কলাম

চিকিৎসাব্যবস্থাপনা সংস্কারে কয়েকটি সুপারিশ

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে উন্নত বিশ্বের চিকিৎসাব্যবস্থা তুলনা করা ঠিক হবে না। সব মহলকেই চিকিৎসাব্যবস্থাকে ভিন্নভাবে দেখতে হবে, চিকিৎসকদের তো বটেই। কারণ, এ ব্যবস্থায় মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে কাজ করতে হয়। একা চিকিৎসকের দায় নয়, বৃহৎ ব্যবস্থাপনাদলের দতার ওপর নির্ভর করে একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
আমরা রাতারাতি পাল্টাতে পারব না। তবে চিকিৎসােেত্র বিদ্যমান সম্পদ ও জনশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে রোগীদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ল্েয কিছু সুপারিশ হলো:
১. স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ : যেকোনো কাজ শুরুর আগে তার প্রশাসনিক ব্যবস্থা ঠিক করে নিতে হয়। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা খুবই নাজুক ও অকার্যকর। স্বাস্থ্যসচিব থেকে মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক খুবই ব্যস্ত। তাদের পুরনো দায়িত্ব বণ্টন (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ উঁঃরবং) এখন অবাস্তব। প্রতিটি কাজের যে মনিটরিং, সুপারভিশন ও ফলোআপ করা দরকার, তা এ ব্যবস্থায় সম্ভব নয় এবং এছাড়া কোনো কার্যক্রমই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। একই ব্যক্তিকে আবার বহু দায়িত্ব দেয়ার এবং ধরে রাখার প্রবণতার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। যেমন একটি মেডিকেল কলেজের অধ্য, তিনিই ডিন, তিনিই বিভাগীয় প্রধান, তিনিই বিএমডিসির সদস্য এবং অনেকগুলো চিকিৎসক সমিতির নেতা। আবার রয়েছে প্রাইভেট প্র্যাকটিস ও কিনিকে ভর্তি রোগী দেখা Ñ একটি কাজের জন্যই তাকে ২৪ ঘণ্টা ব্যয় করার কথা। এ কাজগুলোর সুষম বণ্টন হলে কাজের গতি ও আউটপুট বাড়বে।
বহুবার ভাবা হয়েছে প্রশাসনিক পদগুলোকে নন-প্র্যাকটিস করার। স্বাস্থ্যপ্রশাসকদের দতা ও প্রশিণেরও অভাব রয়েছে। জনবলও পর্যাপ্ত নয়। প্রশাসকদের সহকর্মীবান্ধব ও ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃরাব হতে হবে। গ্রহণযোগ্য কর্মপরিবেশ ও মানসিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্য প্রশাসন কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে বাস্তব দায়িত্ব বণ্টন এবং নিবিড় পর্যবেণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. স্বাস্থ্য জনশক্তি পরিকল্পনা (ঐবধষঃয সধহ ঢ়ড়বিৎ ঢ়ষধহহরহম) গ্রহণ: ৪৮ বছরের বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বলতে গেলে তেমন কোনো স্বাস্থ্য জনশক্তি পরিকল্পনা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কখনো কখনো হয়েছে, তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। একটি সময়োপযোগী স্বাস্থ্য জনশক্তি পরিকল্পনা করা সময়ের দাবি। কারণ আমরা উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছি এবং টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রা (এসডিজি) কার্যক্রম শুরু করেছি।
৩. বাজেট: জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। এতে তি হবে না। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করেছে। সুস্থ জনবল দেশের উন্নয়নে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বাজেট মাথাপিছু ৩২ ডলার, ভারতে ৬১, নেপালে ৩৯, ভিয়েতনামে ১১১, মালদ্বীপে ৭১০ ও শ্রীলংকায় প্রায় ১ হাজার ডলার।
৪. নিয়োগ ও বদলি নীতিমালা: দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়োগ ও বদলি নীতিমালা নেই। এটিই তরুণ চিকিৎসকদের হতাশার অন্যতম কারণ। তরুণ চিকিৎসকদের বদলির ধাপ এবং উচ্চতর শিাগ্রহণের সুযোগসংবলিত একটি কার্যকর ঈধৎৎরবৎ চষধহহরহম দরকার। তা হলেও কিছুটা হতাশা দূর হবে। দূরবর্তী বা দুর্গম চিকিৎসাকেন্দ্রের পদায়নের জন্য আলাদা আর্থিক রহপবহঃরাব যুক্ত করা প্রয়োজন।
৫. বিএমডিসিকে শক্তিশালী এবং কার্যকর করতে হবে: প্রায় ১৫ বছর বিএমডিসি মামলাধীন ও অকার্যকর ছিল। বর্তমানে কিছুটা কার্যকর হয়েছে। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ এ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা নানা দুর্বলতায় নিমজ্জিত। চেয়ারম্যান পদে একজন সার্বণিক পেশার সিনিয়র অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দিলে যথাযথ কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয় না। লোকবলের স্বল্পতাসহ রয়েছে নানা সমস্যা।
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বের কথা বিবেচনায় রেখে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তা হলে দেশের স্বাস্থ্য ও মেডিকেল শিা কার্যক্রম অনেক সুষ্ঠু ও নিয়ন্ত্রিত হবে।
৬. বেসরকারি হাসপাতাল ও কিনিক পরিচালনা: দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থারও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ েেত্রই কোনো কার্যকর নীতিমালা নেই। বিশেষ করে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, জনবল, নিয়মিত বেতনকাঠামোসহ কার্যকর নীতিমালা থাকতে হবে, যাতে চাকরিরত চিকিৎসক-নার্স এবং অন্যান্য জনবল চাকরির নিশ্চয়তা পেতে পারে। বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
