প্রতিবেদন

প্রতি পরিবারে ১ জনের চাকরি নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
কর্মম বেকারদের কাজ দিতে প্রতিটি পরিবার থেকে ১ জনকে চাকরি দেয়া হবে। এ ল্েয সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণায় চাকরি দেয়া এবং পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এই কর্মসূচি সফল করতে উপকারভোগীদের একটি স্বচ্ছ, পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। এই কর্মসূচির মূল ল্য হলো রূপকল্প-২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্য নিরসন ও বেকারত্ব দূর করে ব্যাপকভিত্তিতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
জানা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বর্তমান সরকারের ১৪৫টি কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ১ কোটি। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৬৪ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাজেটের ১৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিপুল পরিমাণ এই টাকা খাদ্য নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ উপকারভোগী অধিকাংশ পরিবারের মধ্যে কর্মম বেকার রয়েছেন। এসব বেকারকে চাকরি দিয়ে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসা গেলে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করে। দারিদ্র্য নিরসন ও এমডিজির ল্য অর্জনে এসব কর্মসূচি ব্যাপক সফলতা পেলে পরের বছরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের বাস্তবমুখী পদপে নিতে নির্দেশ দেন। সরকারের ধারাবাহিকতা থাকায় প্রতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে এ খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। গত ১০ বছর ধারাবাহিকভাবে এই কর্মসূচির আওতা ও পরিধি বাড়ানো হয়েছে। দারিদ্র্য নিরসনে ব্যাপক সফলতা পাওয়ায় বিশ্বে এখন উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ। সরকারের পরবর্তী ল্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান ও বেকারদের চাকরির সুযোগ তৈরি করে দেয়া। এতে দেশের বেকার মানুষের সংখা যেমন হ্রাস পাবে, ঠিক তেমনি চাকরি পাওয়া পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি বাজেট সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে এ প্রসঙ্গে জানান, দেশের প্রতিটি পরিবার থেকে একজনকে চাকরি দেয়া হবে। বর্তমান সরকারের ল্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সুসংহত ও আরও শক্তিশালী করা। এজন্য যেসব পরিবারে চাকরি করার মতো বেকার রয়েছে তাদের সরকারি কিংবা বেসরকারি খাতের যেকোনো প্রকল্পে সুবিধামতো চাকরি দেয়া হবে।
জানা গেছে, একটি স্বচ্ছ, পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর অনলাইন ডাটাবেজ তৈরিতে উপকারভোগীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনডিআই) ভেরিফিকেশনসাপেে প্রথমে একটি সুষ্ঠু তালিকা করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগীদের সহায়তা প্রদানে স্বচ্ছতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকারের ৩৫ মন্ত্রণালয় ও সংস্থার অধীনে বর্তমানে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অধিকাংশ প্রকল্পই সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু, খাদ্য, ত্রাণ ও দুর্যোগ, শিা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন উপকারভোগীদের এসব মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কাজে লাগানো হবে।
সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি, বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তবহির্ভূত কারণে অভাবগ্রস্ততার েেত্র সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার সংবিধান কর্তৃক মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিশ্রুত। কিন্তু নব্বই দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিগুলোর উদ্ভাবন ও বিকাশ হয়েছে কোনোরকম পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই Ñ কখনো খাদ্য সংকট, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে থাকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে। ওই সময়ে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় ধারণাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত হয় নতুন নতুন উদ্ভাবনী কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত হয় সরকারের প্রাধিকার তালিকায়। যাত্রা শুরু হয় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতার মতো যুগোপযোগী কর্মসূচির। কিন্তু একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুতে এসে বিভিন্ন গবেষণার ফল হতে দেখা যায়, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রভাব প্রত্যাশিত মানের চেয়ে কম। এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেল বহুসংখ্যক মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত ততোধিক কর্মসূচি নিয়ে এক জটিল সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে দেশে। বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্যবিনিময় ব্যবস্থা; বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় অধিক্রমণ (ওভারল্যাপ) বিদ্যমান। কিছু কিছু কর্মসূচির আকার এত ছোট ছিল যে ল্যভুক্ত জনগোষ্ঠীর ওপর এদের প্রভাব ছিল অতি সামান্য। শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থাপনা পদ্ধতি না থাকায় একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচি থেকে সুবিধা পেত; অনেক দরিদ্র ব্যক্তি পেত না কোনো ধরনেরই সুবিধা। ত্র“টি ছিল সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতিতেও।
২০১০ সালের খানা আয়ব্যয় জরিপ অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার আওতাভুক্ত ১৮ শতাংশ পরিবারই ছিল সচ্ছল শ্রেণিভুক্ত, অথচ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সকল ধরনের কর্মসূচির আওতার বাইরে। ০-৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ছিল না; অথচ এ বয়সের সঠিক পরিচর্যাই নিশ্চিত করে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ। এসব বিবেচনায় নিয়ে, দারিদ্র্য ও অসমতা হ্রাসের গতিকে বেগবান করার জন্য সরকারের সকল সামাজিক সুরামূলক কার্যক্রমের সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় প্রথমবারের মতো ২০১৫ সালে গৃহীত হয় জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র। এই কৌশলপত্রের আওতায়ই এখন প্রতি পরিবার থেকে একজনের চাকরির ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।