প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

দেশজুড়ে সাড়ম্বরে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ উদযাপন : জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান

মেজবাহউদ্দিন সাকিল : প্রকৃতির নিয়মে যথারীতি বৈশাখ আসে। কিন্তু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির জীবনে আসে দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রত্যয়ে এবার পালিত হয়েছে নববর্ষ। রাজধানী ঢাকাতে প্রতিবারের মতো এবারও বিপুল আয়োজন ও উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদযাপন। জাতির জীবনে নিঃসন্দেহে এটি একটি প্রেরণাসঞ্চারি ঘটনা। সামাজিক সকল অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মনে শুভবোধ জাগিয়ে তোলার মানসে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে গানে গানে বরণ করেছে ছায়ানট। ‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’ এই আহ্বান নিয়ে এবার সাজানো হয়েছে রমনার বটমূলের প্রভাতী আয়োজন।
১৪২৪ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশ ছিল জাতিসংঘের লো ডেভেলপড কান্ট্রি বা এলডিসিভুক্ত দেশ। ১৪২৫ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশ জাতিসংঘের উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত হয়। ১৪২৬ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশ জাতিসংঘের উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্তির এক বছর পূর্ণ করে। বাংলা যে বঙ্গাব্দটি আমরা ফেলে এসেছি, সে অব্দে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটেনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পর বিশ্বসংস্থা জাতিসংঘ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতির বছরপূর্তি এবারের বর্ষবরণে এনেছে ভিন্ন মাত্রা। ১৪২৬ বঙ্গাব্দে উচ্ছ্বসিত পুরো বাংলাদেশ। বর্ষবরণের আনন্দে উদ্বেলিত পুরো জাতি।
এবারের বর্ষবরণে জাতি স্মরণ করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাদেশ জাতিসংঘের এলডিসিভুক্ত দেশের তালিকায় স্থান পায়। ৪৩ বছর পর জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০১৮ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান পায়। দেশের দু’টি বড় অর্জনই এসেছে জাতির পিতা ও তাঁর কন্যার হাত ধরে। সে হিসাবে এবারের বর্ষবরণে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মুখেই উচ্চারিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জয়গান। জাতি সশ্রদ্ধ চিত্তে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জননী জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পাশাপাশি গত ৪ বছর ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পহেলা বৈশাখে উৎসব ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত বর্ষবরণ উৎসবকে দেয় ভিন্ন মাত্রা। গত ৩ বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো পহেলা বৈশাখের আগেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ ভাতা পান। সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও তাদের কর্মীদের উৎসব ভাতা প্রদান করে।
ধর্মান্ধরা বৈশাখী ভাতা প্রদানকে বাড়াবাড়ি বললেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে স্পষ্ট বলে দেন, বৈশাখ উদযাপনে কোনো ধর্মীয় বাধা-নিষেধ নেই। আবার এও বলেন, মুক্তচিন্তার নামে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া সম্পূর্ণ বিকৃত ও নোংরা রুচির পরিচায়ক।
১৪২৬ বঙ্গাব্দে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আসুন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলি। নতুন বছরের প্রথম দিনে আমরা অতীতের গ্লানি ভুলে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে আশায় বুক বাঁধি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন করে শুরু হোক জীবনের জয়গান। যুগ যুগ ধরে বাঙালির মননে-মানসে পয়লা বৈশাখ শুধু বিনোদনের উৎস নয়, বৈষয়িক বিষয়েরও আধার হয়ে থাকুক।

বৈশাখে এসেছে জাগরণের ডাক