৭. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশ ফাঁড়ি বা পুলিশের বিশেষ স্কোয়াডের ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসককে আক্রমণ এবং হাসপাতালে ভাঙচুরের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. আঞ্চলিক প্রশাসনিক বিন্যাস: কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা, যোগাযোগ বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সমস্যা সমাধান করা বাস্তবমুখী নয়। প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো এবং মতা প্রদান করে জেলা বা নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রশাসনিক মতা বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন।
৯. ওষুধের মূল্য: বাংলাদেশের ওষুধশিল্প অত্যন্ত গৌরবের। দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে বিশে^র ১৪৫টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। ভেজাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রয়োজনীয় জনবল প্রয়োজন। ওষুধের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ওষুধের মূল্য জনগণের ক্রয়মতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
১০. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাস্থ্য প্রশাসন: স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বাস্থ্য প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে। সচিবালয় থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত প্রশাসন চিকিৎসক সংগঠনের প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে, যাতে প্রশাসন নিরপে, স্বাধীন ও আইনানুগভাবে কাজ করতে পারে। এ বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে।
১১. মেডিকেল ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস): একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এমআইএস খুবই প্রয়োজনীয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমি অসংখ্যবার যোগাযোগ করেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস বিভাগের কাছে কোনো তথ্য বা সহযোগিতা পাইনি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবগত আছেন যে দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিষয়ক তথ্য অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করতে হয়।
১২. সুনির্দিষ্ট অভিযোগ-সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা: ঢালাওভাবে অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রশাসনকে সব সময়ই ধপপড়সড়ফধঃরাব হতে হবে। সহকর্মীর মানসিক অবস্থা, ব্যক্তিগত সমস্যা বিবেচনায় রেখে সহকর্মীবান্ধব প্রশাসন সৃষ্টি করতে হবে। শুধু শাস্তি প্রদান করলে বন্ধত্বপূর্ণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আন্তরিক পরিবেশ গড়ে ওঠে না।
১৩. অভ্যর্থনা ও তথ্যকেন্দ্র: বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি বড় হাসপাতাল ছাড়া এ বিষয়টি একদমই গড়ে ওঠেনি। ফলে রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে তার প্রয়োজনীয় স্থান খুঁজে পেতে অনেক ভোগান্তির শিকার হন। এ জন্য দেশের প্রতিটি হাসপাতালে প্রশিতি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অভ্যর্থনা ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। হাসপাতাল বা মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের খবরাখবর গণমাধ্যমে প্রকাশ করার জন্য একজন সুনির্দিষ্ট মুখপাত্র রাখা বাঞ্ছনীয়। শিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে যে কেউ মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, কিন্তু বিষয়টি নির্ধারিত করে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে হবে।
১৪. পেশাজীবীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ: চিকিৎসকদের সঙ্গে সব পেশার মানুষের রয়েছে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। সব পেশাজীবী চিকিৎসকদের কাছে বন্ধুত্বের কারণেই বিশেষ সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। কিন্তু মাঝে মাঝে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে।
চিকিৎসা একটি জটিল এবং বিস্তৃত বিজ্ঞান। কষ্টসাধ্য ৫ বছর সর্বোচ্চ মেধা প্রয়োগ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ঈঙজঊ কঘঙডখঊউএঊ রপ্ত করতে হয়। এছাড়া কেউ চিকিৎসাশাস্ত্র বা চিকিৎসার ধরন সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারবে না। করলে সঠিক হবে না, বরং বিভ্রান্তিকর হবে। একজন চিকিৎসক চাইলে যেকোনো সাধারণ পেশায় যেতে পারে, যাচ্ছে। কিন্তু অন্য যেকোনো সাধারণ বিষয়ের মানুষ কখনই চিকিৎসক হতে পারবে না।
আমরা সবাই এ দেশের সন্তান, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন। পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিহার করে কিভাবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আস্থা অর্জন করে বোঝাপড়ার শক্ত ভিত স্থাপন করতে পারি, সবার সেদিকেই মনোযোগী হওয়া দরকার। তাহলেই অনেক সংকট দূরীভূত হবে।
আমরা কেউ কাউকে ছাড়া চলতে পারি না বা চলা সম্ভবও নয়। সে জন্য সুসম্পর্ক থাকুক অটুট ও কার্যকর। ১ হাজার ৭৬২ ডলার মাথাপিছু আয়ের এ দেশে অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েও সবার সহযোগিতায় একটি স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। পারস্পরিক বৈরিতা ও দোষারোপ পরিহার করে সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং হাসিমুখে সেবা দিতে হবে যেমন, তেমনি রোগী ও স্বজনদের থাকতে হবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সহনশীলতা। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের আগেই তার দিকনির্দেশনায় সমস্যা সমাধানে বাস্তব পদপে গ্রহণ করা হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরতে পারেন মন্ত্রণালয় থেকে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়