কলাম

জবুথবু জামায়াত

ড. জোবাইদা নাসরীন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এবং এখন পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবস্থান নিয়ে মা প্রার্থনা না করা। পরের কারণটি অবশ্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি। সেই দাবি বাস্তবায়ন না হলেও এই মুহূর্তে খান খান করে জামায়াত যে ভাঙছে তার ঝনঝন শব্দ সবাই শুনতে পাচ্ছে। তবে আপাত দৃশ্যমান এই ভাঙনের প্রথম ঝুনঝুনি বাজিয়েছেন জামায়াত রাজনীতিতে এতদিনের পরীতি নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক।
বেশ কয়েক বছর থেকেই বিএনপির পেটে ঢুকে থাকা জামায়াত তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে নড়বড়ে অবস্থায় আছে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত জামায়াতের রাঘববোয়ালদের অনেকেরই ফাঁসি হওয়ার পর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের মানসিক জোর অনেকটাই নির্ভর করেছে বিএনপির নড়ানড়িতে। বাতিল হয়েছে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন। তাই জামায়াত নাকানিচুবানি খাওয়া অবস্থায় ছিল নির্বাচনের আগ থেকেই। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপির প্রতি ভিার হাত বাড়িয়েই রেখেছিল। জামায়াত প্রশ্নে ঐক্যজোটেও ছিল চরম অস্বস্তি। শেষ পর্যন্ত জামায়াতকে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।
তবে বিএনপি-জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি এই হানিমুন নিয়ে বিএনপিতেও নানা রাগ-বিরাগ ছিল। অবশ্য সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা আবারও জামায়াতকে আলোচনায় এনেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নেতা আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ দলের মধ্যে এক ধরনের ঝাঁকুনি যে তৈরি করেছে তা বোঝা যায় ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। দলে সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতা, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুকে দল থেকে বহিষ্কার করার মধ্য দিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চেষ্টা করছেন দল হিসেবে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিভাজনগুলো কিংবা মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে যে দাবি জানানো হয়েছিল সেগুলো আর যেন না এগোতে পারে। তবে সেটি যে মোকাবিলা করা যায়নি তা আরও স্পষ্ট হয় সম্প্রতি জামায়াতের দিনাজপুর জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন আমির বখতিয়ার উদ্দিন যখন নিজ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
জামায়াত নেতৃত্বের চোখে শর্ষে ফুল দেখানো পদত্যাগের ঘোষণায় ব্যারিস্টার রাজ্জাক মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এবং সেই বিষয়ে জাতির কাছে মা চাওয়ার বিষয়টিকেই প্রধান হিসেবে উল্লেখ করেন। বিভিন্ন সাাৎকারে তিনি আরও জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের অন্দরমহলে এই বিষয়টি নিয়ে গুজগুজ ফুসফুস চলছিল। পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন তিনি পাঁচ পৃষ্ঠার চিঠিতে। তার জোর দাবি, তিন দশক ধরে চেষ্টা করেও একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে মা চাওয়াতে পারেননি তিনি।
তবে দলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে মা চাওয়ার প্রস্তাবক এই আবদুর রাজ্জাকই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের প্রধান আইনজীবী এবং দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। তাই তার ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে তখন কী যুক্তিতে সেটি তিনি করলেন?
সাদা চোখে দেখলে শুধু এবারই নয়, রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে আগেও এ ধরনের রাজনৈতিক বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুবার নিষিদ্ধ হয়েছে জামায়াত। একবার পাকিস্তান আমলে, আরেকবার স্বাধীন বাংলাদেশে।
১৯৪১ সালে জামায়াতের রাজনীতির সূচনা হয়েছিল ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’-এর মধ্য দিয়ে। দলটি প্রতিষ্ঠা করেন সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছিল দলটি। কিন্তু আবার দেশভাগের পর পাকিস্তানেই ১৯৪৮ সালে তিনি ‘ইসলামী সংবিধান’ ও ‘ইসলামী সরকার’ প্রতিষ্ঠার জন্য দলের মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। ৫ বছরের মধ্যে মওদুদীর নেতৃত্বে আহমদিয়াদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণার দাবিতে লাহোরে দাঙ্গায় প্রায় ৩০০ আহমদিয়া মারা যায়। এরও অনেক পরে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক হিসেবে আইয়ুব খান যখন মতায় আসেন, তখন তিনি সব ধর্মীয় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। সে দফায় প্রথমবারের মতো জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়েছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত শুধু যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেছে তা নয়, তার সঙ্গে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষদের হত্যা, লুট, ধর্ষণ এবং মুক্তিযোদ্ধা ও অমুসলিমদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ সব ধরনের যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে দলটিকে নিষিদ্ধ করেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান মতায় এলে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে জামায়াতকেও রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন।
১৯৭১ সালে গণহত্যা, নারী নির্যাতনসহ অন্যান্য নিপীড়নের জন্য পাকিস্তান যেমন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছে মা চায়নি, তেমনি জামায়াতও চায়নি। এর মানে জামায়াত মনেপ্রাণে বাংলাদেশকে এখনো মেনে নিতে পারেনি। দ্বিতীয় দফা নিষিদ্ধ হওয়ার পরও দমেনি জামায়াত।
রাজনীতিতে অনেকবারই দেখা দিয়েছে জামায়াতের এই ধরনের অস্তিত্ব সংকট। কিন্তু অতি ধুরন্ধর জামায়াত তাদের দুঃসময়ে সরকার বা সামরিক বাহিনী কিংবা উভয়ের সঙ্গে সমঝোতা করে আবার ফিরেও এসেছে নিজের আদর্শিক চরিত্র নিয়েই। পাকিস্তানে প্রথম দফায় নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেনাবাহিনী ও মতাসীন দলের সঙ্গে আপস করেই অস্তিত্ব রা করেছিল জামায়াত। আর স্বাধীন দেশে দ্বিতীয় দফা নিষিদ্ধের পরও বহুদলীয় গণতন্ত্রের বাতাসে আবারও নিজেদের রাজনীতি নিয়ে হাজির হয় জামায়াত। শুধু হাজির হয়েই সীমিত থাকেনি, এ দেশে রগকাটা রাজনীতির সূচনা করেছে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এবং এর মধ্য দিয়ে জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে এ দেশের রাজনীতিতে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রগকাটা রাজনীতির মধ্য দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল ইসলামী ছাত্রশিবির।
জামায়াতের নেতৃত্ব নিয়ে কখনো কোনো ধরনের দুর্যোগের খবর জামায়াতের দুর্গ ভেঙে বাইরে আসেনি। বরং তাদের আদর্শের আপসহীনতার সঙ্গে সংসার করছিল রগকাটা রাজনীতি। তাই হঠাৎ করে জামায়াতের প্রভাবশালী নেতৃত্বের কারো কারো দলের বাইরে বের হয়ে খোলা ময়দানে জামায়াতের সঙ্গে থাকা প্রশ্নে ঝেড়ে কাশি দেয়া অনেকের কাছেই যেন ‘কেমন কেমন’ লাগছে। তাহলে এবার জামায়াত ভাঙছেই!
