প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং : পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ঢাকা-থিম্পু ঐকমত্য

এম নিজাম উদ্দিন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং গত ১২ এপ্রিল ঢাকায় আসেন এবং ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে ১৫ এপ্রিল ঢাকা ত্যাগ করেন। ডা. লোটে শেরিং-এর ঢাকা অবস্থানকালে দুদেশের আলোচনায় বাংলাদেশ ও ভুটান পারস্পরিক স্বার্থে বেশকিছু পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে একমত হয়েছে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিংয়ের ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিনে দুই দেশের মধ্যে ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আলোচনায় বাংলাদেশের বাজারে তাদের ১৬টি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার চেয়েছে ভুটান, আর ভুটানের বাজারে ১০টি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার চেয়েছে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিপাকি বৈঠকে বাংলাদেশের পে এবং সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং ভুটানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বাজারে ভুটানের ১৬টি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন।
জানা যায়, দ্বিপাকি আলোচনাটি খুবই ইতিবাচক হয়েছে এবং আলোচ্য বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এগুলো কার্যকর হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুটান সফরের সময়ও এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশের ১০টি পণ্যের কোটা ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। দু’দেশই এটি কার্যকরের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে এখন এটি বাস্তবায়ন পর্যায়ে কাজ করতে হবে।
ট্রানজিটের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই অঞ্চলে বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিষয়টি একটি বড় উদ্যোগ। যদিও সকল দেশই চুক্তিতে স্বার করেছে তথাপি ভুটানের সংসদে এটি অনুসমর্থিত হয়নি।
ভুটানের নতুন সরকার বলেছে এই উদ্যোগ সংক্রান্ত বিলটি তাদের সিনেটের উচ্চকে আলোচনার জন্য পুনরুত্থাপিত হবে এবং তারা এটি পাসের বিষয়ে আশাবাদী। ভুটানের সংসদে বিলটি অনুমোদিত হলে আলোচ্য ৪টি দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরো শক্তিশালী হবে বলে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং উল্লেখ করেন।
বৈঠকের পর স্বাস্থ্য, কৃষি, জাহাজ শিল্প, পর্যটন এবং জনপ্রশাসন প্রশিণ বিষয়ে দ্বিপাকি সহযোগিতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ৫টি সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা-থিম্পু সম্পর্ক গভীর ও ঐতিহাসিক। কেননা ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভুটানই সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। যেকোনো সম্পর্কের থেকে এই সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর এবং বছর বছর এই বন্ধন আরো গভীর, সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুটান সফরের পর দুদেশের ব্যবসার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তখন থেকেই পর্যটন খাতে দুদেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরো বেড়েছে।
বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ভুটানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সেই বিদ্যুৎ বাংলাদেশে বাজারজাতকরণের বিষয়ে আগে থেকেই আলোচনা চলছিল। বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশ এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগেও আগ্রহী।
ভুটানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশে বাজারজাত শুরু হলে এই তিন দেশের মধ্যে ত্রিপীয় সহযোগিতার সৃষ্টি হবে বলে বৈঠকে আশা প্রকাশ করা হয়।
ভুটান তাদের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসক নেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবেও এই বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। কেননা স্বাস্থ্য খাতে দুদেশের সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং কলেজে ভুটানের শিার্থী কোটা ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেরও ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ সুন্দর দেশ। বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থাও চমৎকার।
এ সময় লোটে শেরিং জানান, তিনি নিজে একজন চিকিৎসক এবং বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করেছেন।
লোটে শেরিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের অটিজম খাতে ব্যাপক অবদানেরও প্রশংসা করেন।

বাংলাদেশ-ভুটান বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে আগ্রহী ডা. লোটে শেরিং
বাংলাদেশ ও ভুটান দ্বিপীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে আগ্রহী। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং ১৩ এপ্রিল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাাৎকালে দুদেশের প থেকে এ আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. শেরিংকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ভুটানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বিপীয় সম্পর্ককে বাংলাদেশ সবসময় গুরুত্ব দেয়।
রাষ্ট্রপতি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভুটানের সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাই বাংলাদেশ সবসময় ভুটানকে বিশেষ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। কেননা বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশ ভুটান। তাছাড়া প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভুটানের সাথে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে অত্যন্ত চমৎকার উল্লেখ করে বলেন, দুদেশের মধ্যকার বহুমুখী বাণিজ্য সম্পর্ক দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দু’দেশের মধ্যে স্বারিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়িত হলে আগামী দিনগুলোতে বর্তমান সম্পর্ক আরো উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে যাবে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের অধীনে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রশংসা করে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সম হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজে তার দেশের শিার্থীদের লেখাপড়া করার সুযোগ পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত তার বৈঠকের কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই বৈঠকে বিভিন্ন দ্বিপীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বৈঠকের ফলাফল ভবিষ্যতে একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এক নৈশভোজের আয়োজন করেন। নৈশভোজে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেওনপো তানদি দর্জি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী লেওনপো দেচেন ওয়াংমো, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনাম টবদেন র‌্যাবগে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক, ভুটানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জিষ্ণু রায় চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
রাষ্ট্রীয় ভোজসভা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিংয়ের সম্মানে এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করেন।
১৩ এপ্রিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের গ্র্যান্ড বলরুমে এ ভোজসভার আয়োজন করা হয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, সংসদ সদস্য, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং উচ্চ পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা ভোজসভায় উপস্থিত ছিলেন।

বিভিন্ন খাতে ঢাকা-থিম্পু
৫টি চুক্তি স্বার
স্বাস্থ্য, কৃষি, জাহাজ চলাচল, পর্যটন ও জনপ্রশাসন প্রশিণ বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারে ঢাকা ও থিম্পু ৫টি চুক্তিতে স্বার করেছে। ১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পরে এই ৫টি চুক্তি স্বারিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং চুক্তি স্বারের সময় উপস্থিত ছিলেন।
দ্বিপীয় বাণিজ্যে পরিবহন এবং ট্রানজিট কার্গো চলাচলে অভ্যন্তরীণ জলপথ ব্যবহারের বিষয়ে দি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সমঝোতা চুক্তি স্বার হয়েছে। নৌ পরিবহন সচিব আবদুস সামাদ এবং ভুটানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব দাশো ইয়েসি ভাংদি এই চুক্তিতে স্বার করেন।
বাংলাদেশের স¦াস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ভুটান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা চুক্তিতে (এমওইউ) স্বার করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম এবং ভুটানের স্বাস্থ্যসচিব উগানদা দফু।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং ভুটানের কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিভাগের মধ্যে সমঝোতা চুক্তিতে স্বার করেন বিএআরসির নির্বাহী পরিচালক কবির ইকরামুল হক ও ঢাকায় ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনম তোপদেন রাবগি।
বাংলাদেশ জনপ্রশাসন প্রশিণ কেন্দ্র এবং ভুটানের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বার করেন বিপিএটিসির রেক্টর ড. এম আসলাম আলম এবং ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনম তোপদেন রাবগি।
দুদেশের মধ্যে পর্যটন খাতে সহযোগিতা বিষয়ে ভুটানের পর্যটন কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বার করে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান খান কবির এবং ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনম তোপদেন রাবগি নিজ নিজ রাষ্ট্রের পে সমঝোতা চুক্তিতে স্বার করেন।