প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত : নারীর ক্ষমতায়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দৃপ্ত পদে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
গত ৮ মার্চ দেশে সাড়ম্বরে পালিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯০৮ সালে প্রথম নারী দিবসের সূচনালগ্নে নারীর দাবি ছিল নারীর শিা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। সেই দাবি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের স্বাধীন ভূখ-ে ৪৮ বছর ধরে পালিত হচ্ছে দিবসটি। এই দীর্ঘ সময়ে নারী আন্দোলনের আছে অনেক সফলতা ও রয়েছে কিছু দুর্বলতা। তবে বিগত ১০ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিভিন্ন সূচকে দেশ যেমনটি এগিয়েছে তেমনটি নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় এগিয়েছে বাংলাদেশের নারীরা।
সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ঘরের চার দেয়ালের বাইরে গিয়ে প্রমিলার আবরণ থেকে বের হয়ে এসেছে এদেশের নারী। ঘরে-বাইরে, জীবনের সর্বেেত্র পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলেছে এদেশের নারীরা। শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে এখন আর পিছিয়ে নেই নারীরা। বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অনেক ভালো করছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে সমানতালে দিনরাত কাজ করে চলেছে দেশ-বিদেশে সর্বত্র।
কোন কাজ করে না নারী? সন্তানের লালন-পালন থেকে শুরু করে সবখানেই সফল নারী। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরাও এখন বিচরণ করছেন শিা, রাজনীতি, অর্থনীতি গণমাধ্যমসহ জীবনের প্রতিটি েেত্র। স্বাধীন হওয়ার পর গত ৪৮ বছরের অন্তত ২৭ বছর এই দেশ শাসিত হয়েছে নারীদের নেতৃত্বে। তৈরি হয়েছে একটি নারীনীতি, যা অনেক অগ্রসর চিন্তা ধারণ করে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপের ফল বলছে, স্বাস্থ্য, শিা, কর্মসংস্থান ও মতায়নে বাংলাদেশের নারীরা এখন দণি এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এক দশক আগেও যেখানে দেশে নারীর কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের হার ছিল খুবই কম, এখন নারী কর্মসংস্থানে দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। অর্থ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান মাস্টার কার্ডের ‘মাস্টার কার্ড ইনডেক্স অব উইমেনস অ্যাডভান্সমেন্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সর্বশেষ সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের দুই নারী অ্যাথলেট মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ও মাহফুজা খাতুন শিলা ভারোত্তোলন ও সাঁতারে সোনা জয় করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনেন। বাংলাদেশের জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্যরাও ধীরে ধীরে নিজেদের অর্জনের পাল্লা ভারী করছেন। এরই মধ্যে ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জন শেষে বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে অন্য পকে পরাজিত করার সামর্থ্য দেখাতে শুরু করেছেন তারা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারীরা অনেক দিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছেন দুই নারী পাইলট। তারা হলেন মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন ও মেজর শাহরীনা বিনতে আনোয়ার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রথম নারী মেজর জেনারেল হয়েছেন ডা. সুসানে গীতি। দেশের প্রথম নারী ট্রেনচালক হিসেবে উম্মে সালমা সিদ্দিকা ২০১১ সালে রেলওয়েতে যোগ দেন। তার পথ ধরে বর্তমানে রেল চালনায় যোগ দিয়েছেন দেড় ডজন নারী। অটিজম বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তিনি গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ ইন বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ পুরস্কার জিতেছেন।
বাংলাদেশের নারী আলোকচিত্রীদের মধ্যে অনেকেই এখন ভালো করছেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী হচ্ছেন তাসলিমা আখতার। সাভারের রানা প্লাজা ধসের শিকার দুই শ্রমিকের আঁকড়ে ধরে থাকা ‘শেষ আলিঙ্গন’ নামের আলোকচিত্রের মাধ্যমে তিনি জার্মানির লিড অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার পান। বার্লিনে বর্ষসেরা নারীনেত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন নাজমা আক্তার। