রাজনীতি

চিকিৎসা প্রশ্নে খালেদা জিয়ার স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে জনমত বিপক্ষে যাচ্ছে বিএনপির!

নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি কারাবন্দি খালেদা জিয়া কারা কর্মকর্তাদের আবারো জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ইচ্ছুক নন, তিনি বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চান। ফলে প্রস্তুতি থাকার পরও ১০ মার্চ তাকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি। যদিও বিএনপি নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কারা কর্তৃপ চিকিৎসার উদ্যোগ নিলেও খালেদা জিয়ার স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে তা ভেস্তে যায় ।
বিএসএমএমইউ কর্তৃপও খালেদা জিয়াকে গ্রহণ করতে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন। তিনি স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা খালেদা জিয়ার জন্য আগের মতোই কেবিন ব্লকের ভিআইপি রুম রেডি করে রেখেছিলাম। তিনি না এলে তো আমাদের কিছুই করার নেই। তিনি যখনই আসবেন তখনই আমরা তাকে বিধি অনুসারে চিকিৎসার জন্য গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি। সে অনুসারে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাও থাকবে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। তিনি রাজি হলে যেকোনো সময় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ১০ মার্চ খালেদা জিয়ার কাছে যান কারাগারের কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা খালেদা জিয়াকে জানান চিকিৎসা দেয়ার জন্য তারা তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যেতে এসেছেন।
এ সময় খালেদা জিয়া বলেন, তার এখন ভালো লাগছে না, তিনি যেতে পারবেন না। ভালো লাগলে পরে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন। তিনি আরো বলেন, কারা কর্তৃপ চাইলে চিকিৎসকদের কারাগারে নিয়ে আসতে পারেন।
বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের আহ্বায়ক অধ্যাপক ফরহাদ হালিম বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লকের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, আমার কাছে যে তথ্য আছে, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। এমনকি হুইল চেয়ারের যে পাদানি থাকে সেখানেও উনি ঠিকমতো পা তুলতে পারেন না। কয়েক দিন আগে কারাগারে উনাকে দেখতে অধ্যাপক এ এফ এম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যে বিশেষজ্ঞ টিম গিয়েছিল উনারাও স্পষ্টভাবে বলেছেন, উনাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করতে। কারণ ওই হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নিয়ে থাকেন এবং ওখানেই উনার নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন, যারা সারা জীবন উনাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। এই চাওয়াটা বা দাবিটা উনার যে খুব বড় দাবি সেটা মনে করা ঠিক নয়। উনাকে যে বিএসএমএমইউতেই আনতে হবে এমন কোনো কথা নেই।
পুলিশ সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াকে নিরাপত্তা দিয়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য কারা ফটকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, অ্যাম্বুল্যান্স ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি প্রস্তুত রাখা ছিল। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ৬২১ ও ৬২২ নম্বর কেবিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে গোছানোর কাজ শুরু হয়েছিল। ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ।
উল্লেখ্য, জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট ও জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের দ- নিয়ে নাজিমুদ্দীন রোডের কারাগারে বন্দি রয়েছেন খালেদা জিয়া। সেখানে তিনিই একমাত্র বন্দি। মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে গত বছরের ৭ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সে সময় ১ মাস চিকিৎসা শেষে নভেম্বর মাসে তাকে কারাগারে ফিরিয়ে নেয়া হয়। সেই সময়েও খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে না এসে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে যেতে চেয়েছিলেন।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে সরকার চাচ্ছে, তিনি বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা গ্রহণ করুক। অপরদিকে খালেদা জিয়া চাচ্ছেন, তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে শুরু থেকেই রশি টানাটানি চলছে।
বিএনপিপন্থি ডাক্তার ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, খালেদা জিয়া যেহেতু কারাবন্দি ও অসুস্থ, সেহেতু সরকার তথা কারাকর্তৃপক্ষ তাকে যে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠাবে, তার সেখানেই যাওয়া উচিত। এখানে সরকারি হাসপাতাল বা বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ে এত শর্ত আরোপ করতে গেলে সাধারণ মানুষ ভাববে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা শারীরিক নয়, রাজনৈতিক। তার অসুস্থতা যদি শারীরিকই হতো, তাহলে চিকিৎসা নেয়ার জন্য হাসপাতাল কোনো বিবেচ্য বিষয় হতো না। চিকিৎসা নিয়ে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার আচরণে জনমত তার বিপক্ষে যাচ্ছে বলেও মনে করে বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী।
তবে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, খালেদা জিয়া আসলে বিএসএমএমইউ বা ইউনাইটেড Ñ কোনো হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে চান না। তিনি এ মুহূর্তে চাচ্ছেন প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়ে মুক্ত জীবনযাপন করতে। জেলে গিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছিলেন, তা ফুলফিল না হওয়ায় প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশ যাওয়াকেই এখন শ্রেয় মনে করছেন খালেদা জিয়া।