বাঙালির জীবনে ১ বৈশাখ ১৪২৬ সাল, ১৪ এপ্রিল ২০১৯ সালের ভোর এসেছে নতুন বারতা নিয়ে। সার্বজনীন উৎসবে মেতেছে বাঙালি। চৈত্রসংক্রান্তির নানা আয়োজনে ৩০ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে সে উৎসবের সূচনা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ বরণের প্রাক্কালে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, সংস্কৃতি যত ছড়াবে মানুষের মন তত আনন্দিত হবে। সংস্কৃতির সঙ্গে সৌন্দর্যের একটি যোগসূত্র রয়েছে। আমরা যদি সেটাকে মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে মানুষ হত্যা, জঙ্গিবাদ, অন্যায় ও প্রতারণা থেকে নিজেদের রা করতে পারবো।
ছায়ানট এবার বৈশাখ বরণ করেছে বিশ্বায়নের বাস্তবতায় বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান নেয়ার আহ্বানে। আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে লালনের দর্শনের চেতনায় বাঙালির হৃদয়ে শুভবোধ জাগরণের প্রত্যাশা নিয়ে।
সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এতে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক, নারী-শিশুসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সতর্কতার কারণে সারাদেশে নির্বিঘেœ বাংলা নববর্ষের উৎসব-কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে।
চৈত্রের শেষ দিনে হালখাতা করে ব্যবসার হিসাব চুকানো বাংলার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। আর রবি ঠাকুরের গানের বাণীতে কণ্ঠ মিলিয়ে বৈশাখের প্রথম দিন বাঙালির প্রত্যাশা থাকে, বৈশাখের রুদ্র ঝড় পুরনো বছরের আবর্জনা উড়িয়ে নেবে; গ্রীষ্মের প্রচ-তায় শুদ্ধ হবে মানবিকতা।
গেল বঙ্গাব্দের রোহিঙ্গা সংকট নতুন বছরেও বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গী হচ্ছে। প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার একজনকেও মিয়ানমার ফেরত পাঠানো যায়নি। গেল বছর ‘মানবিক বাংলাদেশ’-এর স্বীকৃতি আরো বিস্তৃত হয়েছে। এর বিপরীতে নারী ও শিশু নির্যাতন বিশেষ করে বঙ্গাব্দের একবারে শেষ দিকে এসে ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা বলে দিচ্ছে লালনের সোনার মানুষ হতে আরও অনেক পথ বাকি।
নববর্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলা নববর্ষ জাতীয় জীবনের সর্বেেত্র বাঙালির ঐক্যকে আরো সুসংহত করবে।
আর অতীতের গ্লানি ভুলে, দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়ার আহ্বান এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অভয় দিয়েছেন, বর্ষবরণে জঙ্গি হামলার কোনো হুমকি নেই।
নববর্ষের দিন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশাবাদই সত্য হয়েছে। সারাদেশেই বর্ষবরণ হয়েছে সার্বজনীন উৎসবের আমেজে; শান্তিপূর্ণ উপায়ে।
বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনকে হারাম আখ্যায়িত করে এবারও তাতে অংশ না নিতে আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে ঈমান-আকিদাবিরোধী হিন্দুয়ানি শিরকি অপসংস্কৃতি দাবি করে তা বন্ধ করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে তারা।
নিরাপত্তার কথা বলে এবারও উন্মুক্ত স্থানে নববর্ষের সব আয়োজন সন্ধ্যার আগে শেষ করতে বলা হয়েছিল পুলিশের তরফ থেকে। তারপরও কোনো বিঘœ ছাড়াই রাজধানীসহ সারাদেশে উদযাপিত হয়েছে বর্ষবরণের বিভিন্ন অনুষ্ঠান।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গত বছরের মতো এবারও ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। সেখানে আগতরা বলেছেন, সংস্কৃতি হলো একটি জাতির পরিচয়। জঙ্গিবাদ, নারী নির্যাতন আর মাদকের ভয়াবহতায় সমাজে যখন মূল্যবোধের অবয় দেখা দেয়, তখন মানুষের মধ্যে এই সংস্কৃতিবোধের স্তুতি করবো আমরা। এই বৈশাখে শপথ নেবো অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ গড়ার।