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্টে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন নিশাত মজুমদার। দেশের জন্য খ্যাতি ও সম্মান বয়ে আনা অন্য নারী পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজনীন। নিশাত মজুমদারের পরপরই তিনি ২০১২ সালে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন। এছাড়া ওয়াসফিয়া প্রথম বাঙালি হিসেবে দণি আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু পর্বত মাউন্ট অ্যাকোনকাগুয়া, উত্তর আমেরিকার ডেনালি, ইউরোপের মাউন্ট এলব্রাস ও অ্যান্টার্কটিকার ভিনসন মাসিফে আরোহণ করেন। পাটের জিন আবিষ্কারক প্রয়াত বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের প্রধান সহযোগী ছিলেন ঢাবির অধ্যাপক হাসিনা খান। চ্যালেঞ্জিং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেও পারদর্শী নারী। পারসোনার মতো বিশ্বমানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নারী দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এশিয়ার নোবেল খ্যাত র‌্যামন ম্যাগসাসে পুরস্কার পেয়ে বাংলাদেশের নারীর কৃতিত্বকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করিয়েছেন ‘বেলা’র নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। অন্যদিকে প্রায় দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান এবং বিরোধীদলীয় নেতাও নারী। অর্থাৎ জাতীয় জীবনের সব শাখায় এখন নারীর সফল পদচারণ।
অথচ নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া একসময় আন্দোলন করেছেন মেয়েদের শিতি করে তোলার জন্য। কারণ, শিাই সব কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে পারে একজন মেয়েকে। স্বাধীনতার পর খুব অল্পসংখ্যক মেয়ে সব প্রতিকূলতা উপো করে নিয়েছে শিা। বিপ্লব ঘটতে থাকে ১৯৮৯ সাল থেকে। ১৯৮৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী ছেলেদের শতকরা ৯০ জন বিদ্যালয়ে শিারত ছিল। মেয়েদের বেলায় এ হার ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু পরের দেড় দশকে এ চিত্র পাল্টে যায়।
সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সবশেষ রিপোর্ট অনুসারে মেয়েশিশুর প্রায় শতভাগই এখন স্কুলে যায়। শিকতায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে নারীদের। ১৯৯৫ সালে নারী শিকের হার ছিল ২৫ শতাংশ। ২০০২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর বর্তমানে এই হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষক হবেন নারী। এই নারী শিকরা পুরুষের পাশাপাশি গড়ে তুলছে আমাদের আগামী প্রজন্মকে।
প্রথমবারের মতো একজন নারী শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ডা. দীপু মনি। দেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রে নারীর মতায়ন ও অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার েেত্র সরকারের নীতি বাস্তবায়নে প্রশাসন দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিচারপতি, সচিব, সেনাবাহিনী, পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত ডিসি-এসপি, ইউএনও-ওসি সর্বত্র উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নারীর নিয়োগ, কর্তৃত্ব বাড়ানো হচ্ছে। এসব নারী নিজস্ব কর্মেেত্র যথেষ্ট দতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। নতুন নতুন উদ্ভাবন ছাড়াও নিজ নিজ কর্মেেত্র তারা জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছেন। ব্যবসাবাণিজ্য সরকারি-বেসরকারি সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতার সাথে এগিয়ে চলেছেন নারীরা।
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর পোশাক শিল্পে কর্মরতদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। হাজার বছর ধরে যেসব নারীকে রাখা হয়েছিল মূল অর্থনৈতিক কর্মকা-ে বাইরে, এখন তারাই হয়ে উঠেছেন বিদেশি মুদ্রা অর্জনের প্রধান শক্তি। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার েেত্র এই গার্মেন্টস শ্রমিক এবং গ্রামের অশিতি ও অর্ধশিতি নারীদের অবদান অসামান্য। শহর থেকে যে অর্থ গ্রামে যায় তার সিংহভাগটাই পাঠান এ নারী শ্রমিকরা। চা ও চামড়া শিল্পেও কাজ করছেন তারা। দেশের ৭৫ শতাংশ মেয়ে অর্থনীতিতে সক্রিয়। দণি এশিয়ায় সর্বোচ্চ এই হার। আর ৫০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বেশিমাত্রায়।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষিেেত্র ৫৯ শতাংশ নারী কাজ করছেন। মাঠ থেকে শুরু করে খাদ্যশস্য প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য উপযোগী করে তোলা এবং তা বাজারজাত করার কাজও তারা করছেন।
বাংলাদেশের প্রায় ৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন নারী দেশের অর্থনীতিতে শ্রম দিচ্ছেন। পুরুষের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার েেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। কর্মেেত্র নারীর এই বিপুল পদচারণার ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হওয়াটা প্রভাব ফেলেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও শিা উন্নয়নের েেত্র।
