রাজনীতি

বিএনপি কি ক্রমেই মুসলিম লীগের পরিণতির দিকে এগোচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতোমধ্যে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে দলের ভেতরে-বাইরে। যদিও ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে বিএনপি খারাপ সময় পার করছে। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে বিশেষ করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির সময়টা খুবই খারাপ যাচ্ছে। দলের চেয়ারপারসনকে জেলে রেখে, এমনকি খালেদা জিয়া নিজে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না পাওয়ার পরও বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কেবল ৬টি আসন লাভ করে, যাকে স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয় বলছেন রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা। তাই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, বিএনপি কি মুসলিম লীগের পরিণতির দিকেই এগোচ্ছে!

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ ১ বছরের ওপরে দুর্নীতির দায়ে দেশে কারাদ- ভোগ করছেন। আবার দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান দুর্নীতির দায়ে আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ লন্ডনে অবস্থান করছেন। দেশে অবস্থানরত দলের অপরাপর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পরস্পরের প্রতি আস্থা নেই, কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। দলের এক নেতা অপর নেতাকে সরকারের দালাল মনে করেন। এমতাবস্থায়, চরম সিদ্ধান্তহীনতার মধ্য দিয়ে দল পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সময়োপযোগী কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া বা কর্মসূচি বাস্তবায়নে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে কোনোরূপ সক্রিয়তা নেই। ফলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের বয়স ১ বছর পেরিয়ে গেলেও নানা রোগ-শোকে আক্রান্ত ৭২-ঊর্ধ্ব সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী কবে জামিন পাবেন বা আদৌ পাবেন কি না, তা তার আইনজীবীরাও বলতে পারছেন না। তাকে কিভাবে জেল থেকে বের করা যায়, তা নিয়ে কোনো ভাবনাও নেই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। নেই রাজপথের কোনো কর্মসূচি। এর আগে কিছু মানববন্ধন ও ঘরোয়া কর্মসূচি দিয়েছিল দলটি। তাও এখন নেই। এতদিনেও রাজপথের শক্ত কোনো কর্মসূচিতে যায়নি বিএনপি।
খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে গিয়েছিল বিএনপি। নির্বাচনে যাওয়ার আগে খালেদার মুক্তি আন্দোলন নিয়ে বিএনপি যে অবস্থানে ছিল, নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভরাডুবির পর একই নিস্পৃহ অবস্থানে আছে দলের হাইকমান্ড। এসব নিয়ে ুব্ধ বিএনপির তৃণমূল। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা রাজপথের কঠোর কর্মসূচি চান। জাতীয় নির্বাচনে ভোটের অনিয়ম নিয়ে সাম্প্রতিক গণশুনানিতে তৃণমূল নেতারা এমন আভাস দেন।
তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য হলো, ৩০ ডিসেম্বরের একতরফা নির্বাচনে ফলবিপর্যয়ের পর বিএনপির হাইকমান্ডের উচিত ছিল, ৩১ ডিসেম্বর থেকেই এক দফা এক দাবিতে (খালেদা জিয়ার মুক্তি) চলে যাওয়া। কিন্তু তা হয়নি। নির্বাচনের পরও দুই মাস চলে গেছে। খালেদা জিয়া এখনও জেলেই আছেন। বিএনপি হাইকমান্ডের কোনো কর্মসূচি তো নেই-ই, দলে খালেদার মুক্তি বিষয়ে বিবৃতি দেয়ার নেতাও কমে গেছে। বিএনপি হাইকমান্ড যেন খালেদা জিয়ার নামটি উচ্চারণ করতেই দ্বিধা করছেন, পাছে সরকার তাদের ওপর না নাখোশ হয়ে যায়!
বিএনপি হাইকমান্ডের সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখে তৃণমূলের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দেশের রাজনীতিতে বিএনপি নামের দলটি আছে কি নেই? খালেদা জিয়া এখনো বিএনপি প্রধান কি না Ñ এ প্রশ্নও অনেকের। অনেক তৃণমূল নেতাই প্রশ্ন তোলেন, খালেদা জিয়াই যদি বিএনপির শীর্ষ ব্যক্তি হবেন, তাহলে তার মুক্তির বিষয়ে বিএনপি হাইকমান্ডের এত দ্বিধা কেন? নাকি হাইকমান্ডের কেউ কেউ খালেদা জিয়ার আসনে বসতে চান বলেই তার মুক্তির বিষয়ে এত নিস্পৃহতা?