রাজধানীতে নতুন সূর্যের সঙ্গে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা হয় ছায়ানটের গানে গানে। এই প্রভাতি আয়োজন এখন ৫ দশকের ঐতিহ্য। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা জানান, তাদের এবারের বর্ষবরণ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’। তিনি জানান, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সামাজিক বিকার রোধে মানুষের ভেতরে সুপ্ত আলোটাকে জাগিয়ে তুলতে পারে সংস্কৃতি। পাশবিক মনোবৃত্তির বিপরীতে মানবিক সংস্কৃতির জাগরণ আর তাতে তরুণ প্রজন্মের সংযোগ ঘটাতেই আমাদের এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রায় দেড় শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে দুই ঘণ্টার এ প্রভাতি আয়োজন শুরু হয় সকাল সোয়া ৬টায়, বাঁশিতে ভোরের রাগালাপে। পুরো অনুষ্ঠান সাজানো হয় ১৬টি একক গান, ১২টি সম্মেলক গান ও দুটি আবৃত্তিতে। সকাল সাড়ে ৮টায় ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুনের আবাহনী কথনে শেষ হয় অনুষ্ঠান। বটমূলের প্রভাতি আসর ভাঙতে ভাঙতেই চারুকলা অনুষদে শেষ হয়ে যায় মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। ঢাক-ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে; শোলার পাখি, টেপা পুতুল হাতে নিয়ে বৈশাখী সাজে সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের এই শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল হেরিটেজের অংশ।
এখন বিভিন্ন রাস্তায় মেট্রোরেলের কাজ হচ্ছে। এ কারণে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার চলার পথে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রাটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় পর্যন্ত যায়নি। চারুকলা থেকে বের হয়ে শাহবাগ চত্বর, শিশুপার্ক, টিএসসি হয়ে আবারও একই স্থানে এসে শেষ হয়।
শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন জানান, মানবিকতার বোধ, বিবেচনাবোধের চর্চার মধ্য দিয়ে আমরা যেন নিজেদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে আরও বেশি নিয়োজিত করতে পারি, সেই আহ্বানই রয়েছে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার পুরোভাগে ছিল মহিষ, পাখি ও ছানা, হাতি, মাছ ও বক, জাল ও জেলে, টেপা পুতুল, মা ও শিশু এবং গরুর ৮টি শিল্পকাঠামো। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো টেপা পুতুলের ছেলে ফর্ম নির্মাণ করেছেন শিল্পীরা। টেপা পুতুলকে বসানো হয়েছে একটি সাইকেলের ওপর। বরাবরের মতো বাংলার লোকজ ফর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো হয়েছে শোভাযাত্রার পরিকল্পনা। প্রতিটি প্রতীকেই ছিল বার্তা। মাতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতার বার্তা ছিল এসব কাঠামোতে। আর বরাবরের মতোই রাজা-রানী, ফুল ছিল সামনের দিকে।
বাংলা নববর্ষ বরণে রাজধানীর পাশাপাশি সব বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও উপজেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্থানীয় প্রশাসন। সারাদেশে হয় গ্রামীণ মেলা। এই মেলা আয়োজনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় জেলাওয়ারি বরাদ্দ দেয়।

বৈশাখী ভোরে রমনা বটমূলে
যে মাটি দিয়েছে আশ্রয়, তার গভীরে শিকড় ছড়িয়ে, আবহমান বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির সুর কণ্ঠে নিয়ে বিশ্বায়নের ঐকতানে শামিল হওয়ার প্রত্যয় এসেছে রমনা বটমূলের বৈশাখী বার্তায়। নারী-পুরুষের রঙিন সাজে, শিশুর মুখের হাসি আর বর্ণিল পোশাকে তাই বৈশাখী রঙ। নানা আয়োজনে, নানা আঙ্গিকে সারাদেশে সুসম্পন্ন হয়েছে বাঙালির সার্বজনীন বর্ষবরণ উৎসব। সূর্যোদয়ের সঙ্গে বাঁশিতে ‘রাগ আহীর ভাঁয়রো’ পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজন। একক ও সম্মেলক কণ্ঠে সংগীত পরিবেশনা আর কবিতার পঙক্তিমালায় ছায়ানটের শিল্পীরা স্বাগত জানান পহেলা বৈশাখকে।

পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় জাগরণ গড়ে তুলতে ষাটের দশকে যে সংস্কৃতিকর্মীরা সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট গড়ে তুলেছিলেন তাদেরই একজন সনজীদা খাতুন। ছায়ানটের উদ্যোগেই ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে হয় প্রথম বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। তার বিশ্বাস, অশুভ কালো অপশক্তির বিপরীতে আপন মাটির রস-সম্পদ আর বিশ্ব মানসের সহজ যোগ বয়ে আনবে কল্যাণ।
