রাজনীতি

নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে আবার টালমাটাল জাপা

বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলে এরশাদের জাতীয় পার্টি অনেকটা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে আনপ্রেডিক্টেবল চরিত্রের অধিকারী এরশাদের মনমেজাজ বুঝা বেশ মুশকিল। কখন তিনি কী করে বসেন তা অতি সহজে বুঝে উঠা অতি বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের জন্যও বেশ কঠিন বলে মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইদানীং আবার নাড়াচাড়া দিয়েছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। জাপার অভ্যন্তরেই পদপদবি নিয়ে এবারকার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলীয় গ্রুপিং-কোন্দলে এ যাত্রায় জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে ২২ মার্চ টার্মিনেট করেছেন এরশাদ। এখানেই থেমে না থেকে ২২ ঘণ্টার ব্যবধানে সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতার পদ থেকেও কাদেরকে সরিয়ে দিয়েছেন জাপা চেয়ারম্যান। কাদেরের পদে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ।
এরশাদের এমন আনপ্রেডিক্টেবল আচরণে জাতীয় পার্টিতে জিএম কাদের হঠাৎ করেই হিরো থেকে জিরো হয়ে যান। এর বিপরীতে পার্টিতে জিরো হতে থাকা রওশন এরশাদ এক লহমায় হিরোইন হয়ে ওঠেন।
‘পার্টি পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ, পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়া, পার্টির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, তার নেতৃত্বে সংগঠন করতে পার্টির সিনিয়র নেতাদের অপারগতা প্রকাশ’ Ñ এমন অভিযোগে জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যানের পদ হারানোর পরদিন ২৩ মার্চ সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতার পদ থেকেও বাদ পড়েন জিএম কাদের।
জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ‘সাংগঠনিক নির্দেশ’ শিরোনামে নিজের স্বারিত আরেক চিঠিতে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে সরিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন স্ত্রী ও দশম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদকে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদপে নিতে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে চিঠি পাঠিয়েছেন। জাপার দফতর সম্পাদক এম এ রাজ্জাক স্পিকারের বাসভবনে গিয়ে এরশাদের চিঠি পৌঁছে দেন।
জানা গেছে, কো-চেয়ারম্যান পদ হারানোর পর ২২ মার্চ রাতে বড় ভাই এরশাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি জিএম কাদের। পরদিন ২৩ মার্চ সকালেই এরশাদের বারিধারার বাসায় ছুটে যান তিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা ড্রইং রুমে জিএম কাদের অপো করলেও শয়নক থেকে বের হননি এরশাদ। বাসার লোকজনের মাধ্যমে তিনি জিএম কাদেরকে বার্তা পাঠান এই বলে, ‘ওকে গিয়ে বলো আমি অসুস্থ, আজ আমার সাথে দেখা হবে না।’
সাাৎ না পেয়ে এরশাদের বাসা থেকে চলে যান জিএম কাদের।
জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধী দলের উপনেতার পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, এর নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ৩০ জানুয়ারি একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জিএম কাদেরের যোগাযোগের অভিযোগ ওঠে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনেরও পে ছিলেন তিনি। সর্বশেষ গত ১১ মার্চ সংসদ অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেয়া বক্তব্যে জিএম কাদের জাপাকে ‘আংশিক কৃত্রিম বিরোধী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
জাপা নেতারা জানান, গত ১ জানুয়ারি এরশাদ এক সাংগঠনিক নির্দেশে তার অবর্তমানে জিএম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। এমনকি চিকিৎসার জন্য বিদেশে থাকাবস্থায় জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন বলেও ঘোষণা দেন এরশাদ। এরপর গত ৪ জানুয়ারি জিএম কাদেরকে সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবেও মনোনয়ন দেন এরশাদ।