হাইকমান্ডের নিস্পৃহতা টের পেয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি দিতে কেন্দ্রের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বিএনপির তৃণমূল। দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে এ দাবি জানিয়েছে। জবাবে কেন্দ্রীয় নেতারা এখনই কোনো কর্মসূচি না দিয়ে দল গোছানোর কথা বলেছেন।
বিএনপির তৃণমূল এটাকেও হাইকমান্ডের এক ধরনের অজুহাত বলে মন্তব্য করেছে। তাদের কথা হলো দল গোছানোর সঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের কী সম্পর্ক? দল গোছানো তো আর ১-২ দিনের প্রক্রিয়া না, এটি করতে ২-৩ বছরও লেগে যেতে পারে। তাই বলে কি খালেদা জিয়া জেলেই থাকবেন, তার মুক্তির জন্য কিছুই করবে না বিএনপি?
বিএনপির হাইকমান্ড এখন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে এগোচ্ছে। ফ্রন্ট নেতারা কী ধরনের কর্মসূচি দেন সেদিকে নজর বিএনপির হাইকমান্ডের। বিএনপির তৃণমূল সূত্রের দাবি, ঐক্যফ্রন্ট নেতারা কিছুতেই চাচ্ছেন না খালেদা জিয়া এখনই মুক্তি পান। কারণ কামাল-মান্না-রবরা ভালো করেই জানেন, খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ঐক্যফ্রন্ট বিলুপ্ত করে দেবেন। তাতে তাদের নেতাগিরি আর বজায় রাখা যাবে না। সেজন্য তারা চাচ্ছেন, বিএনপি অন্য কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, খালেদার মুক্তির বিষয়টি আপাতত তোলা থাকুক।
জানা গেছে, গণশুনানির পর নতুন কর্মসূচি হিসেবে ভোটবঞ্চিতদের স্বার সংগ্রহ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে গণশুনানি বা নাগরিক সংলাপের মতো কর্মসূচি নিয়ে বিএনপিকে এগোতে বলেছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা।
বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, দলীয়ভাবে আমরা কর্মসূচি পালন করলেও বৃহত্তর কর্মসূচির জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হচ্ছে। তৃণমূলের অনেক নেতা আন্দোলনের কথা বলছেন। হাইকমান্ড তাদের সঙ্গে একমত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেয়া হচ্ছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপি হাইকমান্ড এখন সবখানেই বলে বেড়াচ্ছেন, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায়’ খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিতে তারা সময় নিচ্ছেন। তৃণমূলের কথা হলো, খালেদা জিয়া ১ বছরের ওপরে জেলে আছেন, এর চেয়ে খারাপ পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? খালেদা জিয়া জেলে মারা গেলে তবেই কী তার মুক্তির বিষয়ে হাইকমান্ডের আন্দোলনের সময় হবে?
গত ২২ ফেব্র“য়ারি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী মিলনায়তনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানিতে নোয়াখালী-২ আসনের প্রার্থী জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, ‘আমার মাকে (খালেদা জিয়া) মুক্ত করার জন্য আপনারা কেন কর্মসূচি দিচ্ছেন না? কেন ৩১ তারিখ (গত ৩১ ডিসেম্বর) প্রোগ্রাম দেয়া হলো না? সমস্ত নেতাকর্মী উজ্জীবিত ছিল। আমি বিনয়ের সঙ্গে মহাসচিবকে বলতে চাই, আর সহ্য হচ্ছে না।’
কুমিল্লা থেকে নির্বাচন করা মনিরুল হক চৌধুরীও খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ জানান।
গত ২০ ফেব্র“য়ারি রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলে আয়োজিত আলোচনাসভায় স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বক্তব্য দিতে শুরু করলে দর্শক সারিতে বসা কর্মীরা বলে ওঠেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই।
মওদুদ ওই সময় বলেন, কী?
তখন কর্মীরা বলেন, কর্মসূচি নাই কেন? খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মাঠের কর্মসূচি কবে দেবেন? বিএনপির কমিটি ভেঙে দেয়ার দাবিতে তারা স্লোগান দিতে থাকেন।
পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য দেয়ার সময় দর্শক সারিতে থাকা নেতাকর্মীরা বলেন, খালেদা জিয়া জেলে আছে, মহাসচিব চুপ কেন?