সনজীদা খাতুন বলেন, বিশ্বায়ন আজ আমাদের কাছে বাস্তব সত্য। এ শব্দ নিন্দা অর্থে উচ্চারণ করছি না। বিশ্বের সংগীতে-সাহিত্যে, শিল্পকলায়-দর্শনে-বিজ্ঞানে যে মহান অর্জন তার স্বাদ নেব আমরা। আত্মস্থ করতে হবে সকল মানবিক অন্তরসম্পদ। সেই সত্য সুন্দর সমৃদ্ধ করবে আমাদের।
রমনা বটমূলের প্রভাতি আয়োজন শুরুর পর একক সংগীত পর্বে পরিবেশিত হয় ‘শুভ প্রভাতে পূর্ব গগনে’; ‘প্রথম আলোর চরণধ্বনি’; ‘জাগো অরুণ ভৈরব’; ‘প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে’; ‘তোমার হাতের রাখীখানি’। গানের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে ছায়ানটের শিশু ও বড়দের দলের সম্মেলক গানের পরিবেশনা। প্রভাতি আয়োজনের একেবারে শেষ অংশে ছোট ও বড়দের দল যৌথভাবে পরিবেশন করে ‘ওরে আইল বৈশাখ নয়া সাজে’ গানটি।
ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুনের কথন পর্বের পর রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংগীত পরিবেশনায় শেষ হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ আয়োজন।

৫৬ হাজার বর্গমাইলে
বর্ষবরণের আনন্দ
এবারের বর্ষবরণে রাজধানীর পাশাপাশি ৫৬ হাজার বর্গমাইলে ছড়িয়ে পড়ে বর্ষবরণের আনন্দ। তবে প্রধান প্রধান আয়োজনগুলো ছিল রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। তাই পহেলা বৈশাখে খুব চেনা শহর যথারীতি বদলে গিয়েছিল। ছোট-বড় সবাই ব্যস্ত হয়ে পথে নেমে এসেছিলেন। হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ। সবাই বাঙালি। তাদের উপস্থিতিতে ঢাকার বড় সড়কগুলো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। যেদিকে চোখ যায়, লাল-সাদা রঙ। বিশেষ করে লাল রঙ খুব চোখে পড়েছে। মেয়েদের শাড়িতে, জামায় ছিল উজ্জ্বল লাল। ছেলেরা বের হয়েছিল সাদা পাঞ্জাবি পরে। কারোর সাদা-লালের মিশেল। সুন্দর সেজে দীর্ঘপথ হেঁটে নগরবাসী যাচ্ছিলেন রমনার দিকে। তারপর শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর ও এর আশপাশের এলাকা। কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বিশাল রাস্তার দুই ধারে ছিল মানুষ আর মানুষ। ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সেখানকার মানুষ চারুকলার দিকে আসতে শুরু করে। বাকিরা তারও আগে থেকে সমবেত হচ্ছিল। কেউ দল বেঁধে; কারও সঙ্গে স্ত্রী-সন্তান। বন্ধুরা, প্রেমিক-প্রেমিকারা ঘুরে বেড়িয়েছেন। পায়ে পা লাগছিল; গায়ে গা। তবে কেউ কারও যন্ত্রণার কারণ হননি; বরং সব ভুলে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল বাঙালি। মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষ হলেও এলাকাজুড়ে এর রেশ রয়ে গিয়েছিল।
তাই অনেক রাত পর্যন্ত মুখর ছিল গোটা এলাকা।
পহেলা বৈশাখ বরণ করতে আসা অনেক মানুষের হাতে ছিল বাঁশি। কারও হাতে একতারা। অনেকেই ঢোল বাজিয়ে বর্ষবরণের আনন্দ প্রকাশ করেছে। নাচছিল কেউ কেউ। রাস্তাজুড়ে বসেছিল বৈশাখী মেলা। একই রকম দৃশ্য চোখে পড়েছে ঢাকা শহরের অন্য সব রাস্তা, পার্ক, উদ্যানে। সব মিলিয়ে অন্যরকম একটি দিন।
এই আনন্দ, এই হাসিরাশি বাঙালির সব ঘরে পৌঁছে যাক। অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক। এমন সুন্দর বেঁচে থাকার বাংলাদেশ হোক; এগিয়ে যাক – দিনভর শোনা গেছে এমন প্রত্যাশা।
এবারের পহেলা বৈশাখের সকাল ছিল বৃষ্টিবিহীন। দুপুরে ছিল তাপদাহ। তারপরও রাজধানীর যে জায়গাটিতে একটু ছায়া আছে, সেখানেই বসে গেছে গানের মেলা; প্রাণের মেলা। সাংস্কৃতিক, সামাজিক, নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই ছোট-বড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে বরণ করে নিয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে হলেও এই আয়োজনের ল্য সবারই এক। সবাই চায় একটি শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ।
রাজধানীতে ভোরের আলো ফুটতেই বর্ষবরণ উৎসবে মেতে ওঠে মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটসহ সারাদেশে উৎসবমুখর আমেজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপিত হয়। উল্লেখ্য, প্রতিবারের মতো বৈশাখ উৎসবে অংশ নিতে এবারও আসেন অনেক বিদেশি। তারাও উপভোগ করেন বাঙালির প্রাণের উৎসব।