প্রতিবেদন

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : আলোচনার মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ আশাবাদী

বিশেষ প্রতিবেদক
গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ৪ এপ্রিল প্রথম প্রতিরা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন।
সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. শামসুল হক, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ এসময় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রতিরা সচিব আখতার হোসেন ভূঁইয়া, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এবং পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দও অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিরা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট সকলকে এই ব্যাপারে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় Ñ এই নীতিতেই তার সরকার বিশ্বাসী এবং সেই নীতিতেই সরকার পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এটাই বলবো মিয়ানমার যেহেতু আমাদের প্রতিবেশী, আমরা কখনও তাদের সঙ্গে সংঘাতে যাব না। বরং আলোচনার মাধ্যমে তাদের নাগরিকদের তারা যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই প্রচেষ্টাই আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আলোচনা করেছি, চুক্তি সম্পাদন করেছি এবং তাদের (মিয়ানমার) সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোটাই আমাদের ল্য। সেই ল্য নিয়ে আমরা এখনও কাজ করে যাচ্ছি।
প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ, যা-ই হোক না কেন, তাকে মোকাবিলার মতা বাংলাদেশ রাখে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়াটাও আজকে বিশ্বের অনেকের কাছেই বিস্ময়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মানবিক কারণেই এটা করেছি। নিজেদেরও বলতে গেলে রিফিউজি হিসেবে ’৭৫-এর পরে ৬ বছর বিদেশে অবস্থান করতে হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, নিজের নামটাও আমরা ব্যবহার করতে পারিনি। এরকম দিনও আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীরা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের নিজেদেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, ১৯৭১ সালে আমাদের ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ছিল। তাদেরকে নিয়ে এসে পুনর্বাসন করতে হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কারো সাথে যুদ্ধ করবো না, আমরা যুদ্ধ করতে চাই না, সবার সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর এদেশ সমগ্র বিশ্বে তার মর্যাদা হারিয়েছিল। আর ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আমাদের সরকার গঠনের পর সরকারের ল্য ছিল এই হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা।
প্রধানমন্ত্রী প্রতিরা মন্ত্রণালয়ে এসে স্মৃতিচারণ করে বলেন, এই জায়গাটা আমাদের অনেক স্মৃতিবিজড়িত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখানেই অফিস করেছেন। তখন এটাই ছিল তাঁর অফিস। আর আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হিসেবে এখন যেটা ব্যবহার করছি, সেটা ছিল পার্লামেন্ট হাউজ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক হচ্ছে তার প্রতিরা। একটা দেশকে কিভাবে বহিঃশত্র“র আক্রমণ থেকে রা করা যায়, আবার বিভিন্ন েেত্র অতি গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ও এখান থেকেই কার্যকর করা হয়। আমাদের দেশের আবহাওয়া জলবায়ু থেকে শুরু করে অনেক কাজই এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই সরকার গঠনের পর সবসময় এই মন্ত্রণালয়টি তিনি নিজের কাছেই রাখেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এর ফলে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীকে যেমন আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা যাচ্ছে, তেমনি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে কাজ করারও একটা সুযোগ আমাদের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এসময় ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে স্থলসীমানা চুক্তি এবং সমুদ্র সমস্যা সমাধানে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, জাতির পিতাই এর শুরুটা করে যান। ১৯৭৪ সালেই জাতির পিতা ভারতের সঙ্গে স্থলসীমানা চুক্তি করে সংসদে আইন পাস করে সংবিধান সংশোধন করে তা সন্নিবেশিত করে যান। আর বঙ্গবন্ধু সেই ১৯৭৪ সালেই সমুদ্র সীমানা আইন করে যান, যেখানে জাতিসংঘও এই আইন করেছে ১৯৮২ সালে। পৃথিবীর বহু দেশ পরবর্তীতে সমুদ্রসীমা নিয়ে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির দরকার হলে আমাদের আইনটাকেই ব্যবহার করতো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের সংবিধানে যেহেতু স্থল সীমানা আইনটি পাস হয়নি, তাই স্বাভাবিকভাবেই সেটা আর তখন কার্যকর হয়নি এবং আমাদের কোনো সরকারও ভারতের কাছে বিষয়টি তোলেনি। তবে ১৯৯৬ সালে সরকারে আসার পরই এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে সেটি আওয়ামী লীগ সরকার বাস্তবায়ন করে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা শান্তি চাই, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। কিন্তু কেউ যদি আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে তার যথাযথ জবাব যেন আমরা দিতে পারি এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যেন রা করতে
পারি সে প্রস্তুতিটা সবসময় আমাদের থাকতে হবে।
যুদ্ধের জন্য নয়, শান্তির জন্যও আমাদের প্রস্তুতি দরকার। আর সেখানেও অবশ্যই আমরা একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিটি েেত্র বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে যাতে চলতে পারি সে ব্যবস্থাও থাকা উচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন শান্তি রার জন্য আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শান্তিরা মিশনে যাচ্ছে, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও যাচ্ছে। পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম থেকে শুরু করে সর্বেেত্রই একটি পরিবর্তন এবং আধুনিকায়ন হচ্ছে, কাজেই আমাদের যারা সেখানে যাবে তারা সব বিষয়েই পারদর্শী হবে সেটাই আমরা চাই।
প্রধানমন্ত্রী যুগোপযোগী আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সেভাবে প্রশিণের ব্যবস্থা করা, সে ধরনের সরঞ্জামাদি জোগাড় করা এবং উপযুক্ত প্রশিণ দিয়ে তাদের গড়ে তোলা, কোথায় গিয়ে যেন আমাদের কাউকে কখনো ছোট মনে করতে না হয়, আমরা সেটাই চাই। এমনকি আমাদের পদবির বিষয়ে আধুনিকায়ন করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তার প্রথমবারের পেন্টাগন সফরের উল্লেখ করে বলেন, এই অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের সেনাবাহিনীর সকল পদকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জাতিসংঘে যাচ্ছি কাজেই পরিচয়ের েেত্র যেন সকলে সমান থাকতে পারি, যে যত ছোট বা বড় হোক না কেন। সেজন্য সমস্ত পদবিকে ঢেলে সাজানো হলো। মন্ত্রণালয়গুলোও যেন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হয় সে পদপেটাও আমরা নিয়েছি।
পরে প্রধানমন্ত্রী প্রতিরা মন্ত্রণালয়ে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী সেখানে রতি পরিদর্শক বইয়েও স্বার করেন।