আন্তর্জাতিক

ব্রেক্সিট ইস্যুভিত্তিক সংকটে আবর্তিত হচ্ছে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি

স্বদেশ খবর ডেস্ক
ইউরোপ মহাদেশের সবগুলো দেশ আপন-আপন স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রেখেও ‘একসাথে’ থাকার লক্ষ্যে চার দশক আগে গঠন করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সেই জোটে এখন আর থাকতে চাইছে না ব্রিটেনবাসীর একাংশ। কিন্তু ‘থাকবো না’ বললেই তো আর ছাড়া যায় না! ছাড়ারও কিছু নিয়মকানুন-প্রক্রিয়া আছে। ব্রিটেন এখন সেই নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়েছে। অচলাবস্থায় পড়া ব্রেক্সিট নিয়ে চরম রাজনৈতিক টানাপড়েন চলছে যুক্তরাজ্যে। পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে ভোটাভুটি চলেছে টানা ৩ দিন। এতে প্রতিবাদী বা সমর্থনকারীদের ভিড়ও বাড়ছে পার্লামেন্ট এলাকাতেই।
সমঝোতার ভিত্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বের হয়ে যেতে (ব্রেক্সিট) প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে’র আনা পরিমার্জিত চুক্তিটিও প্রত্যাখ্যান করেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। ব্রেক্সিট কার্যকরের মাত্র ১৫ দিন আগে এই পরিস্থিতি ব্রিটেনকে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই ফলের পর আবারও জানুয়ারি মাসের পরিস্থিতিতেই ফিরে গেছে ব্রিটেন। জানুয়ারির প্রথম ভোটের তুলনায় ব্যবধান কমলেও এবার ১৪৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন মে। ১৩ মার্চ এমপিদের চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট চাইছেন কি না সে ব্যাপারে ভোট দেয়ার কথা ছিল। এর আগেও তারা এ নিয়ে ভোট দিয়ে নেতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
সামনে থাকা পথগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ব্রেক্সিট কার্যকরের মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। সে েেত্র প্রধানমন্ত্রী মে’কে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ’র কাছে আবেদন জানাতে হবে। সেই আবেদন জানানো হবে কি না সে ব্যাপারে পার্লামেন্ট ভোট দেয় ১৪ মার্চ।
১২ মার্চ টেরেসা মে’র আনা প্রস্তাব আবারও ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নক হাউস অব কমনসে দেয়া এক ভাষণে তিনি মূলত এই সংকট নিয়েই কথা বলেন। তিনি বলেন, চুক্তি ছাড়াই ইইউ থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে ভোট দেয়া বা সময় বাড়ানো সমস্যার সমাধান নয়। সময় বাড়িয়ে আমরা কী করতে চাই সে ব্যাপারে প্রশ্ন করবে ইইউ। এ প্রশ্নের জবাব এই হাউসকেই খুঁজে বের করতে হবে।
ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া নিয়ে আইনের ধারার কথা উল্লেখ করে মে বলেন, হাউস কি ৫০ নম্বর ধারা বাতিল করতে চায়, নাকি আরেকটি গণভোটের দিকে এগোতে চায়? নাকি তারা একটি চুক্তি নিয়েই এগোতে চায়, কিন্তু বর্তমানেরটি নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। প্রশ্নগুলো খুবই অনাকাক্সিত, কিন্তু জবাবগুলো অবশ্যই খুঁজে পেতে হবে।
জানা গেছে, ব্রেক্সিট আগামী ২২ মে পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব পার্লামেন্টে তোলার কথা ভাবছিলেন কয়েকজন এমপি। ওই সময় ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইইউ চায়, তার আগেই ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হোক। তাতে পরবর্তী অনেক জটিলতাই এড়ানো সম্ভব হবে। ব্রিটিশ এমপিরা আগামী ২২ মের মধ্যে ২০২১ সাল পর্যন্ত চলতে কয়েকটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির বিষয়ে ইইউয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়।
ব্রেক্সিট নিয়ে এ অচলাবস্থার জন্য ইইউ সরাসরি ব্রিটিশ পার্লামেন্টকেই দোষারোপ করেছে। তারা মনে করে, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
ইইউয়ের ব্রেক্সিট বিষয়ক প্রধান আলোচক মাইকেল বার্নিয়ার স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন, ব্রেক্সিট বিষয়ে ব্রাসেলস এরই মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ব্রাসেলসের প থেকে এখন আর এ নিয়ে নতুন কিছু করার নেই। নতুন করে আলোচনা শুরুর কোনো ইচ্ছাও ব্রাসেলসের নেই। ব্রাসেলসকে এখন বিশৃঙ্খল ব্রেক্সিটের প্রস্তুতি নিতে হবে। এই অচলাবস্থার সংকট ব্রিটেনের। তাদেরই এই সংকটের সমাধান করতে হবে।
একই অবস্থানে ফ্রান্সও। তারা যত দ্রুত সম্ভব ব্রেক্সিট সম্পন্ন দেখতে চায়। তবে জার্মানির ইউরোপ বিষয়ক মন্ত্রী মাইকেল রথ বলেন, ব্রিটেনকে স্পষ্ট করে বলতে হবে তারা কী চায়।
আরেকটি প্রক্রিয়ায় এগোতে পারে ব্রিটেন। আগামী ২৩ থেকে ২৬ মে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ব্রিটেন সেই নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারে। যদি ইইউয়ের সম্মতি পাওয়া যায়, সে েেত্র তারা আরো ২১ মাস সময় পেতে পারে। তাহলে ব্রিটিশ এমপিদের পছন্দ অনুযায়ী বর্তমান ৫৮৫ পৃষ্ঠার ব্রেক্সিট চুক্তি বাতিল করে দিয়ে আবারও আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।
এর আগে বর্তমান চুক্তিটি নিয়ে গত ১৫ জানুয়ারি ভোট দেন ব্রিটিশ এমপিরা। সেবার লজ্জাজনকভাবে হেরে যান টেরেসা মে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিটও বাতিল করে দেয়।
ব্রিটেন এক্সিট নামটিকে সংেেপ ডাকা হচ্ছে ব্রেক্সিট নামে, যা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাবার প্রক্রিয়া।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশ একে অন্যের সাথে ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে পারে এবং সেখানে বসবাস বা কাজ করতে পারে।
৪০ বছরের বেশি সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার পর ২০১৬ সালের জুনে একটি গণভোট নিয়েছিল যুক্তরাজ্য, যেখানে ভোটাররা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পে ভোট দেন। কিন্তু সেই ভোটের ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেক্সিট হয়ে যায়নি। এই বিচ্ছেদ ঘটবে চলতি বছরের ২৯ মার্চ তারিখে।
ব্রেক্সিট নিয়ে ভোটাভুটির পর, প্রক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাজ্য আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এই আলোচনার বিষয়, কী শর্তে বিচ্ছেদ হবে। এটা হচ্ছে বেরিয়ে আসার সমঝোতা যেখানে নির্ধারণ করা হবে, যে কী কী শর্তে ব্রিটেন ব্রেক্সিট থেকে বেরিয়ে আসবে। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরে কী ঘটবে, তা আলোচ্য বিষয় নয়।