প্রতিবেদন

বিশ্ব ব্যাংকের মূল্যায়ন : বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত অগ্রসরমান ৫টি দেশের একটি বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত অগ্রসরমান ৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এ সকল দেশে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রপ্তানিমুখী শিল্পের ভূমিকা অন্যতম। তবে দেশগুলোতে এই প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ব ব্যাংক।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকাস্থ কার্যালয়ে ৪ এপ্রিল প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন আপডেট: সতর্ক পূর্বাভাস’ শীষর্ক বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ আপডেটে এ কথা বলা হয়।
আপডেটে বলা হয়েছে, উন্নয়ন টেকসই করতে আর্থিক খাত, অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও ব্যবসায়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর রবার্ট জে সাম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন পাওয়ার পয়েন্টে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
এতে চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হার ৭.৩ শতাংশের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২০ ও ২০২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হার যথাক্রমে ৭.৪ ও ৭.৩ শতাংশের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্ব ব্যাংকের এই পূর্বাভাস ইতঃপূর্বে দেয়া বাংলাদেশ সরকারের পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ সরকারের প থেকে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ শতাংশের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা বলা হয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ এই উন্নয়ন আপডেটে চলতি অর্থবছরে বিশ্বে সর্বোচ্চ জিডিপি ৮.৮ শতাংশ অর্জনের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আপডেটে বলা হয়েছে, ইথিওপিয়া ৮.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। এ ছাড়া রুয়ান্ডা ৭.৮ শতাংশ, ভুটান ৭.৬ শতাংশ, ভারত ৭.৫ শতাংশ এবং জিবুতি, ঘানা, আইভোরি কোস্ট ও বাংলাদেশ ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন আপডেট প্রকাশকালে বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর রবার্ট জে সাম বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব কি না Ñ এমন এক প্রশ্নের জবাবে রবার্ট জে সাম বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বে ৫টি দ্রুত অগ্রসরমান দেশের মধ্যে একটি। প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি অথবা ৮ শতাংশ যেটাই অর্জিত হোক না কেন, বার্তাটি হচ্ছে বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি হারে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এটি উচ্চ প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ যদি ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, তাহলে আমরা সকলেই বিশেষ করে বিশ্ব ব্যাংক সবচেয়ে বেশি খুশি হবে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে অথবা ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ করতে হলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, বিগত অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতে দুই ডিজিট বেড়েছে, তবে অন্যান্য খাতে রপ্তানি আয় কমেছে।
বিশ্ব ব্যাংক কান্ট্রি ডিরেক্টর বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন।
এদিকে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) প্রেসিডেন্ট বান্দার এম এইচ হাজ্জার বলেছেন, বাংলাদেশ একটি রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটির অর্থনীতি এক স্তর হতে উন্নততর আর এক স্তরে পৌঁছাচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন আরো বেশি বিদেশি বিনিয়োগ। বাংলাদেশের এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় আইএসডিবির জোরালো ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মরক্কোর মারাক্কাসে অনুষ্ঠিত আইএসডিবির ৪৪তম বার্ষিক সভায় যোগদান করে ৪ এপ্রিল আইএসডিবি প্রেসিডেন্ট বান্দার এম এইচ হাজ্জারের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় হাজ্জার এমন মন্তব্য করেন।
মরক্কো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ৫ থেকে ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ২ দিনব্যাপী এবারের বার্ষিক সভার প্রতিপাদ্য হচ্ছে ট্রান্সফর্মিং ইন এ ফাস্ট চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড: এ রোড টু এসডিজিস। সভায় ২০৩০ সালের মধ্যে আইএসডিবির সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যাতে টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রা অর্জন করতে পারে তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বৈঠকে আইএসডিবির প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের রেলওয়ে নেটওয়ার্কসহ আরো কয়েকটি ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব পরীাধীন আছে বলে জানিয়ে পরীা-নিরীা শেষে এ সকল প্রকল্পের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান।
আইএসডিবির বোর্ড অব গভর্নরস-এর সভায় এবং বিভিন্ন সেশনে আনুষ্ঠানিক যোগদানের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবারের বার্ষিক সভার চেয়ার ও মরক্কোর অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বেঞ্চাবোনের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের অর্থমন্ত্রী পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেন।
অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের বিগত ১০ বছরে দেশের সকল অর্থনৈতিক সূচকে উন্নয়নের বিষয়ে মরক্কোর অর্থমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকে টেকসই করার জন্যই সরকার এই শিল্পাঞ্চলগুলো গড়ে তুলছে। তিনি এসকল অঞ্চলে পিপিপি পদ্ধতিতে পোশাক শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগের জন্য মরক্কোর প্রতি আহ্বান জানান। একইসাথে বাংলাদেশের পণ্য মরক্কোর বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়েও অনুরোধ করেন।
মুস্তফা কামাল মরক্কোর অর্থমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে মোহাম্মদ বেঞ্চাবোন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার যে অবিশ্বাস্য সফলতা তা দেখার জন্য তিনি শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করবেন।
বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে বলে বাংলাদেশ ও মরক্কোর অর্থমন্ত্রীদ্বয় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।