রাজনীতি

চলতি বছরের অক্টোবরে জাতীয় সম্মেলন: দল ও সরকারকে ঢেলে সাজাতে আওয়ামী লীগের ব্যাপক প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চলতি বছরের অক্টোবরেই অনুষ্ঠিত হবে মতাসীন আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন। এবারের সম্মেলনে যতদূর সম্ভব দল ও সরকারকে আলাদা করার ল্য থাকবে বলে জানা গেছে। সে কারণে দলের নেতৃত্বে নতুন মুখের প্রাধান্য থাকতে পারে।
আওয়ামী লীগের এই ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনের ব্যাপারে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। তবে যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের ৩ বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের মেয়াদ আগামী অক্টোবর মাসে শেষ হচ্ছে। এর আগেই জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হবে।
দলের নেতারা বলছেন, উপজেলা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের পরপরই জাতীয় সম্মেলনের কর্মকা- পুরোদমে শুরু হবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আর দলের সভাপতি শেখ হাসিনা অনন্য নজির স্থাপন করে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নিয়েই তিনি পুরনো ও অদদের বাদ দিয়ে গঠন করেন তারুণ্যনির্ভর মন্ত্রিসভা। শেখ হাসিনার এই চ্যালেঞ্জ সর্বত্র প্রশংসিত হয়। মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের কম নেতারই ঠাঁই হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেসেজ দেন, দল ও সরকার আলাদা রাখতে তিনি বদ্ধপরিকর।
আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার ল্য নিয়ে কাজ করছে শেখ হাসিনার সরকার। মতাসীন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তিও তিনি এই ল্য পূরণে কাজে লাগাতে চান। তাই আসন্ন ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে সেভাবেই ঢেলে সাজাতে চান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। এর ফলে দলের সভাপতিম-লী ও সম্পাদকম-লীতে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সম্মেলন করতে হলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদে। এরপর নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি কমিশন গঠন এবং দলীয়ভাবে আলাদা প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হবে। সম্মেলনের জন্য বিভিন্ন উপকমিটিও গঠন করা হয়ে থাকে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন। ত্রিবার্ষিক এই জাতীয় সম্মেলনে মন্ত্রী-এমপি নন, এমন নেতা ও ত্যাগী নতুন মুখকে মূল্যায়ন করা হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর ২ দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার Ñ এই স্লোগানকে ধারণ করে পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনে অনুষ্ঠিত হয় দলটির সম্মেলন। সেখানে টানা দুইবারের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাদ পড়েন। প্রথমবারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ওবায়দুল কাদের। পরবর্তী সময়ে ঘোষিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, এমন অধিকাংশ নেতার ঠাঁই হয়।
জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সরকার ও দলের ভারসাম্য রায় নতুনভাবে চিন্তা করছে আওয়ামী লীগ। দেশের উন্নয়ন কর্মকা- দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের রয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। তেমনিভাবে তৃণমূলের কোন্দল মিটিয়ে দেশব্যাপী সাংগঠনিক কর্মকা-ে আরো গতি আনতে দ ও অভিজ্ঞ নেতাদের কাজে লাগানোর কথা ভাবছে দলটি। এ জন্য ২১তম জাতীয় সম্মেলনের আগেই সরকারের বাইরে থাকা দলীয় নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে বলে দলীয় নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে।
শীর্ষ নেতারা মনে করেন, দল ও সরকার সমান্তরালভাবে তাদের কর্মকা- পরিচালনা করবে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা কাজ করবেন। তবে মন্ত্রী-এমপিরা চাইলেই যখন-তখন খুব সহজেই সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- তৃণমূলে পৌঁছাতে সম হন না; কিন্তু দলের নেতাকর্মীরা চাইলেই যেকোনো সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- পৌঁছে দিতে সম। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন এখনো পর্যন্ত তৃণমূলে সেভাবে প্রচার হচ্ছে না। তাই বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- ও সংগঠনকে গতিশীল করার জন্য দলীয়ভাবে ভিন্ন ও নতুন পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগোতে চায় আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি সরকারের সুযোগ-সুবিধা তৃণমূলের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য দলীয়ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে।
এ কথা সত্য যে, টানা ১০ বছর মতায় থাকার কারণে অনেক এলাকায় উপদলীয় কোন্দল ও রেষারেষিতে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দল সরকারের সাথে মিশে গেছে। ফলে সেসব এলাকায় দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে সাংগঠনিক তৎপরতা কম। ওই সব এলাকার সাংগঠনিক কর্মকা- শক্তিশালী করতেও বেশকিছু পরিকল্পনা রয়েছে মতাসীনদের।
চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর দলটির ৩ বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। ফলে সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর চিন্তা করা হচ্ছে। সরকার থেকে দলের আলাদা সত্তা বজায় রাখতে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের নতুন মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি বলেও সম্প্রতি যুক্তি তুলে ধরেছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সে হিসাবে বলা চলে, আসন্ন ২১তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দল ও সরকারের মধ্যে এমন একটি সমন্বয় সাধন করবে, যার মাধ্যমে দেশের চলমান উন্নয়নমূলক কর্মকা- আরো বেগবান হবে।