রাজনীতি

নানামুখী সংকটে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বিএনপি

হাফিজ আহমেদ
২০০৭-০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে বেকায়দায় রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। নেতৃত্বসংকট, দলীয় কোন্দল ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন সময়ে নানামুখী প্রচেষ্টা চালিয়েও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দলটি। বরং একের পর এক সংকটে অস্তিত্ব রক্ষাই দূরূহ হয়ে পড়েছে বিএনপির। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও দলের শীর্ষ নেতাদের মতানৈক্যের কারণে মাঠের রাজনীতিতে ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে দলটি।
১/১১-পরবর্তী ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অল্পসংখ্যক আসন নিয়ে সংসদের বিরোধী দলের আসনে থাকলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিএনপি জাতীয় সংসদ এমনকি জাতীয় রাজনীতি থেকে ক্রমেই ছিটকে পড়ে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে মাত্র ৬টি আসন পেয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। এর মাধ্যমে অল্প হলেও জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার যে সুযোগ ছিল Ñ তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে সে সুযোগও হাতছাড়া হতে যাচ্ছে বিএনপির। নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে বিএনপির নির্বাচিত ৬ এমপি শপথ গ্রহণ না করলে তাদের আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচন দেয়া হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে থাকার সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যাবে বিএনপির।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কোনো চেষ্টাই করছে না দলটি। এ নিয়ে দলের ত্যাগী ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের ওপর চরম ুব্ধ। এরই অংশ হিসেবে তৃণমূলের অনেকেই উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ত্যাগের সুযোগ খুঁজছেন। কেউ কেউ ক্ষমতাসীন দলে ভিড়েও গেছেন। হু কেয়ার্স তারেক রহমান বলে স্বতন্ত্র সেজে অনেকে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন দূরে থাক, রুটিন কর্মসূচিও ঠিকমতো পালন করতে পারছে না বিএনপি। আর যাও কিছু ছোটখাট কর্মসূচি পালন করা হয় তাতেও দলীয় নেতাকর্মীদের তেমন উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না। দলের এ পরিস্থিতির জন্য তৃণমূল নেতারা তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে ৩ বছর পর বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্তের কারণে ১৯ মার্চের মধ্যে তা করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য দলের তৃণমূল নেতারা চরম ুব্ধ। এছাড়া উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তকেও বেঠিক বলে মনে করছেন দলের তৃণমূল অনেক নেতা। আর দলীয় হাইকমান্ড তৃণমূল নেতাদের এমন মনোভাব জানতে পেরে যারা উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এমন প্রায় ২০০ জনকে ইতোমধ্যেই বহিষ্কার করেছে।
সম্প্রতি বিএনপির সিনিয়র নেতাদের এক বৈঠকে মাঠের রাজনীতি সক্রিয় করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ সময় কয়েকজন সিনিয়র নেতা হতাশা ব্যক্ত করে বক্তব্য রাখেন। কেউ কেউ বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তারেক রহমান দলকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পেরেছেন কি না তা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। আর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির নেতারাও কে কী করছেন তার হিসাবও মিলিয়ে দেখতে হবে।
সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব ত্যাগী নেতাকে মনোনয়ন বঞ্চিত করা হয়েছে তারা এখন দলে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। কেন্দ্র থেকে বার বার তাগিদ দিয়েও তাদের দলমুখী করা যাচ্ছে না। কেউ কেউ দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন অথবা রাজনীতি থেকে অবসরের চিন্তায় আছেন। আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে অন্য দলে যোগদান না করলেও ক্ষমতাসীন দলের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে ব্যবসাবাণিজ্য করে ভালো থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা মনোনয়ন পেয়েও শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেছেন তারাও হতাশ। তাদের মতে, দলীয় হাইকমান্ডের ভুল কৌশলের কারণে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের ২০০ নেতাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরা নিজ নিজ এলাকায় জনপ্রিয় হওয়ায় তাদের সঙ্গে আরও অনেক নেতাকর্মী দলীয় কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, সারাদেশে কর্মসূচি পালন করে মাঠের রাজনীতিতে দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার পাশাপাশি সর্বস্তরে দলের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তারেক রহমানের অনীহার কারণে থমকে আছে। এ কারণে নির্বাচনের পর দল গোছানোর কাজও থেমে গেছে।
সম্প্রতি বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজপথে ঘুরে দাঁড়াতে দ্রুত বিএনপির পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন দরকার বলে মন্তব্য করেন। তাদের এ বক্তব্যের পর পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হলেও কিছুদিন পরেই তা থেমে যায়। এর ফলে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের কথা থাকলেও এখন সে পথে যেতে সাহস পাচ্ছে না বিএনপি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি ছাড়াও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি দিতে না পারায় সারাদেশে সর্বস্তরের বিএনপি নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ে। আর হাঁকডাক দিয়েও রাজপথে কোনো কর্মসূচি না থাকায় বিএনপির রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ কমে যায়। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে দলবিমুখ হয়ে পড়ে। এ অবস্থার অবসানে নতুন উদ্যমে সর্বস্তরে দলকে চাঙা করতে জনসংযোগ কর্মসূচিও শুরু করতে পারছে না বিএনপি।
অন্যদিকে নির্বাচনের আগে কিছুটা সমন্বয় থাকলেও ঢাকায় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের কাজের সমন্বয়হীনতা ক্রমেই বাড়ছে। সমন্বয়হীনতার এই সংকটই সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমেই পিছিয়ে দিচ্ছে বিএনপিকে।