯০ সালে জীবিকার জন্য তিনি প্রথমে কুয়েত ও পরে সৌদি আরবে যান। ৭ বছর আগে দেশে ফিরে এলাকায় মুদি দোকান দেন। প্রবাসে থাকার সময় তার পাঠানো টাকা-পয়সা নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতো পলাশ। এর মধ্যেই চলচ্চিত্র শিল্পে জড়ায়। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা বলে বাড়ি থেকে অনেক টাকা নিয়েছে। এক সময় বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যায় পলাশ। টাকার প্রয়োজনেই বাড়ি আসতো।
পলাশের পিতা জানান, প্রায় ১০ মাস আগে এক রাতে চিত্রনায়িকা সিমলাকে নিয়ে বাড়িতে আসেন পলাশ। বাড়ির সবার সঙ্গে সিমলাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। মাসখানেক পর আবার সিমলাকে নিয়ে বাড়িতে আসে। সে সময় পলাশ তাদের জানায়, সে সিমলাকে বিয়ে করেছে। সিমলাও বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করে। কিন্তু সিমলার সঙ্গে বয়সের পার্থক্যের কারণে বিয়ে মেনে নিতে পারেনি পরিবার।
পিয়ার জানান, সিমলার সঙ্গে পলাশের মায়ের মোবাইলে যোগাযোগ ছিল। গত ৬-৭ মাস ধরে সিমলা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
পারিবারিক সূত্রে আরো জানা যায়, এইচএসসি পরীায় ফেল করার পর পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় পলাশ। ২০-২৫ দিন আগে হঠাৎ বাড়িতে আসে পলাশ। সাধারণত বাড়িতে সে বেশিদিন থাকে না। সেবার ২০-২৫ দিন বাড়িতে অবস্থান করে নিয়মিত মসজিদে যাওয়া-আসা করত, এমনকি আজানও দিত। সর্বশেষ বাসা থেকে বিদায় নেয়ার সময় তার মাকে বলে যায়, ভ্রমণ ভিসায় দুবাই যাচ্ছি।
পলাশের সোনারগাঁও ডিগ্রি কলেজের সহপাঠী ও বাল্যবন্ধু ইমরান বলেন, এইচএসসি ফেল করার পর পড়াশোনা ছেড়ে দেয় সে। মাঝেমধ্যে এলাকায় এলেও দেখা হতো কম। শুনেছি ২০১৪ সালে মেঘলা নামে বগুড়ার এক মেয়েকে বিয়ে করেছে পলাশ। সেখানে আয়ান নামে আড়াই বছরের একটি ছেলে আছে তার। তবে সিমলার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথম স্ত্রী তাকে তালাক দেয়। প্রথম স্ত্রী মেঘলার মা বগুড়া নার্সিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পলাশের বাবা ও চাচারা বিদেশে থাকত। তাই পলাশকে শাসন করার মতো কেউ ছিল না। পলাশ বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে মাঝেমধ্যে এলাকায় এসে বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে প্রতারণা করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিত। নারীঘটিত একটি মামলাও ছিল পলাশের বিরুদ্ধে।

শেষ স্ট্যাটাসে যা লিখেছিলেন পলাশ
ফেসবুকে পলাশের সর্বশেষ স্ট্যাটাস ছিল, ‘ঘৃণা নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে।’ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম মাহি বি জাহান। সেখানে পেশা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ইনফরমেশন টেকনোলজি বিজনেস অ্যানালিস্ট। শিাগত যোগ্যতা বলা আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন থেকে পড়াশোনা করেছে; থাকে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে। ফেসবুকে নায়িকা সিমলার সঙ্গে অন্তরঙ্গ অনেক ছবি রয়েছে পলাশের।
২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম বিবাহবার্ষিকীর কথা উল্লেখ করে ফেসবুকে সিমলার সঙ্গে তোলা ছবি দিয়ে পলাশ লেখেন, ‘এ হচ্ছে আমার বউ, যে আমার হাজার ভুলের মাঝে, আমাকে সহ্য করে পার করে দিল ১টি বছর। দোয়া করবেন যাতে সারাটা জীবন এ পাগলিটা আর আমি একসাথে থেকে যেন মরতে পারি। বউ, অনেক ভালোবাসি তোমায়; আর কষ্ট দেব না। শুভ বিবাহবার্ষিকী আদরের পুতুল বউ আমার। আই লাভ ইউ লট মোর দেন মাইসেলফ (আমি নিজের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসি তোমাকে)!’