রাজনীতির পটভূমিতে দৃপ্ত পদপে রেখে চলেছে নারী নেতৃত্ব। স্থানীয় প্রশাসনের ইউপি থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত সর্বেেত্র নারীদের অংশগ্রহণ দৃপ্ত। ইউপি, উপজেলা, জেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব তাদের সৃজনশীলতা দ্বারা, তাদের সঠিক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করে চলেছে সাধারণ জনগণের নানা সমস্যার। এয়ারফোর্সে মেয়েরা যুদ্ধবিমান চালনা শুরু করে দিয়েছে। বিমানে তো মহিলা পাইলট আছেই, রেলেও নারী ড্রাইভার রয়েছে। গাড়ি চালকও রয়েছেন নারী। পুলিশ-র‌্যাব ও সশস্ত্র বাহিনী এবং বিজিবিসহ সামরিক-বেসামরিক সকল স্তরেই সফলতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন নারী সদস্যরা। জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরতি আসন ছাড়াও অন্তত ২৬ জন সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্য রয়েছেন। সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধী দলীয় নেতা এবং স্পিকারও একজন নারী। বিচার বিভাগে নারী বিচারপতি, জাতিসংঘ শান্তিরা বাহিনী এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন অত্যন্ত সফলতার সাথে। এছাড়া গণমাধ্যমে বেড়েছে নারীদের পদচারণা। সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় দতার সঙ্গে কাজ করছে অসংখ্য নারী। নারীরা পেয়েছে নারী উন্নয়ননীতি, যা নারী আন্দোলনের অনেক বড় প্রাপ্তি।

বিচার বিভাগে ৭ নারী বিচারপতি
বর্তমানে বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টে দায়িত্বরত রয়েছেন ৭ নারী বিচারপতি। তাদের মধ্যে বিচারপতি জিনাত আরা আপিল বিভাগে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ৬ জন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি। তারা হলেন বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ, বিচারপতি কাশেফা হোসেন ও বিচারপতি ফাতেমা নজীব।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা এখন ৯৯ জন। হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালন করা নারী বিচারপতিদের মধ্যে বিচারপতি ফাতেমা নজীব ছাড়া বাকি ৫ জন স্ব স্ব বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতি। এর মধ্যে বিচারপতি কাশেফা হোসেন একক বেঞ্চে আছেন।
আপিল বিভাগের বিচারপতি জিনাত আরা ৪০ বছর ধরে বিচার বিভাগে রয়েছেন। আর বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী হাইকোর্ট বিভাগের ৯২ জন বিচারপতির মধ্যে তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন।
উচ্চ আদালতে তাদের একজন অগ্রজও ছিলেন। তিনি এখন অবসরে। তিনিই ছিলেন দেশের প্রথম নারী বিচারক ও বিচারপতি। তিনি বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা।

ব্যাংকে নারী কর্মী ১২ শতাংশ
সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়িয়েছে ২৫ শতাংশ। পিছিয়ে নেই ব্যাংক খাতও। দেশে বর্তমানে ২২ হাজারেরও বেশি নারী ব্যাংক খাতে চাকরি করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে যত লোক কাজ করে, তার প্রায় ১২ শতাংশ নারী। ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংক খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৭ জন। এর মধ্যে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ২২ হাজার ৫৩ জন নারী। তবে ২০১৮ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর হার কিছুটা কমে ১২ দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় নিলে এ খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে কর্মরত ৫১ হাজার ৪৮৩ জনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে ৯ শতাংশ নারী। এ ছাড়া মধ্যম পর্যায়ে রয়েছে ১৫ শতাংশ এবং প্রারম্ভিক পর্যায়ে রয়েছে ১৩ শতাংশ নারী। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক এবং তার ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে নারী ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৫ জন। এর মধ্যে উচ্চপর্যায়ে নারী রয়েছেন ৬ শতাংশ, মধ্যম পর্যায়ে ১৪ শতাংশ ও প্রারম্ভিক পর্যায়ে ১৮ শতাংশ। শতাংশের হিসাবে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি নারী কাজ করেন অবশ্য বিদেশি ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকে প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারী রয়েছেন ২৫ দশমিক ২৪ শতাংশ, মধ্যবর্তী পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং উচ্চপর্যায়ে ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।

তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ১৫ শতাংশ
