প্রতিবেদন

যানজট নিরসনে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ চালুর উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
যানজট নিরসনে নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কাজে চীন সরকারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। চীন যেভাবে হোয়াং হো নদীকে শাসন করে নৌপথ তৈরি করেছে, ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা নদীগুলোর ক্ষেত্রেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
যদিও রাজধানী ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা দীর্ঘ দিনের। কিন্তু দখল আর দূষণের কবল থেকে মুক্তি না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারপাশের নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বৃত্তাকার নৌপথ খননের প্রকল্প নেয়া হয় ২০০০ সালে। এ ল্েয দুই দফা খননকাজ শেষে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় এই প্রকল্পের কাজ। ৯০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১০ কিলোমিটার নৌপথ খনন করে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতল্যা, বালু ও তুরাগ নদীর অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে আবার ভরাট হয়ে যায় এই নৌপথটি। এছাড়া নদীর উপরে নির্মিত সড়ক ও রেলপথে ১০টি সেতুর উচ্চতা কম থাকায় এর নিচ দিয়ে পণ্য ও যাত্রীবাহী বড় কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না।
বৃত্তাকার এই নৌপথের মধ্যে ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ-সদরঘাট পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার হলো দ্বিতীয় শ্রেণীর নৌপথ। এছাড়া সদরঘাট-মিরপুর-টঙ্গী-ডেমরা পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার হলো তৃতীয় শ্রেণীর নৌপথ। এই তৃতীয় শ্রেণীর নৌপথের ওপর বিদ্যমান সড়ক ও রেলপথে মোট ১৫টি সেতু রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সেতুর উচ্চতা নদীর পানির স্তর থেকে খুবই কম। এই সেতুগুলোর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) এর ৪টি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদফতরের (এলজিইডি) ৪টি ও রেলওয়ের ২টি সেতু রয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়।
বর্তমান সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে মতায় এসে এবার ঢাকার চার নদী রায় ব্যাপক পদপে নিয়েছে। ইতোমধ্যে নদীর দুই পাড়ে অবৈধ দখল রোধে উচ্ছেদের ক্র্যাশ অভিযান শুরু হয়েছে। এবারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান কার্যক্রম অনেকটা সফল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর পানি ব্যবহারের জন্য প্রতি লিটার পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ ৪ মিলিলিটারের বেশি থাকা আবশ্যক। এছাড়া অক্সিজেনের পরিমাণ ২ এর নিচে নেমে গেলে নদীতে কোনো জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। বুড়িগঙ্গায় দীর্ঘদিন ধরে মাছসহ অন্য কোনো জলজ প্রাণীর সন্ধান পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেছে।
বুড়িগঙ্গার দুই তীরের মানুষ জানিয়েছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বুড়িগঙ্গার পানির রঙ এখন সবচেয়ে কালো। এই কালো পানির উৎকট গন্ধে নদীর পাড়ে দু’দ- দাঁড়ানোও দায়। রাজধানী ঢাকার প্রাণরূপী বুড়িগঙ্গা এখন নগরবাসীর আবর্জনা ফেলার ভাগাড় মাত্র। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র রয়েছে চীনে। এক সময় ‘চীনের দুঃখ’ বলা হতো হোয়াং হো নদীকে। এখন হোয়াং হোর সৌন্দর্য বিমোহিত করে পর্যটকদের। নদীর দুইধারের অবকাঠোমো নজর কাড়ে যেকারো। ঠিক একই রকম পানির উৎস থাকলেও আমাদের বুড়িগঙ্গা সেই রূপ পাচ্ছে না।
চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে ২২ মার্চ চীনে বৈঠক করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ। সিএমসির ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাঙ্গ হুবাইওর সঙ্গে বৈঠকে ঢাকার চারপাশে নৌপথ তৈরি করতে মন্ত্রী চীনের সহায়তা চান।
বৈঠকে খালিদ মাহমুদ বলেন, আমরা অনেক দিন থেকেই চেষ্টা করছি ঢাকার চারপাশে একটি বৃত্তাকার নৌপথ সৃষ্টি করতে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
নৌপথের পাশাপাশি সার্কুলার সড়ক, মেরিন একাডেমিতে বিশ্বমানের নাবিক গড়ে তুলতে চীনের সহযোগিতা প্রদানের বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া চীন থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জন্য আরও ৬টি জাহাজ সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা হয়।
এদিকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ল্েয ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে ৬টি জাহাজ সংগ্রহের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে চীন আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা, বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকারের। এ পর্যন্ত ৫টি জাহাজ বিএসসি’র বহরে যুক্ত হয়েছে। অবশিষ্ট একটি জাহাজ ‘এমটি বাংলার অগ্রগতি’র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রতিমন্ত্রী ২১ মার্চ চীনে যান।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর চারদিকে নদীর তীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণের পদপে নেয়ার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল একটি সভাও হয়। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দু’পাশ অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে তীরভূমিতে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ চলমান রাখতে হবে। পাশাপাশি তীরের জায়গায় জনগণের জন্য বসার বেঞ্চ, ইকো পার্ক, বৃরোপণ ইত্যাদি কাজ হাতে নেয়া যেতে পারে।
এর পরিপ্রেেিত ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার নৌপথের মোট ১২০ কিলোমিটার তীরভূমির মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫২ কিলোমিটার অংশ অন্তর্ভুক্ত করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অংশেও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন মাসে শেষ করার ল্েয প্রকল্পটির প্রস্তাব করা হলে ২০১৭ সালের ৫ আগস্ট প্রস্তাবটির ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সলের ৫ ডিসেম্বর পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে গৃহীত হয়। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে কিছু অসঙ্গতি থাকায় তা সংশোধন করে গত বছর ১৩ মার্চ পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে গৃহীত হয়। বর্তমান পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুসারে প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।