প্রতিবেদন

ফিরে দেখা ২০১৮: র‌্যাবের সাফল্য

কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিপিএম, এএফডব্লিউসি, পিএসসি
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে র‌্যাব। র‌্যাব কর্তৃক গৃহীত এরূপ বহুমুখী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। গত ১ বছরে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকব্যবসা ও অপহরণসহ নানাবিধ অপরাধ দমনে র‌্যাব ফোর্সেস সর্বমোট ২৩,৫০১ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে। এই সফলতা অর্জনে রয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যথাযথ দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিরবচ্ছিন্ন তত্ত্বাবধান, র‌্যাবের প্রতিটি সদস্যদের কঠোর পরিশ্রম এবং সর্বোপরি দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় গত এক বছরে র‌্যাবের সফলতা ছিল ঈর্ষণীয়, যা নিচে সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হলো:

জলদস্যুমুক্ত সুন্দরবন
নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদের প্রাচুর্যে ভরপুর বিশ্বের ‘ওয়ার্ল্ড হেরিট্যাজ’ খ্যাত বন সুন্দরবন। এক সময় এ অঞ্চলে বিভিন্ন জলদস্যু বাহিনী খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছিল। তৎপ্রেক্ষিতে সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন উপকূলবর্তী অঞ্চলকে বনদস্যু ও জলদস্যুমুক্ত করতে সরকারের নীতি ও কৌশলের আলোকে র‌্যাব সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে র‌্যাব মহাপরিচালককে প্রধান সমন্বয়কারী করে সুন্দরবনে জলদস্যু দমনে টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে গোড়াপত্তন ঘটে জলদস্যুমুক্তকরণ প্রক্রিয়ার। লিড এজেন্সি হিসেবে র‌্যাব ২০১২ সাল হতে সুন্দরবনে জোরালো অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হয় ২৬২ জন জলদস্যু, উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। গুলিবিনিময়ে নিহত হয় ১৩৫ জন দস্যু।
জলদস্যুদের অপরাধ জগৎ পরিত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগও সৃষ্টি করে দেয় সরকার। ২০১৬ সাল হতে অদ্যাবধি র‌্যাবের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২,৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের স্বাবলম্বী হতে প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেন। এছাড়াও র‌্যাবের পক্ষ থেকে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা, ১টি করে মোবাইল সেট ও অন্যান্য উপহারসামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। র‌্যাবের উদ্যোগে জলদস্যু ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরূপ সাফল্যে প্রধানমন্ত্রী গত ১ নভেম্বর ২০১৮ হতে সুন্দরবন অঞ্চলকে বনদস্যু বা জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন।
সুন্দরবন এখন দস্যুমুক্ত। এই অর্জন ছিল প্রধানমন্ত্রীর নীতি কৌশল, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারের ধারাবাহিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত ও প্রতিফলন।
এছাড়াও গত ২০ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে কক্সবাজারের মহেশখালী-কুতুবদিয়া উপকূলীয় অঞ্চলে ৬টি বাহিনীর ৪৩ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। তাদের কাছ থেকে ৯৪টি অস্ত্র এবং ৭,৬৩৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে র‌্যাব।
সুন্দরবনের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর দস্যুরাও আত্মসমর্পণ করতে শুরু করেছে। অচিরেই মহেশখালীসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সকল উপকূলীয় অঞ্চল দস্যুমুক্ত হবে।