রওশন এরশাদ দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হলেও জিএম কাদের কিভাবে এরশাদের অনুপস্থিতিতে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন Ñ এ নিয়ে দলের ভেতরে তখনই কথা ওঠে। রওশন এরশাদ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হলেও তাকে ডিঙিয়ে কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করার কারণেও দলের সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের মধ্যে ােভ জন্মায়। যার কারণে জিএম কাদেরকে এসব দায়িত্ব দেয়ার পর দলের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন জ্যেষ্ঠ নেতারা। এমনকি সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারি এরশাদের ৯০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও যোগ দেননি দলের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা। এছাড়া এরশাদ যখন অসুস্থ তখন সংসদে সংরতি মহিলা আসনে জাপার মনোনয়ন দেয়াকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও ওঠে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে গিয়ে জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন এরশাদ। এনিয়ে রওশন বেঁকে বসলে আবার রংপুর গিয়েই এরশাদ ৩ মাস ১০ দিনের মাথায় ওই বছরের ২৭ মার্চ জিএম কাদেরের ওপরে পদ দিয়ে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন।
জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করার ৩ বছর ২ মাসের মাথায় এই পদ থেকে তাকে বাদ দিলেন এরশাদ। আর এ বছরের ৪ জানুয়ারি বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে মনোনয়নের মাত্র ২ মাস ১৯ দিনের মাথায় এ পদ থেকেও জিএম কাদেরকে সরিয়ে দিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, দলের মহাসচিব পদেও গত ৫ বছরে ৩ দফা পরিবর্তন এনেছেন এরশাদ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ৩ মাসের মাথায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল দলের দীর্ঘ ১৪ বছরের মহাসচিব ও ঘনিষ্ঠ সহচর এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব করেন এরশাদ। মাত্র পৌনে ২ বছরের মাথায় ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বাবলুকে বাদ দিয়ে ফের হাওলাদারকে মহাসচিব পদে বসান এরশাদ। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন আগে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর আবার হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়ে এরশাদ মহাসচিব করেন মসিউর রহমান রাঙ্গাকে।
এর আগে ২২ মার্চ রাত ১১টার দিকে পাঠানো এরশাদের সাংগঠনিক নির্দেশে বলা হয়, ‘আমি এর আগে ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, আমার অবর্তমানে পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের পার্টি পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন এবং আমি এটাও আশা করেছিলাম যে, পার্টির পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিল তাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবে। কিন্তু পার্টির বর্তমান সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমার সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করলাম। জিএম কাদের পার্টি পরিচালনা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমানে পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে এবং পার্টির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। পার্টির সিনিয়র নেতারাও তার নেতৃত্বে সংগঠন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।’
জিএম কাদেরকে সরিয়ে দেয়ার খবর শুনে তার অনুসারী কয়েক শ নেতাকর্মী বনানীতে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে বিােভ করেন। বিােভকারীদের কেউ কেউ তখন মন্তব্য করেন, এরশাদ ফের দালালদের খপ্পরে পড়েছেন।
জাতীয় পার্টিতে এ পরিবর্তন আকস্মিক হলেও রওশন ও জিএম কাদেরের বিরোধ বহু পুরনো। এর আগে জিএম কাদেরকে জাপার কো-চেয়ারম্যান করায় ুব্ধ হয়েছিলেন রওশন। পরে ১ সপ্তাহের মধ্যে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন এরশাদ।
জাপার ১ জন প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, দলের ১ জন সাবেক মহাসচিব ৪ দিন আগে এরশাদের বাসায় গিয়ে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে নালিশ করেন এবং এরশাদকে বলেন, জিএম কাদের এরশাদকে গালাগালি করেছেন। এতে জিএম কাদেরের ওপর েেপ যান এরশাদ।
