আন্তর্জাতিক

ভারতের লোকসভা নির্বাচন: প্রিয়াঙ্কা চমকে চ্যালেঞ্জে বিজেপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ এপ্রিল থেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ১৯ মে পর্যন্ত মোট ৭টি ধাপে সারা ভারতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় ৯০ কোটি ভোটার এবারের নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন।
১১ এপ্রিল প্রথম দফায় ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৯১টি লোকসভা আসনের ভোটাররা ভোট প্রদান করেছেন। ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর ২৩ মে ফলাফল প্রকাশিত হবে। সেদিনই চূড়ান্ত হবে যে আগামী ৫ বছরের জন্য কোন দল বা জোট দিল্লির মসনদে আসীন হয়ে ভারতের ১৩০ কোটিরও বেশি জনগণের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
ভারতে এবারের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ পার্টি (ইউপিএ)। এর বাইরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসসহ কিছু আঞ্চলিক দল মোদির বিরোধিতায় একাট্টা হয়েছে।
ভারতে মোট ২৯টি রাজ্য ও ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে। দেশটির ৫৪৩ আসনের লোকসভায় সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজন ২৭২ আসনে বিজয়। ভোটকেন্দ্র থাকবে ১০ লাখেরও বেশি। ১১ এপ্রিলের পর পরবর্তী দফাগুলোর ভোট অনুষ্ঠিত হবে ১৮, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এবং ৬, ১২ ও ১৯ মে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ২৮২টি আসন। আর বিজেপি জোট তথা এনডিএ সব মিলিয়ে পেয়েছিল ৩৩৪টি আসন। অপরপে শুধু কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৪টি আসন। আর কংগ্রেস জোট তথা ইউপিএ পেয়েছিল ৬০টি আসন।
ভারতের নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, উত্তরপ্রদেশে যে দল বিজয়ী হয় তারাই ভারতে সরকার গঠন করে। জাতীয় রাজনীতিতে এ রাজ্যটি যেমন বেশ প্রভাবশালী তেমনি আবার সামাজিকভাবেও সবচেয়ে বিভক্ত রাজ্য এটি। এখান থেকে ৮০ জন লোকসভা সদস্য যাবেন ভারতের পার্লামেন্টে। ২০১৪ সালে বিজেপি এখানে ৭১টি আসনে জয়ী হয়। তবে এ রাজ্যে এবার এক হয়েছেন দু’প্রতিদ্বন্দ্বী মায়াবতী ও অখিলেশ যাদব। তারা ৫০টির বেশি আসন পাওয়ার আশা করছেন; যার মাধ্যমে দিল্লি জয়ের পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বিজেপির জন্য।
অপরদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে সব কটি আসন পাওয়ার আশা করছে। তবে বিজেপিও এখানে ব্যাপক নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছে এবং আগের চেয়ে বেশি আসন পাওয়ার আশা করছে। ২০১৪ সালে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ৪২টির মধ্যে ২টি আসন পেয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৪, সিপিএম ২ ও কংগ্রেস ৪টি আসন।
এবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজ রাজ্য গুজরাটের কোনো আসন থেকে নির্বাচন না করে উত্তরপ্রদেশের বারানসী আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। আর রাহুল গান্ধী নির্বাচন করবেন দুটি আসন উত্তর প্রদেশের আমেথি ও কেরালার ওয়ানাদ থেকে।
এদিকে লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে জনমত সমীায় বলা হয়েছে, এনডিএ এবার পাবে ২৭৯ আসন। ২০১৪ সালে এনডিএ পেয়েছিল ৩৩৬ আসন। এবার এনডিএ’র আসন কমবে ৫৭টি। অপরদিকে ২০১৪ সালের তুলনায় এবার ইউপিএ’র আসন সংখ্যা বাড়ছে। এতে বলা হয়, ইউপিএ এবার পাবে ১৪৯টি আসন। ২০১৪ সালে ইউপিএ জোট পেয়েছিল ৬০টি আসন। এবার তারা ৮৯টি আসন বাড়াতে সম হবে। আর অন্যরাও ৩২টি আসন কম পাবে।
এই জনমত সমীা ঠিক হলে আভাস মিলছে যে, নরেন্দ্র মোদি ফের ফিরছেন মতায়। দিল্লির কুর্সিতে তিনি আবার বসছেন প্রাধান্য নিয়েই। একইসঙ্গে এবার প্রকৃত বিরোধী দল হয়ে ফিরছে কংগ্রেস। ইউপিএ জোট এবার ২০১৪ সালের তুলনায় অনেক ভালো ফল করতে চলেছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে অসুবিধায় থাকলেও নরেন্দ্র মোদিই এখন বিজেপির প্রধান ভোট সংগ্রাহক। তার সাথে রয়েছে দলের মধ্যে তার বিশ্বস্ত একটি অংশ, যেমন অমিত শাহ। বিরোধী পরেও তাই টার্গেট মোদি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই বিজেপি নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছিল। সেটিই ছিলো প্রথমবারের মতো বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া। এ বিশাল জয়ের কৃতিত্ব যায় মোদির ঘরে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদি সরকারের সময়ে এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত কিছুটা গতি হারিয়েছে। শস্যের দাম পড়ে যাওয়ার ঘটনা কৃষকদের দারুণ ুব্ধ করেছে। ২০১৬ সালের নোট নিষিদ্ধ করার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আর সার্ভিস ট্যাক্স ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ােভ তৈরি করেছে। ভাটা এসেছে রপ্তানি আয়েও। তাই বেড়েছে বেকারত্ব। ঋণের দায়ে কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ডুবতে বসেছে। অথচ ভারতের জিডিপি অন্তত ৭ শতাংশ হারে বাড়া প্রয়োজন।
তবে বলা হচ্ছে যে, ১৪ ফেব্র“য়ারি পুলওয়ামা ঘটনার পর ২৬ ফেব্র“য়ারি পাকিস্তানে বিমান হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে মোদি বহু ভোটারের মন জয় করে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তাছাড়া দেশের সাড়ে ৮ কোটি তরুণ ভোটারের সমর্থন লাভ করা তার ল্য।
অন্যদিকে এবার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে দলের হাত ধরে ভারতের স্বাধীনতা এসেছিল সেই ১৩৩ বছরের পুরনো রাজনৈতিক দল ও বহু বছর রাষ্ট্র শাসনকারী কংগ্রেস কি ফিরে আসতে পারবে মতায়? ২০১৪ সালের নির্বাচনে শোচনীয় হার মানতে হয় তাদের। সে নির্বাচনে মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছিল তারা। পরের ৪ বছরে অনেক রাজ্য নির্বাচনেও হেরেছে তারা।
তবে গত ডিসেম্বর থেকে দলটি শক্তি পুনরুদ্ধারের দিকে যেতে পেরেছে বলে মনে হয়েছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে উপর্যুপরি ব্যর্থতার পর সম্প্রতি কংগ্রেস ৩টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে জয় পেয়েছে। তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেছেন। যদিও তিনি এবার নির্বাচনে দাঁড়াননি, কিন্তু তার রাজনীতিতে আগমন অনেককেই উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ভোট টানতে প্রিয়াঙ্কা বেশি মনোযোগী হয়েছেন।
ভারতের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, প্রিয়াঙ্কা চমকে এবার বিজেপির পাশার দান উল্টে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।