প্রতিবেদন

ঢাকা উত্তর সিটি মেয়র আতিকুল এবং উত্তর-দক্ষিণে কাউন্সিলর হলেন যারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আতিকুল ইসলাম। ১ হাজার ২৯৫ কেন্দ্রে সবগুলোর ফলে তিনি নৌকা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৪০২টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাফিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ৫২ হাজার ৪২৯ ভোট। এ নির্বাচনে বিএনপির কোনো প্রার্থী ভোটের মাঠে ছিল না।
উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাশেম ২৮ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত দেড়টায় আতিকুল ইসলামকে ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, এই নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ৩১.০৫ শতাংশ।
ডিএনসিসির নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাাৎ করেন। নবনির্বাচিত মেয়র ফুলের তোড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও ডিএনসিসির মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় আতিকুল ইসলামকে অভিনন্দন জানান এবং মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনে তার সাফল্য কামনা করেন।
উল্লেখ্য, ডিএনসিসির মেয়র পদে উপনির্বাচনে মোট ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় আতিকুল ইসলামের মেয়র পদে জয়লাভ অনেকটা নিশ্চিত ছিল। তারপরও নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি এখন মেয়র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ঢাকার উত্তর সিটির মেয়র পদে উপনির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে এতে
ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
ভোটের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টায় বৃষ্টিস্নাত বৈরী আবহাওয়ায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বৃষ্টির কারণে সকাল থেকে ভোটার উপস্থিতি তেমন ছিল না। দুপুর নাগাদ আবহাওয়া ভালো হলেও ভোটার উপস্থিতি খুব একটা বাড়েনি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে এ নির্বাচনে কোথাও কোনো অপ্রীতিকতর ঘটনা ঘটেনি।
ভোটার উপস্থিতি কম হলেও এর দায় নিতে রাজি নয় নির্বাচন কমিশন। উত্তরার একটি কেন্দ্রে ভোট দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা ভোটারদের উপস্থিতির হার কম হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এর দায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোটের পরিবেশ তৈরি করে। ভোটার আনার দায় নির্বাচন কমিশনের নয়।
সিইসি আরো বলেন, দুটি কারণে ভোটার উপস্থিতি কম থাকতে পারে। একটি হচ্ছে স্বল্প সময়ের জন্য এই নির্বাচন, ১ বছর পরে আবার নির্বাচন হবে Ñ সেজন্য এবার ভোটের প্রতি ভোটারের আগ্রহ কিছুটা হলেও কম হতে পারে। আর সব রাজনৈতিক দল অংশ না নেয়ায় ভোটাররা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে না ভাবলে কম হতে পারে। এ নির্বাচনের মেয়াদ অল্প দিনের। ফলে ভোটারদের আগ্রহ কম। আবার এখানে সব দল অংশ নেয়নি। এতেও উপস্থিতি কম হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদে ভোটগ্রহণের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটির সম্প্রসারিত ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদেও একই সাথে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মেয়র পদে উপনির্বাচন হওয়ায় উত্তরের সম্প্রসারিত ১৮টি ওয়ার্ডে সাধারণ নির্বাচনের ভোটারদের মেয়র পদে ভোট ছিল না। এ কারণে মেয়র পদে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক।
এবার লক্ষ্য করা গেছে যে, গত ২৩ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদে উপনির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলেও গতবারের তুলনায় এবার নির্বাচনি প্রচারণার শুরুতেই নিরুত্তাপ পরিবেশ বিরাজ করছিল। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায়নি। এমনকি ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝেও এ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ কমই দেখা গেছে। ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলামসহ যেসব প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে ছিলেন তারাও প্রচারে তেমন একটা সরব ছিলেন না। তারা সকলেই তাদের নির্বাচনি বাজেট ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন।
তাই একমাত্র আতিকুল ইসলাম ছাড়া গোটা নির্বাচনি এলাকায় অন্য কোনো প্রার্থীর পোস্টার দেখা যায়নি। কোনো প্রার্থীর পে মাইকিং সভা-সমাবেশ এমনকি মিছিল পর্যন্ত করতে দেখা যায়নি। ফলে প্রার্থীদের পরিচয় সম্পর্কে ভোটাররা অবহিত ছিল না। ভোটের দিন অনেককেই এমন অভিমত ব্যক্ত করতে দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। স্ত্রী ও মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টিভেজা সকালে উত্তরার আজমপুরের নবাব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন তিনি। নিজ কেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়ার আগে ওই কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি তেমন ছিল না। ভোটারশূন্য কেন্দ্রে নিজের ভোট দিয়ে আতিকুল ইসলাম ‘গরম চা আর গরম খিচুড়ি’ খেয়ে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে বলেন, এ কেন্দ্রে তুলনামূলকভাবে ভোটার কম। এখানে শুধু মেয়রের ভোট রয়েছে। যেসব এলাকায় কাউন্সিলরদের ভোট রয়েছে সেসব কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ভালো হবে। তবে নিজের ভোট দিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাফিন আহমেদ ভোটে কিছু অনিয়মের অভিযোগ উপস্থাপন করে বলেন, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি লণীয়ভাবে কম। ব্যাখ্যা দিতে পারব না, তবে আশানুরূপ সাড়া দেখতে পাচ্ছি না ভোটারদের মধ্যে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে অনেক অনিয়ম হয়েছে। তাই সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ভোটাররা নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে নিজের ভোট প্রদান করেন জতীয় পার্টির এই প্রার্থী।
এদিকে মগবাজারের ইস্পাহানি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে এক লিখিত বক্তব্য দেন। তাতে তিনি বলেন, মেয়র নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। অংশগ্রহণমূলক না হলে ভোটারদের উৎসাহও থাকে না। রাজনৈতিক পরিচয়ে মেয়র পদে নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল এতে অংশগ্রহণ না করায় এটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নয়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে তাতে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহ দেখায় না। এ সময় তিনি এই নির্বাচনকে অপূর্ণাঙ্গ বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু যেখানে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে ভোট বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। ভোটারদের উপস্থিতিও সেখানে ভালো ছিল। এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন উপ-নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার পেছনে ৫টি কারণ তুলে ধরে বলেন, ভোটের দিন ছুটি ছিল। অনেক ভোটার গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। বড় একটি দল অংশ নেয়নি। দিনের শুরু থেকে বৃষ্টির বাগড়া ছিল। তাছাড়া এটা একটি উপ-নির্বাচন। ভোটারদের উপস্থিতি কম হবার কারণ মূলত এগুলো।
তিনি বলেন, তারপরও ২০০১ সালে সাদেক হোসেন খোকা যে নির্বাচনের মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারচেয়ে ভালো ভোট হয়েছে। ১ মার্চ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ২০০১ সালে ১০ ভাগ ভোট নিয়ে সাদেক হোসেন খোকা মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার এতকিছুর পরও ভোটারের উপস্থিতি তুলনামূলক অনেক বেশি।