ওই নেতা আরো জানান, রওশন দীর্ঘদিন বারিধারায় এরশাদের বাসায় না গেলেও গত সপ্তাহে শাদকে দেখার কথা বলে তিনবার সেখানে যান। জাতীয় পার্টির বিভিন্ন কর্মসূচিতে গরহাজির থাকলেও ২০ মার্চ এরশাদের ৯০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে হাজির হন রওশন ও তার অনুসারীরা। ফুলের তোড়া নিয়ে উপস্থিত হন রুহুল আমিন হাওলাদারও। ওই দিন থেকেই জাতীয় পার্টিতে পরিবর্তনের গুঞ্জন শুরু হয়।
তবে জাপার একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জিএম কাদেরকে সরিয়ে রওশনকে সামনে আনার েেত্র সরকারের একটি অংশের হাত রয়েছে। ওই নেতাদের মতে, জিএম কাদেরের চেয়ে রওশন এরশাদ মতাসীনদের বেশি আস্থাভাজন।
এ পরিবর্তনের বিষয়ে জিএম কাদের বলেন, ‘আমি বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছি না। আমি তো কোনো অপরাধ করিনি। কেন এমন হলো আমার কাছে রহস্যময় মনে হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পার্টির নেতা যা ভালো মনে করেছেন তিনি সেটা করেছেন। আমি কাজের লোক, কাজ করে যাব।’
জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘এটা দুই ভাইয়ের বিষয়। এ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।’
দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘এরশাদ সাহেব কেন এটা করেছেন তা তিনিই ভালো জানেন। তার কাছে জিজ্ঞেস করুন।’
তবে জিএম কাদেরের সমালোচনা করে কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘জিএম কাদের কোনো রাজনৈতিক লোক নন। পার্টির নেতা হওয়ার পর একদিনও দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি বসেননি।’
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২৩ মার্চ কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বারিধারায় এরশাদের বাসায় যান জিএম কাদের ও মসিউর রহমান রাঙ্গা। জিএম কাদের এরশাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে, এরশাদ দলীয় বিষয়ে কিছু না বলে পারিবারিক বিষয়ে আলোচনা করেন। ওই সময় রাঙ্গাও এ নিয়ে কোনো কথা তোলেননি।
এরপর জিএম কাদের ও রাঙ্গা বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই এরশাদের বাসায় যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি রওশন এরশাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ঘণ্টা দুয়েক এরশাদের বাসায় থেকে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বেরিয়ে যাওয়ার পরই এরশাদ চিঠিতে সই করেন। ওই চিঠিতে জিএম কাদেরকে সরিয়ে রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের উপনেতা মনোনীত করেন এরশাদ।
দলীয় সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রওশনপন্থি নেতাদের দলীয় কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়নি। গত মাসে কাকরাইলে দলীয় অফিসে বিগত সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া দলের প্রার্থীদের মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন জেলা থেকে আগত রওশনপন্থি নেতাদের তোপের মুখে পড়েন জিএম কাদের ও মসিউর রহমান রাঙ্গা।
ওই সূত্রের দাবি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন রওশন এরশাদ ও তার অনুসারীরা। সামনে চলে আসেন জিএম কাদের। তাকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করার পাশাপাশি পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান হিসেবেও ঘোষণা করেন এরশাদ। এতে ুব্ধ হন রওশন এরশাদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফকরুল ইমাম ও সুনীল শুভ রায়সহ তাদের অনুসারীরা। এছাড়া রুহুল আমিন হাওলাদারকে বাদ দিয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে জাপার মহাসচিব করা হলে ুব্ধ হাওলাদারও যোগ দেন রওশন এরশাদের সঙ্গে। তারা রওশনকে সামনে রেখে জিএম কাদের ও রাঙ্গাকে সরানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকেন।
এ পর্যায়ে জিএম কাদেরের বিষয়ে সফল হন তারা। তবে রাঙ্গা এখনো জাতীয় পার্টির মহাসচিব। যেকোনো সময় এ পদেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে। আবার রুহুল আমীন হাওলাদারই হতে পারেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব। সেক্ষেত্রে তখন বলা যাবে, এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে কাদের-রাঙ্গা আউট, রওশন-হাওলাদার ইন।