মাদকবিরোধী অভিযান
প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে র‌্যাব ম্যানডেটের আলোকে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এ বছর মাদকবিরোধী অভিযান বিশেষ গুরুত্ব পায় ২০১৮ সালে বিগত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার মাধ্যমে। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শুরু হয় র‌্যাবের ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ নামের মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযাত্রা। সমগ্র দেশে জোরদার করা হয় মাদকবিরোধী অভিযান। ইয়াবার অনুপ্রবেশ রোধে ইয়াবার প্রবেশদ্বার টেকনাফে স্থাপন করা হয় র‌্যাবের কৌশলগত ৫টি বিশেষ ক্যাম্প, চেক পোস্ট এবং পরিচালিত হয় বিশেষ নৌ টহল। র‌্যাবের তীক্ষ্ম গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত ছিল মাদক ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য গতিবিধির ওপর। ফলে ইয়াবার রঙ, রুট পরিবর্তন ও পরিবহনের অভিনব অপকৌশলগুলো একে একে ধরা পড়ে র‌্যাবের হাতে। এছাড়া অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারে র‌্যাবের কার্যকরী ভূমিকা অব্যাহত ছিল। মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলাকালে গুলিবিনিময়ে ১০০ জন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। অভিযানে গুলিবিদ্ধ হন ৬ র‌্যাব সদস্য। অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের নিদর্শনস্বরূপ উক্ত ১৩ জন র‌্যাব সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী বিপিএম (সাহসিকতা) পদকে ভূষিত করেছেন।
মাদক নির্মূলে দেশব্যাপী একদিকে রোবাস্ট অপারেশন ও অন্যদিকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে র‌্যাব কার্যকরী উদ্যোগ অব্যাহত রাখে। মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়তে র‌্যাব কর্তৃক ক্রোড়পত্র প্রকাশ, লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ, সভা সেমিনার আয়োজন এবং প্রচার করা হয় মাদকবিরোধী টিভিসি। এভাবে একটি বহুমুখী কর্মপরিকল্পনার ফলে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মাদক কারবারি এবং উদ্ধার হয় প্রায় ৭৫,৭৯,২৮৫ পিস ইয়াবাসহ অন্যান্য বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য; যেমন হেরোইন ২২.৮৭৮ বোতল ও গাঁজা ৩,০১৫,৪০৭ কেজি, যার মূল্য প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।

জঙ্গি নির্মূলে র‌্যাবের সাফল্য
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে বাংলাদেশ জঙ্গি দমনে বিশ্বের বুকে রোল মডেল। একসময় ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে জঙ্গিবাদের মদদদাতা ও মদদপুষ্টরা দেশে অরাজকতা ও সহিংস নাশকতামূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে একটি অস্থিতিশীল ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা শুরু করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের নেটওয়ার্ক অকার্যকর করে দিয়েছে র‌্যাব। পূর্বের ন্যায় এ বছরও জঙ্গিদের প্রথম সারির নেতাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে দেয় র‌্যাব। এ বছর র‌্যাবের অন্যতম সাফল্য ছিল হলি আর্টিজান মামলার চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি জেএমবির শুরা সদস্য মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন খালিদ গ্রেপ্তারের ঘটনা। এই জঙ্গি নেতা হলি আর্টিজান হামলায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, অর্থ সহায়তা ছাড়াও হামলাকারী নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও সর্বোপরি পরিকল্পনার সাথে যুক্ত ছিল। এছাড়াও জঙ্গি নেতা শরিফুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হত্যার মামলার মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি। গত ৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের মিসরাইয়ে একটি জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানে ২ জঙ্গি নিহত হয় এবং উদ্ধার করা হয় একটি একে ২২ রাইফেলসহ অন্যান্য অস্ত্র ও গোলা-বারুদ। র‌্যাবের অভিযানে ধরা পড়ে জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের টার্গেট কিলিং মিশনের ৪ সক্রিয় সদস্য। ফলে ভেস্তে যায় একটি পত্রিকার সম্পাদকসহ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের হত্যা ও কারাগারে হামলা করে তাদের প্রধান নেতাকে মুক্ত করার পরিকল্পনা।
এভাবে র‌্যাবের সময়োচিত পদক্ষেপ ও তীক্ষè গোয়েন্দা নজরদারি অঙ্কুরেই নস্যাৎ করে দেয় জঙ্গি হামলা এবং হামলার সকল পরিকল্পনা।
এ বছরে সর্বমোট ১৯৯ জন জঙ্গি গ্রেপ্তারসহ উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সরঞ্জামাদি।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে র‌্যাবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তন্মধ্যে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং সাইবার অপরাধী গ্রেপ্তার ছিল অন্যতম। নির্বাচনকালীন র‌্যাবের রোবাস্ট পেট্রোলিং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া কালো টাকা ছড়িয়ে নির্বাচনকে প্রভাবান্বিত করার অপচেষ্টাও রুখে দেয় র‌্যাব। গত ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ র‌্যাবের অভিযানে রাজধানীর মতিঝিল থেকে ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা উদ্ধারসহ আটক করা হয় ২ অপরাধীকে। র‌্যাবের এ সাফল্য সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ
সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে র‌্যাব। র‌্যাবের নবগঠিত ‘র‌্যাব সাইবার মনিটরিং সেল’, অনলাইনে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধে ছিল তৎপর। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার ওয়েবসাইটের অনুকরণে ২২টির অধিক নকল ওয়েবসাইট তৈরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা এবং ছাত্রআন্দোলন ও কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানোর অপরাধে এক অভিনেত্রীসহ অনেক সাইবার অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ফলে নস্যাৎ হয় সকল চক্রান্ত।
গত ২০১৮ সালে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৬৩ জন সাইবার অপরাধী। জনস্বার্থে গুজব প্রতিরোধে ফেইসবুকে খোলা হয় ‘র‌্যাব সাইবার নিউজ ভেরিফিকেশন সেন্টার’ নামের পেইজ এবং নির্মাণ করা হয় ‘মিথ্যে রুখে সত্য জানো’ টিভিসি, যা সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার
জননিরাপত্তা নিশ্চিত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে সর্বদাই তৎপর ছিল র‌্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০১৮ সালে মহেশখালীর দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ২টি অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা থেকে ২০টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আটক করা হয় অস্ত্র তৈরির মূল কারিগরকে। এছাড়া ঢাকা, রংপুর, যশোর এবং খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান হতে এ বছর ৭৩৯টি দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধারসহ ৫৬০ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর ঘটনা
রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় ৩ বাসের চালক ও হেলপারসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ঢাকা সেনানিবাসে ইবিএল এটিএম বুথ নিরাপত্তাকর্মী হত্যামামলার মূল আসামি গ্রেপ্তার এবং বহুল আলোচিত শ্রীলংকার আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের বাংলাদেশি ৪ সদস্য গ্রেপ্তার ছিল অন্যতম। বছরজুড়ে আরও অর্ধশতাধিক চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি গ্রেপ্তারে তৎপর ছিল এই এলিট ফোর্স।

ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত প্রতারণা
সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত প্রতারণা একটি আলোচিত বিষয়। এক শ্রেণির অসাধু চক্র বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। ২০১৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ন্যায় এ বছরও এসএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নানাবিধ উদ্যোগের পাশাপাশি সাইবার পেট্রোলিং, আন্ডার কভার অপারেশন ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয় র‌্যাব। র‌্যাবের বহুমুখী কর্মপরিকল্পনায় এসএসসি পরীক্ষা অত্যন্ত নির্বিঘেœ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া এ বছরের গত তিন মাসে বিভিন্ন পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র প্রতারণার সাথে যুক্ত ৬৫ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে র‌্যাব।

শিশু ও নারীর অধিকার রক্ষা
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নারী ও শিশু অধিকার সমুন্নত রাখতে র‌্যাব কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধ ও যৌন হয়রানি রোধে কঠোর ভূমিকা পালন করে আসছে র‌্যাব। গত ১ বছরে এ ধরনের ৫৪ জন ঘৃণ্য অপরাধী গ্রেপ্তার হয় এবং অভিযানে নিহত হয় ৪ শিশু ধর্ষণকারী।

মানবপাচার প্রতিরোধ
লোভনীয় বেতনে চাকরির প্রলোভনে প্রবাসে কর্মসংস্থানের নামে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর মানবপাচারকারী চক্রের দ্বারা প্রতারিত ও নির্যাতনের শিকার হয়। প্রতারিত হয়ে অনেকেই গভীর সমুদ্রে বা বন-জঙ্গলে মানবেতর জীবনযাপন বা মৃত্যুবরণ করে। অনেকেই প্রতারিত হয়ে বিদেশে দীর্ঘদিন কারাভোগ করে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসেছে। গত ১ বছরে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয় ২৩ জন মানব পাচারকারী এবং একই সাথে ২০ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়।

ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারণা ও
অপহরণ ঘটনায় র‌্যাবের সাফল্য
প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে র‌্যাব ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণ সংক্রান্ত অপরাধ দমনের মাধ্যমে গণমানুষের আস্থার বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিগত ১ বছরে ডাকাতি, ছিনতাই, মলম ও অজ্ঞান পার্টি দমনে র‌্যাব বরাবরের মতোই তৎপর ছিল। এ বছর র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৬১ জন সংঘবদ্ধ ডাকাত, ছিনতাইকারী ও মলম পার্টির সদস্য। এছাড়াও ২০১৮ সালে ১৩৭ জন অপহৃতদের উদ্ধার এবং অপহরণের সাথে জড়িত ২২৬ জন গ্রেপ্তার ছিল র‌্যাবের অনন্য সাফল্য।

বিমান ছিনতাই চেষ্টা রোধ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে দেশের অভ্যন্তরে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় র‌্যাব সদা তৎপর। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে ঢাকা থেকে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা প্রতিহতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে র‌্যাব। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে বর্ণিত উড়োজাহাজটি জরুরি অবতরণের পর বিমানটির নিরাপত্তা বিধান করে এবং সেনা কমান্ডোদের সাথে র‌্যাব সদস্যগণ যৌথ অভিযানে অংশগ্রহণ করে পরবর্তীতে অভিযানে গুলিবিদ্ধ দুষ্কৃতকারীর শরীর হতে ঝুঁকিপূর্ণ বোমাসদৃশ বস্তু অপসারণ করে র‌্যাবের চৌকস সদস্যরা।
এছাড়াও ক্রিমিন্যাল ডাটাবেইজের সহায়তায় দুষ্কৃতকারীর সংগৃহীত ফিঙ্গার প্রিন্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটন করে র‌্যাব। র‌্যাবের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরিকৃত আরেকটি ডাটাবেইজ র‌্যাব প্রিজন ইনমেট ডাটাবেইজে কারাগারে অভ্যরীণ ৪,২৯,২২১ জন কয়েদির জন্য তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষিত রয়েছে। র‌্যাবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত উক্ত ডাটাবেইজ ২টি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা রেখে চলেছে।
অনিবন্ধিত সিম ও অবৈধ
ভিওআইপি বিরোধী অভিযান
অনিবন্ধিত সিমের অন্যতম গ্রহীতা হলো পেশাদার অপরাধীরা। এ লক্ষ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি অভিযানে একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের সেলস এক্সিকিউটিভসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া রাজধানীর ভাটারা, মোহাম্মদপুর ও চট্টগ্রাম হতে বিপুল পরিমাণ ভিওআইপি সরঞ্জামাদিসহ বেশ কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনা
প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও র‌্যাব কর্তৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনায় দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি হোটেল-রেস্টুরেন্টে অভিযান চালায় র‌্যাব। মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুখাদ্য প্রক্রিয়াজাত এবং অপরিশোধিত পানি বিক্রির দায়ে বেশ কয়েকটি কোম্পানিতে অভিযান চালায় র‌্যাব। এছাড়া পবিত্র রমজান মাসে মানসম্মত ইফতার কেনাবেচা তদারকিতে তৎপর ছিল র‌্যাবের মোবাইল কোর্ট। মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধেও সক্রিয় ছিল মোবাইল কোর্ট। গত ১ বছরে র‌্যাবের মোবাইল কোর্টের ২,৩৭৫টি অভিযানে ৮,৮৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- প্রদান এবং প্রায় ১২ কোটি টাকা অর্থদ- প্রদান করা হয়েছে।

অন্যান্য
শুধু অপরাধ দমন নয়, ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকে এই বাহিনী। ভিআইপিদের নিরাপত্তাসহ জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে র‌্যাবের কার্যক্রম বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

শেষ কথা
একটি স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে র‌্যাব জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারি নিদের্শনায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বহুমুখী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। র‌্যাব কর্তৃক গ্রহীত এরূপ বহুমুখী তাৎপর্যপূর্ণ কর্মকা-ের ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধিত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেখক: অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস.)
র‌্যাব ফোর্সেস