মুক্তিযুদ্ধের পরপরই স্বাধীন দেশে জামায়াত নিষিদ্ধ হলেও ১৯৭৫-এর পর আবারও ছোবল দিয়ে ওঠা জামায়াতকে আওয়ামী লীগ নানা ভোটের সমীকরণে নিষিদ্ধ করতে পারেনি এতদিন, সে জামায়াত নিজেই যাচ্ছে ধ্বংসের পথে? নাকি নতুন করে রাজনৈতিক চরকি শুরু করেছে জামায়াত?
এ বিষয়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি হলো, জামায়াত হয়ত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নামছে। রাজ্জাকের পদত্যাগ ও মঞ্জুকে বহিষ্কারের ঘটনা মূলত লোকজনের চোখে ধূলো দেয়ার মতো। জামায়াত দীর্ঘদিন ধরেই হয়ত এই পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন জামায়াত গত কয়েক বছর থেকেই তুর্কি মডেলে এগোনোর পরিকল্পনা করছে। জনমনে এই ধারণা আরও বিশেষভাবে পোক্ত হয় ২০১৬ সালের মার্চ মাসের পর থেকে। সে সময় থেকেই জামায়াত-শিবিরের তরুণ অংশটি তুরস্কের গুলেন মডেলে বাংলাদেশে অভ্যুত্থান সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং ভবিষ্যতে করবে বলে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্দেহ করে আসছে। তাই সেদিক থেকে শঙ্কা আরও বাড়ছে এবং জনমনেও সন্দেহ গভীরতর হচ্ছে।
এর আগে বহুবার যখন জামায়াত নিষিদ্ধ করার দাবি এসেছে, তখনো এই ধরনের আশঙ্কা অনেকেই করেছেন যে, জামায়াত নিষিদ্ধ হলে তাদের নেতাকর্মীরা অন্য কোনো দলে ভিড়ে যাবে কিংবা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’-এ থাকা দল হিসেবে আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠবে। ফলাফল আরও ভয়াবহ হতে পারে। এখন যদি আমরা একাত্তরকেই দলের অভ্যন্তরের বিরোধের প্রধান জায়গা হিসেবে ধরে নিয়ে আলোচনা পাড়তে চাই, তা হলে কী হবে আসলে?
দলের অপোকৃত তরুণদের একটা অংশ চায়, একাত্তরের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে মা চেয়ে জামায়াত নতুন করে আবার শুরু করুক। তারা মনে করছেন প্রয়োজনে এই দলের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন করা প্রয়োজন। এদের কেউ কেউ আবার ভিন্নভাবে দেখতে আগ্রহী। তারা রাজনীতি বাদ দিয়ে জামায়াতকে সামাজিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মেলে ধরতে চান। তবে সে েেত্র দলটিতে শুধু মুক্তিযুদ্ধে কর্মকা-ের জন্য মা প্রার্থনাই নয়, প্রয়োজন হবে বড় ধরনের আদর্শিক পরিবর্তনের। এজন্যই হয়ত অনেকেই এই উদ্যোগে তুর্কি মডেলের গন্ধ পাচ্ছেন।
বিএনপির গায়ে হেলান দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে নিবন্ধনবিহীন দল জামায়াতের। এর পাশাপাশি দলে যে সংস্কার প্রস্তাব এসেছে, সেটি মওদুদীর অনুসারী মূল নেতৃত্ব গ্রহণ করবে না বলে মনে হচ্ছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছরেও জামায়াত একাত্তরের অপরাধের জন্য কখনো মা চায়নি এবং অনুশোচনাও করেনি। আচমকা ব্যারিস্টার রাজ্জাকের এই পদত্যাগ ইস্যুটি বর্তমান রাজনীতিতে বেশ জবুথবু থাকা জামায়াতকে কিছুটা মুমূর্ষু করেছে। তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিতে জামায়াতের রাজনীতির এই পরিণাম হয়ত অনেকেরই কাম্য। অনেকের মনেই রয়েছে নানা সন্দেহ, অবিশ্বাস। জামায়াত এ দেশের মানুষকে চরকিতে চড়িয়ে ঘোরানো কিংবা ভেলকি দেখাচ্ছে না তো? কেন জানি কারোরই বিশ্বাস হচ্ছে না। এর কারণ কী? কারণ খুব সহজ Ñ দলটি যে জামায়াত।
লেখক: শিক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়