দেশে ছোট ও মাঝারি আকারের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ ১৫ শতাংশ। সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে একটি সমীার ফল প্রকাশ করেছে দেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রেনিউর ল্যাব। ৮ মার্চ প্রকাশিত ওই সমীায় দেশের ১০৭টি বিভিন্ন ধরনের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।
প্রেনিউর ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের অধিকাংশ ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত। দেশে সফটওয়্যার নির্মাতাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের ৬৮৮টি কোম্পানির মধ্যে ৩৩টির প্রতিনিধি নারী।
সমীায় দেখা গেছে, দেশের ২০ শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৪৬ শতাংশ। ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ৪২ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মধ্যে ২০ শতাংশ অ্যাকাউন্ট নারীদের।

সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ১৭ হাজার ৩৪০ নারী
বাংলাদেশের সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীতে বর্তমানে নারীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৩৪০ জন। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিণ শেষে কমিশনপ্রাপ্ত নারী সামরিক কর্মকর্তারা প্রতি বছরই যোগ দিচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীতে। সৈনিক পদেও যোগ দিচ্ছেন অনেক নারী। সামরিক বাহিনীর এসব নারী সদস্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কৃতিত্বের স্বার রাখছেন।
মধ্য আফ্রিকার গৃহযুদ্ধকবলিত দেশ কঙ্গোর আকাশে এমআই-১৭ হেলিকপ্টার উড়িয়ে সেখানে শান্তি রায় সহায়তা দেয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন দুই কৃতী নারী। সেনাবাহিনীতে সর্বোচ্চ মেজর জেনারেল পদে দায়িত্ব পালন করছেন মেডিকেল কোরের এক নারী কর্মকর্তা। ফাইটিং ফোর্সের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছেন ৪ জন। বিমান বাহিনীতে গত ১২ ডিসেম্বর ১ জন নারী পাইলট প্রশিণকালে সার্বিক বিষয়ে সেরা কৃতিত্বের জন্য সোর্ড অব অনার লাভ করেন।
বিমান বাহিনীতে ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো নারী বৈমানিক নিয়োগ শেষে তাদের প্রশিণ শুরু করা হয়। গত বছর প্রশিণ শেষে বিমান বাহিনীতে প্রথম বেল-২০৬ হেলিকপ্টারে পাইলট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ফাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক ও ফাইং অফিসার তামান্না-ই-লুফি।
আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীতেও নারীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য উল্লেখযোগ্য। দেশে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনেও বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা দতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। আধাসামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ২০১৫ সাল থেকে নারী সৈনিক নিয়োগ দিয়ে আসছে।
সেনাবাহিনীতে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা চিকিৎসকসহ প্রায় ৯০০। সর্বোচ্চ মেজর জেনারেল পদে কর্মরত একজন। তিনি হচ্ছেন ডা. সুসানে গীতি। নিয়মিত কোর্সের নারী কর্মকর্তাদের ৪ জন সর্বোচ্চ লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে কর্মরত। তারা হলেন আর্টিলারির সানজিদা হোসেন, সৈয়দা নাজিয়া রায়হান ও ফারহানা আফরীন এবং ইঞ্জিনিয়ার্সের সারাহ আমির। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তারা সেনাবাহিনীর আর্টিলারি ও ইঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ পান। নিয়মিত কোর্স বা ফাইটিং ফোর্সে বর্তমানে মোট নারী কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ৪০০ জন। মেডিকেল কোরে রয়েছেন ৫০০ জনের মতো। শান্তিরা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন ৪৭ জন।
বিমান বাহিনীতে নারী কর্মকর্তা ১৭৮ জন। সর্বোচ্চ উইং কমান্ডার পদে নারী কর্মকর্তা রয়েছেন। জিডি পাইলট ১২ জন। এই বাহিনীর ১৬ জন কর্মকর্তা বর্তমানে শান্তিরা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন।
নৌবাহিনীতে নারী কর্মকর্তা মোট ১৮৩ জন। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ কমান্ডার পদে আছেন ১৩ জন। আর বিভিন্ন পদে নারী নাবিক রয়েছেন ৬০ জন।
বিজিবিতে এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছেন ৪৩৮ জন নারী, যারা কাজ করছেন আইসিপি, বিজিবি হাসপাতাল ও চেকপোস্টগুলোতে।
পুলিশ বাহিনীতে নারীর সংখ্যা ১৩ হাজার ১৭৭ জন। সর্বোচ্চ অতিরিক্ত পুলিশ পরিদর্শক পদে আছেন রওশন আরা বেগম। অতিরিক্ত ডিআইজি পদে আছেন আমেনা বেগম ও আতিকা ইসলাম। জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে কর্মরত আছেন ১২৫ জন নারী।
দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রা
