রাজনীতি

জোট নাকি জামায়াতমুক্ত বিএনপি: দ্বিধাদ্বন্দ্বে দলের শীর্ষ নেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
জোটমুক্ত হবে নাকি জামায়াতমুক্ত হবে Ñ এ নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব এখন বেশ স্পষ্ট। জামায়াতে ইসলামীকে জোটের বাইরে রাখতে নানা প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কোনো কোনো নেতা বলছেন, ঘোষণা দিয়ে জামায়াতকে ২০ দলীয় জোট থেকে বের করে দেয়া উচিত। আবার কোনো কোনো নেতা বলছেন, ঘোষণার দরকার নেই, ২০ দলীয় জোট ভেঙে দিলেই জামায়াতমুক্ত হয়ে যাবে বিএনপি।
বিএনপির এই পক্ষটি বোঝাতে চাচ্ছে ২০ দল ভেঙে দেয়া হলে জামায়াত ছেড়ে দেয়ার প্রসঙ্গটি আর আসবে না। এ ইস্যুতে ১৩ মার্চ দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম-জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে নানামুখী সমালোচনার প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতাদের মধ্যে এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
দেশি-বিদেশি নানা মহল ও দল সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই জামায়াত ছাড়তে পরামর্শ দেন বিএনপি নেতাদের। এমন আলোচনার মধ্যে মাসখানেক আগে জামায়াতই ২০ দলের বৈঠক ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করে বিএনপির সঙ্গ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়।
বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, দলে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এখন জামায়াতের প্রসঙ্গটি ঘুরেফিরে আসছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংগঠনিক জেলা নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত কি না সেই মতামত নিচ্ছেন। এ বিষয়ে বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গেও তারেক রহমানের কথা হচ্ছে।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আলোচনা থেকে জানা যায়, জামায়াত ছাড়তে হলে কিভাবে তা করা যায় এ নিয়ে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন, জামায়াতকে ২০ দলের বাইরে থাকার পরামর্শ দেয়া উচিত। কারও মতে, পুরো জোটই ভেঙে দিতে হবে। ২০ দলের কোনো প্রয়োজনীয়তা এখন আর নেই। ঐক্যফ্রন্ট থেকেও সরে আসার মত দেন কয়েক নেতা। এক নেতা বলেন, জামায়াতকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হলে দলটির সঙ্গে বিএনপির তিক্ত সম্পর্ক তৈরি হবে। পুরো জোট ভেঙে দেয়া হলে সম্পর্ক খারাপ হবে না, আবার ভালো সম্পর্কও থাকবে না।
দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের মতে, জামায়াত চলে যেতে চাইলে তাদের বাধা দেবে না বিএনপি। বরং তারা খুশিই হবে। কারণ যুদ্ধাপরাধের এই দলের দায় ঘুরে-ফিরে বিএনপির ওপর আসছে। দেশ ও বিদেশের কেউই বিষয়টি ভালোভাবে দেখছে না।
এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করে বিএনপির কয়েকজন নেতা মনে করেন, জামায়াতকে ছেড়ে দিলে রাজনৈতিক ফায়দা কী, লাভ-তিটা মূল্যায়ন করতে হবে।
বিএনপির একটি পক্ষের মতে, সরকার জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করছে। সরকার চাইলে যেকোনো সময় জামায়াত নিষিদ্ধ করা সম্ভব। তারা তা করছে না কেন? সরকার জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করলে বিএনপিরও রাজনীতি করা উচিত।
অবশ্য বিএনপির তৃণমূলের মতামত জামায়াতের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে বেশি। তৃণমূল নেতারা বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রোপটে জামায়াত থাকলে বিএনপির বিশেষ কোনো সুবিধা নেই। বিএনপি একাই ১০০।
১৩ মার্চ গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্কাইপেতে তারেক রহমানের উপস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতাদের কয়েকজন বলেন, রাজনীতি এখন অনেকটাই জোটকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এর থেকে বের হতে হবে।
ওই নেতা বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল নাকি ভুল ছিল তা ইতিহাস একদিন তুলে ধরবে। নির্বাচনে যা অর্জন হওয়ার তা হয়েছে। তাই এবার ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতিকে বন্ধ করে নিজেদের সমতা বাড়াতে হবে।
বৈঠকে জামায়াতের প্রসঙ্গটি এজেন্ডায় না থাকলেও আলোচনার একপর্যায় এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ভারতপন্থি বলে পরিচিত বিএনপির এক নেতা বলেন, জামায়াত ছাড়তে হবে। এদের কারণে বিদেশিদের সঙ্গে আমরা কথা বলতে পারি না।
কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য বলেন, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের বিরোধিতা করেছিল শিবির। বিএনপি জোটে জামায়াত থাকায় নতুন প্রজন্ম ডাকসুতে আমাদের ভোট দেয়নি।
এর জবাবে অপর এক নেতা বলেন, জামায়াত থাকার কারণে ভোট কমলে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে জোট হওয়ায়ও আমাদের ভোট কমেছে। কারণ জয়বাংলা স্লোগানধারীদের সঙ্গে জোট হয়েছে। এতে বিএনপি সমর্থকরা ুব্ধ হয়েছে। এর মধ্যে একজন জোটের সিদ্ধান্ত উপো করে সংসদে যোগ দিয়ে এখন বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলছেন।
বৈঠকে জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারে ভিন্নমতও আসে। কয়েকজন নেতার মতে, আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারত জামায়াতের বিরোধিতা করছে। কিন্তু সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করছে না। রাজনীতির প্যাঁচে যাতে আমরা না পড়ি, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জামায়াতকে নিয়ে সরকার রাজনীতি করতে চাইলে আমাদের সাবধানে পা দিতে হবে।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে জামায়াতের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকেও আলাদা হওয়ার প্রবল দাবি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। বিএনপির তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দখল করে নিয়েছে। এতে বিএনপির কোনো লাভ হয়নি; বরং দলের চরম ভরাডুবি হয়েছে। তাই দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে এখনই ঐক্যফ্রন্টের খোলস থেকে বের হয়ে সমহিমায় রাজনৈতিক ময়দানে আবির্ভূত হতে হবে।