জবাবে নেতাকর্মীদের সান্ত¡না দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আপনারা ব্যর্থ হয়েছেন, এটা মনে করছেন কেন? কর্মসূচি হবে, ধৈর্য ধরুন।
খালেদার মুক্তি বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্ভাবনা কম। তাই আমাদের রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। তবে কী ধরনের কর্মসূচি আসবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। দল পুনর্গঠন করে আন্দোলনে যেতে হবে।
জানা গেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে অনেকটা নীরব বিএনপির হাইকমান্ড। সবাই শুধু বক্তৃতা-বিবৃতিতে বেগম জিয়ার মুক্তি চাইছেন। বাস্তবে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা। এরই মধ্যে বিএনপি নেতারা নানা ইস্যুতে পরস্পরকে দোষারোপ করছেন। একজন আরেকজনকে বিএনপির শত্র“ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এক ধাপ এগিয়ে সরকারের দালাল বলেও আখ্যা দেয়া হচ্ছে। দল গোছানোর উদ্যোগও নেই। তবে অঙ্গসংগঠনের কমিটি করার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে ঘোষিত দুটি অঙ্গসংগঠন ও দুটি পেশাজীবী সংগঠনের কমিটি নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ােভ আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, অঙ্গসংগঠনের কমিটি আমরা পত্রিকায় দেখেছি। কখন কিভাবে কারা কমিটি দিচ্ছেন কিছুই জানি না।
তৃণমূলের এক অঙ্গসংগঠনের নেতা জানান, সম্প্রতি তাকে বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতা ঢাকায় ডেকেছিলেন। কেন ডাকা হয়েছে জানতে চাইলে বিএনপির ওই সিনিয়র নেতা তাকে বলেন, তোমাকে কমিটিতে রাখা হবে। তৃণমূল নেতার উত্তর ছিল, খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের কর্মসূচি দিন, তবেই ঢাকা যাব। খালেদা জিয়া যতদিন জেলে থাকবেন ততদিন আমি কোনো কমিটিতে পদ-পদবি চাই না। ম্যাডামের মুক্তির জন্য হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিন। এরপর কেন্দ্রীয় নেতা ফোন কেটে দেন।
জানা যায়, বিএনপির একটি অংশ ভিতরে ভিতরে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানবিহীন নেতৃত্ব চায়। আরেক অংশ জিয়া পরিবার থেকেই বিএনপির নেতৃত্ব চায়। এ নিয়েও দলের ভিতরে ঠা-া লড়াই চলছে। এদিকে দলের পুনর্গঠন চায় একটি অংশ। কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব চায়। কার্যত তারা মহাসচিব পরিবর্তন চায়। হাফ ডজন নেতাও ইতোমধ্যে মহাসচিব পদপ্রার্থী হিসেবে জানান দিচ্ছেন। অবশ্য বিএনপির বড় অংশই চান, খালেদা জিয়ার মুক্তির আগে দল পুনর্গঠন নয়।
জানা গেছে, কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বেশ কয়েকটি রোগে আক্রান্ত। সম্প্রতি সরকারগঠিত মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়াকে দেখতে গিয়েছিলেন। তারা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া রিউমেটিক আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, অস্ট্রিও-আর্থ্রাইটিস, টানেল সিনড্রোম, ফ্রোজেন শোল্ডার, লাম্বার স্টোনাইসিস, থাইটিকা, ক্রনিক হাইপো নিথ্রেমিয়া ও কিডনি রোগে ভুগছেন। কয়েকটি রোগ আগে থেকেই ছিল। এগুলোর উন্নতি হয়নি। তার নিয়মিত চিকিৎসা দরকার।
তবে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এখন ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের কথামতো চলছেন। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে এখনই কোনো কর্মসূচি দিতে না বলায় বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কর্মসূচি তো দূরের কথা, বিবৃতি দেয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন।
বিএনপির এ ধরনের নীরবতা দেখে দেশের অনেক মানুষ বলছে, বিএনপি বলতে আসলে দেশে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। যা আছে, তা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে বিলীন হয়ে গেছে। এই ঐক্যফ্রন্ট নেতারাই এখন বিএনপিকে পরিচালিত করছে এবং তারাই বিএনপিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম লীগের পরিণতির দিকে ঠেলে দেবে।