এবং বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আনসারের ৮১৬ সদস্যের ২টি নারী ব্যাটালিয়নও কাজ করে যাচ্ছে। এই বাহিনীতে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা ২৬ জন। এর মধ্যে পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন
৫ জন।

প্রশাসনে দৃপ্ত পদচারণ
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৭ মার্চের দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুসারে প্রশাসনের শীর্ষ পদ সচিব ও সমপর্যায়ের ৭৭ জনের মধ্যে নারী রয়েছেন ৮ জন। ৪৪৪ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে নারী ৮২ জন, ৭৩৮ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে নারী ৮৭ জন, ১ হাজার ৮০২ জন উপসচিবের মধ্যে নারী ৩৬৮ জন, ১ হাজার ৩০৫ জন সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ৩৬৮ জন ও ১ হাজার ৫১৪ জন সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ৪৯৩ জন। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে মাঠপর্যায়ে এখন ৮ জন বিভাগীয় কমিশনার ও ১৭ জন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন। ১১ জন জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারের মধ্যে কোনো নারী না থাকলেও স্থানীয় সরকার বিভাগের ৫২ জন উপপরিচালকের ১২ জন, ডেপুটি কমিশনার (জেলা প্রশাসক) পদের ৬৪ জনের মধ্যে ৯ জন, অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনারের ২০২ জনের মধ্যে ২৪ জন, ৪৪ জন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে ৪ জন, ৬৫ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের মধ্যে ২৫ জন, ২৯৮ জন এসি ল্যান্ডের (অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার-ল্যান্ড) মধ্যে ১১১ জন, ১০ জন ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন অফিসারের মধ্যে ২ জন, ৬ জন আরডিসির (রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর) মধ্যে ৫ জন, ৪৭০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে ১২২ জন, ২৬ সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের মধ্যে ১৫ জন, ১৮ জেলা পরিষদের সচিবের মধ্যে ৪ জন, ৩৬ ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে ১২ জন এবং ১৭০ ভারপ্রাপ্ত এসি ল্যান্ডের মধ্যে ৫৯ জন নারী দতা ও যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

শেষ কথা
নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দণি এশিয়ায় সবার উপরে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। শিায় এগিয়ে মেয়েরা। বর্তমানে প্রাথমিক স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি শতভাগ। ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন নারীরা।
আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক মতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির এসব প্যারামিটার অনুযায়ী সময় এখন বাংলাদেশের নারীদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশে বিশ্বের রোল মডেল। নারী উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশে বিশ্বের রোল মডেল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধের ল্েয তাঁর নির্দেশনায় প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরা আইন-২০১০, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ ও যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮। আরো প্রণয়ন করা হয়েছে ভিজিডি, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এসব কর্মসূচির আওতায় মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতন ৬ মাসে উন্নীত করা ছাড়াও বয়স্ক ভাতা, বিধবা-তালাকপ্রাপ্ত ও নির্যাতিত নারীদের ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতাও তিনি দেশে চালু করেছেন।
বাংলাদেশে নারীদের এই অগ্রযাত্রার কাহিনি এখন বৈশ্বিক গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দণি এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪টি েেত্র আবার বিশ্বের সব দেশের ওপরে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। এই ৪টি েেত্রর ৩টি হলো ছেলে ও মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের সমতা এবং সরকারপ্রধান হিসেবে কত সময় ধরে একজন নারী রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন েেত্র নারীদের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় নারী শিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে ব্যাপক। এর প্রভাব সর্বেেত্র পড়াতেই দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের উপরে যেতে পেরেছে এবং অর্থনৈতিকভাবে দেশ একটি শক্তিশালী অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।