প্রতিবেদন

পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
পাহাড়, সমুদ্র আর সবুজে ঘেরা সোনার বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার যাবে হাইস্পিড ট্রেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি আরো বলেন, রেলপথের উন্নয়নে সরকার একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে।
এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, উন্নয়নের গতিপথে পতেঙ্গাকে টার্নিং পয়েন্ট বানাচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপ (চউক)। ফলে পতেঙ্গায় বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রবেশদ্বার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শেষ সীমা, পতেঙ্গায় বিশ্বপর্যটনের আদলে ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়েসহ রিংরোড প্রকল্প ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল লাইনসহ ৪ মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে।
এদিকে পতেঙ্গা টার্নিং পয়েন্টের নেপথ্যে রয়েছে পর্যটনের উদ্দেশ্যে যারা ভারতের দার্জিলিং, থাইল্যান্ডের পাতায়া আর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অহরহ যাতায়াত করছেন তাদের বিদেশ-বিমুখ করা। এেেত্র চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ও বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এ দুটি সৈকতকে পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রূপায়িত করতে সরকারের উন্নয়ন মহাযজ্ঞ চলমান রয়েছে। লালখান বাজার থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত, পতেঙ্গা টার্নিং পয়েন্ট থেকে আনোয়ারা টানেল আর আনোয়ারা থেকে পটিয়া হয়ে কক্সবাজারে চার লেনের রাস্তা। ২০২২ সালের মধ্যে পর্যটনে দেশ শতভাগ এগিয়ে যাবে বলে ধারণা চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের।
২০২২ সালে চট্টগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হবে পতেঙ্গা। এ টার্নিং পয়েন্ট গড়ে উঠার পেছনে রয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপরে (চউক) প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার দুটি ও বাংলাদেশ ব্রিজ অথরিটির (বিবিএ) প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্প।
বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী দেখা গেছে, প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ২৬৫ দশমিক ৯৭ মিটার। টানেলের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। টানেলের বাইরে পতেঙ্গা এলাকায় কাটা হবে ২০০ মিটার আর আনোয়ারায় কাটা হবে ১৯০ মিটার। কার্যপরিধি ২৫ মিটার। আনোয়ারা অংশে ফাইওভারের দৈর্ঘ্য ৬৩৭ মিটার। মোট ৫ বছর সময়ের মধ্যে মাত্র ১ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এই টানেলের নির্মাণকাজ শেষ হবে। ১২ মিটার বৃত্তাকার এই টানেল আচ্ছাদিত অংশ পতেঙ্গা অংশে ১৯৫ মিটার আর আনোয়ারা অংশে ২৩০ মিটার। ৪ লেন বিশিষ্ট অ্যাপ্রোচ সড়কের মধ্যে রয়েছে পতেঙ্গা অংশে ৫৫০ মিটার আর আনোয়ারা অংশে ৪ হাজার ৮০০ মিটার।
এই দুটি টিউব চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করবে। বঙ্গবন্ধু টানেলের অ্যালাইনমেন্ট হবে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট থেকে কর্ণফুলী নদীর দুই কিলোমিটার ভাটির দিকে। টানেলের প্রবেশপথ হবে নেভি কলেজের কাছে, বহির্গমন পথ হবে কর্ণফুলী নদীর দণি পাড়ের সিইউএফএল সার কারখানা সংলগ্ন ঘাট। প্রকল্প সাইটের উভয়দিকে বগুড়ার আরডিএ কর্তৃক ৪টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে প্রকল্পের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য। এছাড়াও পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উভয়দিকে ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। আবার পতেঙ্গা প্রান্তে ১৫ মেগাওয়াট স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এজন্য আনোয়ারা প্রান্তে বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ
করা হচ্ছে।
তাছাড়া টানেল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে চট্টগ্রামের চিত্র। গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক যোগাযোগ, আধুনিকায়ন হবে বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, সংযোগ স্থাপন হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে, যুক্ত করা হবে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউনটাউনকে, তরান্বিত হবে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ, বৃদ্ধি পাবে চট্টগ্রাম বন্দরের দতা ও সুযোগ-সুবিধা, গতি পাবে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ, নতুন যোগাযোগব্যবস্থা সৃষ্টি হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত হলো পৃথিবীর একমাত্র দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, যেমনটি পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সৈকতটিতে কাদার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তাই তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসৈকতের চেয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর রয়েছে অপার সম্ভাবনা। সমুদ্রসৈকতটিতে প্রচুর দেশি পর্যটক এলেও বিদেশি পর্যটকের আগমন আশানুরূপ নয়।
সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের পাড় বেঁধে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তুলছে। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারে ৩টি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার। প্রতি বছর এতে বাড়তি ২০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ৩টি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক (জালিয়ার দ্বীপ) ও সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এসব পর্যটন পার্কে প্রায় ৩০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। আর এসব অঞ্চলে গড়ে তোলা হবে ৫ ও ৩ তারকা মানের হোটেল, জিমনেসিয়াম, অ্যাপার্টমেন্ট, রিসোর্ট, বিনোদন পার্ক, লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট থিয়েটার ও মিউজিয়াম, মেগা শপিংমল, সিনেমা হল, বোলিং সেন্টার, ঘূর্ণায়মান রেস্টুরেন্ট, ওয়াটার স্পোর্টস বিচ, গলফ কাব, ক্যাবল কার, নদীভ্রমণ, মিউজিক্যাল ওয়াটার ফাউনটেইন, অফিস ভবন, পাওয়ার প্লান্ট ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যেই পর্যটন শিল্পে এর সুফল বাংলাদেশ পেতে শুরু করবে।