আন্তর্জাতিক

ভারত-রাশিয়া নয়া অস্ত্রচুক্তিতে নাখোশ যুক্তরাষ্ট্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপো করে রাশিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের অস্ত্রচুক্তি সম্পন্ন করেছে নয়াদিল্লি। ৭ মার্চ ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বহুল আলোচিত এই চুক্তি স্বারিত হয়। চুক্তির আওতায় রাশিয়ার কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলার মূল্যের পরমাণুশক্তিচালিত ডুবোজাহাজ ইজারা নেবে ভারত।
এর আগে গত বছরের অক্টোবর মাসে মস্কোর সঙ্গে ৫৪০ কোটি ডলারের পেণাস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত অপর একটি চুক্তি করে দিল্লি।
সূত্র জানায়, রাশিয়ার কাছ থেকে আকুলা-ওয়ান ডুবোজাহাজ ইজারা নেয়া সংক্রান্ত একটি চুক্তি হয়েছে। চুক্তির আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে এই ডুবোজাহাজ প্রস্তুত হবে। বুঝে পাওয়ার পর থেকে ১০ বছর রাশিয়া এই ডুবোজাহাজের কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি এটি পরিচালনার জন্য প্রশিণ দেবে এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোগত সমস্যা দেখবে। ভারতের ডুবোজাহাজ আইএনএস চক্রের স্থলে আকুলা-ওয়ান কাজ করবে।
২০১২ সালের এপ্রিল মাস থেকে রাশিয়ার কাছ থেকে এই আকুলা শ্রেণির ডুবোজাহাজ ইজারা নিয়ে আসছে ভারত। ২০০৪ সালে দু’দেশের মধ্যে ৯০ কোটি ডলার মূল্যের এ সংক্রান্ত একটি গোপন চুক্তি হয়। ২০২৫ সাল পর্যন্ত আইএনএস চক্রের ইজারার মেয়াদ বাড়ানো হবে। আর নতুন চুক্তির আওতায় যে ডুবোজাহাজটি ভারত পাবে সেটি আইএনএস চক্রের চেয়ে বড় ও অধিক শক্তিশালী।
গত বছরের নভেম্বর মাসে ভারত তার নৌবহরে প্রথমবারের মতো পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ সংযোজনের ঘোষণা দেয়। ওই সময় পরমাণু শক্তিচালিত দূরপাল্লার পেণাস্ত্রবাহী ডুবোজাহাজ আইএনএস অরিহন্ত সফলভাবে টহল সম্পন্ন করে। এই চুক্তির ফলে ভারতের দীর্ঘপ্রতীতি সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলো বলে সমরবিশারদরা মনে করছেন। এখন দেশটি জল, স্থল ও আকাশপথে পরমাণু অস্ত্র দিয়ে অভিযান পরিচালনার সমতা অর্জন করল।
আন্তর্জাতিক চুক্তির ফলে আইএনএস চক্রকে দূরপাল্লার পরমাণু অস্ত্রবাহী পেণাস্ত্রে সজ্জিত করা যায়নি। তবে চুক্তির করা এই ডুবোজাহাজ শত্র“র যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসে সিদ্ধহস্ত। এটি একই সঙ্গে গোয়েন্দাগিরি, নজরদারি ও শত্র“পরে অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে।
আইএনএস চক্র ভারতের প্রচলিত ডুবোজাহাজের বহরে যুক্ত হবে। বর্তমানে ভারতের প্রচলিত সাবমেরিন বহরে ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত ১৩টি জাহাজ রয়েছে। ওই বহরে আইএনএস চক্র যুক্ত হওয়ার পর মোট ১৪টি জাহাজ হবে। এর মধ্যে ১৩টি পুরাতন ও একটি নতুন। পাশাপাশি ভারতের ডকে আরও ৬টি ডুবোজাহাজ নির্মিত হচ্ছে। ভারতের অন্তত ১৮টি প্রচলিত ডুবোজাহাজ দরকার। এর মধ্যে অন্তত ৬টি এসএসএন ও ৪টি এসএসবিএন মানের।
৮ হাজার টনের বেশি ওজনের আইএনএস চক্র সাবমেরিনটি একটি প্রশিণ প্লাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ কয়েক মাস পানির নিচে থাকতে পারে। তবে ক’মাস থাকবে তা নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সমতার ওপর নির্ভর করে। অপরদিকে প্রচলিত সাবমেরিনগুলোকে অবশ্যই ক’দিন পর পর অক্সিজেন ও ব্যাটারিগুলোকে পুনরায় চার্জ দেয়ার জন্য উপরে উঠে আসতে হয়।
এদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অস্ত্র কেনার এই নতুন চুক্তির ফলে ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি দ্বিপাকি সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। কারণ সিএএটিএসএ নামে একটি নতুন আইনে রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র এবং ইরানের কাছ থেকে তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার সঙ্গে পূর্বে সম্পাদিত এস-৪০০ চুক্তিতে একটু ছাড় পাওয়ার প্রত্যাশা নয়াদিল্লি করলেও এই ডুবোজাহাজ ক্রয় চুক্তি সেই প্রত্যাশার গুড়ে বালি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, ওয়াশিংটন কঠোরভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অস্ত্র কেনা ঠেকাতে চাইছে।
এই নতুন চুক্তি আরও সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর আগে গত নভেম্বরে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত অস্ত্র রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোন এক্সপোর্ট এবং ভারতের গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি সই করে। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার সহযোগিতায় গোয়ায় তৈরি হবে ২টি স্টিলথ ফ্রিগেট।
দেশ দুটির কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে তখন জানিয়েছিলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া তার দীর্ঘদিনের বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের কাছে গ্রিগোরোভিচ-শ্রেণির উন্নত ফ্রিগেট প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে যাচ্ছে। রণতরী দুটি গোয়া শিপইয়ার্ডে তৈরি করার পর তা ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হবে ২০২৭ সালে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দেশ দুটি ১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি করে, যার মাধ্যমে রাশিয়ার কাছ থেকে ২টি যুদ্ধজাহাজ কিনতে পারবে ভারত। সেই রণতরী ২টি এখন তৈরি হচ্ছে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ প্রদেশে অবস্থিত ইয়ান্তার শিপইয়ার্ডে। এগুলো আগামী ২০২৩ সালে ভারতের হাতে এসে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন ২টি স্টিলথ ফ্রিগেট সম্পর্কে একজন ভারতীয় কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হলেও যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে খরচ হবে আরও বেশি। যে টাকার চুক্তি হয়েছে তা রুশদেরকেই দিতে হবে জাহাজের নকশা, প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ ও মালামাল কেনার খরচ বাবদ। আর বাকি যা খরচ হবে তা চালাবে ভারত।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে রাশিয়া থেকে চারটি রণতরী কেনার জন্য চুক্তি করে ভারত। ভারতের নৌবাহিনীর হাতে এখন রয়েছে ৬টি স্টিলথ ফ্রিগেট – ৩টি টালওয়ার শ্রেণির এবং ৩টি টেগ শ্রেণির। এগুলো ২০০৩ ও ২০১৩ সালে রাশিয়া থেকে কেনা হয়েছিল।
সমরবিশারদরা বলছেন, ভারত-রাশিয়া অস্ত্র চুক্তির কারণে ভারত সামরিক শক্তিতে আরো বলীয়ান হবে ঠিকই, কিন্তু তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোষানলেও পড়তে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে ভারতের ওপর যেকোনো সময় আরোপ করতে পারে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা; যা ভারতকে নাজুক অবস্থায় ফেলে দিতে পারে।