রাজনীতি

জামায়াতের সাম্প্রতিক বদলে যাওয়ার কৌশল লোক দেখানো!

নিজস্ব প্রতিবেদক
জামায়াতে ইসলামীর একটি অংশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের দলের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলছে। এ ইস্যুতে কেউ দল থেকে পদত্যাগ করেছেন আবার কাউকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াত।
জামায়াতের সাম্প্রতিক কর্মকা- নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর মা চাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সংস্কার ইস্যুতে কমিটি গঠনের বিষয়টি লোক দেখানো বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মত দিতে শুরু করেছেন। তারা বলছেন, এ নিয়ে দলে ব্যাপক অস্থিরতা হলেও আপাতত মা চাওয়ার পথে হাঁটছে না দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াত। সংস্কারের দাবিতে প্রভাবশালী নেতাদের পদত্যাগ, বহিষ্কারসহ নানা জটিলতা সামনে এলেও দলটির সংস্কার ও নাম পরিবর্তন আপাতত হচ্ছে না।
সংস্কারের দাবিতে জামায়াত-শিবিরের একটি গ্র“প শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রোপটে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যই তড়িঘড়ি করে সংস্কারের নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে বলছেন নেতাকর্মীরা। তবে এবার অতীতের মতো সংস্কার দাবি হারিয়ে যাবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতের সংস্কারপন্থিরা।
সংস্কারের দাবি তোলায় বহিষ্কৃত হলেও অবস্থানে অটল আছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি, জামায়াতের ঢাকা মহানগর মজলিশে শূরার অন্যতম সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, জামায়াতের ভেতর নবীন-প্রবীণদের একটি বিশাল অংশই দলে সংস্কারের জন্য উদগ্রীব। তাদের অনেকেই ১৯৭১ এ দলের বিতর্কিত ভূমিকা স্পষ্ট করে সামনে এগোনোর প।ে আমি সেটা সাহস করে বলেছি, অনেকে সেটা বলতে পারেন না। বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমি আশাবাদী, আমাদের এই দাবি দল অনুধাবন করবে। এটা হবেই।
জামায়াতের দেয়া তথ্য অনুসারে, নতুন নামে ও নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভাবের পথ খুঁজে বের করতে ৫ সদস্যের একটি উচ্চ মতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেছে দলটি। দলের নীতিমালায় পরিবর্তন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতার জন্য মা চাওয়াকে ঘিরে দলের মধ্যে বিরোধের খবর প্রকাশিত হওয়ায় এই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এই কমিটি গঠন করা হয়। এতে অন্য সদস্যরা হলেন সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, হামিদুর রহমান আজাদ, মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রমুখ।
জামায়াতকে নতুন দল হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দলটিকে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সংবিধান ও অন্যান্য কৌশল নির্ধারণে কমিটির সদস্যরা কাজ করবেন। তবে কমিটি কবে নাগাদ তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, দলের প থেকে তা জানানো হয়নি।
নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের সব কর্মকা- বন্ধ করে দেয়া হবে না বলেও গণমাধ্যমে তথ্য দিচ্ছেন জামায়াতের একাধিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক। তারা বলছেন, তবে এর মাধ্যমে জামায়াতের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হবে না। দলটি তখন সামাজিক কাজে নিয়োজিত থাকবে। দেশের বাইরে বিশেষ করে মিসর, তুরস্ক ও তিউনিসিয়ার ইসলামী দলগুলোর আন্দোলনের ধরন থেকে শিা নেবে। ইতোমধ্যে জামায়াতের এক পরামর্শকের বরাতে দলের সম্ভাব্য নামও প্রকাশ
হয়েছে।
জামায়াতের অন্যতম পরামর্শক সাবেক সচিব শাহ আব্দুল হান্নান বলেছেন, জামায়াত নেতৃত্ব রাজনীতিকে আলাদা করে একটি নতুন দল গঠনের বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এই পার্টির মূল ল্য থাকবে, একটা কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এই পার্টি আলাদা নামে হবে। মনে করেন, এ রকম নাম হতে পারে, যেমন বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার পার্টি বা বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি, এরকম একটা নাম হবে। এই প্রস্তাব এসেছে। এই নামের সঙ্গে ‘ইসলাম’ শব্দ না-ও থাকতে পারে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাপী একটা নতুন চিন্তা এসেছে যে, রাজনীতি আর দাওয়াত বা রাজনীতি ও প্রচারকে আলাদা করা। সেই দিকটাকে সামনে রেখে তারা নতুন পার্টির চিন্তা করছে।
যদিও দলটিতে সংস্কারের দাবিতে সক্রিয় নেতাকর্মীরা বলছেন, সংস্কারের দাবিকে সামাল দিতেই জামায়াতের বর্তমান শীর্ষ নেতারা লোক দেখানো কৌশল নিয়েছেন। সংস্কারের দাবিকে অগ্রাহ্য করে বর্তমান অবস্থান ধরে রাখার কারণেই ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে পদত্যাগ করতে হয়েছে। সংস্কারের দাবি তোলায় বহিষ্কার করা হয়েছে মজিবর রহমান মঞ্জুকে।
মজলিশে শূরার সদস্যরা বলছেন, সংস্কার নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব উল্টো পথে হাঁটছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় অন্যতম পরামর্শক শাহ আব্দুল হান্নানের অবস্থানেও। ইতোমধ্যে শাহ আব্দুল হান্নান বলেছেন, জামায়াতের মধ্যে কোনো সংস্কার হয়নি বলে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যে অভিযোগ করেছেন তা ঠিক নয়। জামায়াতের কার্যক্রমে অনেক সংস্কার ও অগ্রগতি হয়েছে। জামায়াত নারীদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে।
পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী আর বাংলাদেশ জামায়াত এক নয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বর্তমান জামায়াতে ইসলামী ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার সময়ের ভূমিকার জন্য তাদের মা চাওয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক নয়।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ব্যারিস্টার রাজ্জাক পদত্যাগের আগে জামায়াত যে অবস্থানে ছিল, এখনো সে অবস্থানেই আছে। তারা যে কমিটি করেছে, তাতে সব সদস্যই একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ার পক্ষে। সেজন্যই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের সাম্প্রতিক বদলে যাওয়ার কৌশল কেবলই লোক দেখানো এবং সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই নয়।